রবিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৭

মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস


                                                                       
               বুড়ো হওয়া পাখিগুলি মৃত্যুর উদ্দেশ্যে কোথায় যায়?

তিনি গোরস্থানে বাস করতেন জনৈক বৃক্ষের মত। ভোরে বিদায় দিতেন কাকগুলিকে আর বাদুড়দের স্বাগত জানাতেন ঘরে। সন্ধ্যায় করতেন উল্টোটা। মধ্যবর্তী সময়ে আলোচনায় ব্যাস্ত থাকতেন শকুনদের প্রেতাত্নাদের সাথে। যেসব প্রেতাত্নাগণ দৃশ্যমান হতেন তার উঁচু উঁচু ডালগুলোতে। তাদের নখের মৃদু স্পর্শ অনুভব করতেন তিনি। যেন কোন কেটে ফেলা অঙ্গের সুক্ষ বেদনা। তিনি সিদ্ধান্তে আসতেন যে নিজেদের অব্যাহতি দিয়ে সবমিলিয়ে খুব একটা দুঃখে নেই শকুনেরা। আর তারা বেরিয়ে পড়ত গল্পটি ছেড়ে।

যখন প্রথম এখানে তিনি আসলেন থাকতে, মাসের পর মাস সহ্য করলেন দৈনন্দিন সব নিষ্ঠুরতা। একজন বৃক্ষ যেমনটা করে থাকে- একটুও কুন্ঠিত না হয়ে। তাকে পাথর ছুড়ে মেরেছে কোন বাচ্চা ছেলেটা তিনি ঘুরে দেখতেন না, ঘাড় ঘুরিয়ে পড়তেন না তার গুড়িতে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে লিখে দেয়া অপমান বাণীগুলি। যখন লোকেরা তাকে আজেবাজে নামে ডাকত সার্কাস বিহীন সঙ, দুর্গ বিহীন রাণী তিনি সেই আঘাতকে তার ডালপালার ফাঁক দিয়ে বইতে দিতেন মিষ্টি হাওয়ার মত। আর ওনার মর্মর রত পাতাগুলোর সুরকে বানাতেন ব্যাথার আরামের জন্য বেদনানাশক।

একমাত্র যখন জিয়াউদ্দীন, যেই বৃদ্ধ ইমাম সাহেব এককালে নামায পড়াত ফাতেহপুরী মসজিদে, ওনার দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়াল আর ওনাকে দেখতে আসা শুরু করল, তখন আশেপাশের লোকেরা ঠিক করল যে এইবার ওনাকে ছেড়ে দিয়ে শান্তিতে থাকতে দেয়ার সময় হয়েছে।

বহুদিন আগে একজন লোক যে ইংলিশ জানত ওনাকে বলেছিল যে তার নামটা উল্টো করে লিখলে(ইংলিশে)বানানটা দাড়ায় মাজনু। লায়লা আর মাজনুর ইংলিশ সংস্করণে, বলেছিল লোকটা, মাজনুকে ডাকা হয় রোমিও আর লায়লাকে জুলিয়েট। বিষয়টা হাস্যকর ঠেকেছিল ওনার কাছে।
মানে আমি ওদের গল্পের একটা খিচুড়ী পাকিয়েছি? তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন। যখন ওরা দেখবে লায়লা আসলে মজনুও হতে পারে আর রোমি হতে পারে আসলে জুলি তখন কি করবে ওরা?
দ্বীতিয়বার যখন ওনার সাথে দেখা হল তার, ইংলিশ জানত যে লোকটা বলল যে তার একটা ভুল হয়ে গেছে। ওনার নামটা উল্টো দিক থেকে বানান করলে হয় মুজনা , যেটা আসলে কোন নাম না এবং ওটার কোন অর্থও হয় না সেভাবে। এর উত্তরে বলেছিলেন তিনি, এসবে কোন যায় আসে না। আমি ওদের সবকটাই, আমি রোমি আর জুলি, আমিই লায়লা আর মজনু। আর মুজনা, কেন নয়? কে বলে আমার নাম আন্জুম? আমি আনজুম না, আমি আনজুমান। আমি এক মহামিলন, আমি একটা সমন্বয়। সবার এবং কারোরই না, সবকিছুর এবং কোন কিছুরই না। আর কেউ আছে যাকে ডাকতে চাও তুমি? সবাই আমন্ত্রিত।

সেই লোকটা যে ইংলিশ জানত বলেছিল যে এরকমটা বলে তিনি বেশ বুদ্ধিমানের মত করেছেন। সে বলেছিল যে এমনটা তার নিজের মাথায় কখনই আসত না। তিনি বললেন, কিভাবে আসবে, তোমার উর্দুর এই অবস্থা নিয়ে? কি মনে কর তুমি? ইংলিশ তোমাকে আপনা আপনি চালাক বানিয়ে দেয়?

লোকটা হেসেছিল। তিনি হেসেছিলেন তার হাসিতে। তারা দুজন মিলে একটা ফিল্টার সিগারেট টানছিলেন। সে অভিযোগ করছিল যে উইলস নেভি সিগারেট গুলো ছোট আর কেমন মোটা মোটা আর অবশ্যই ওগুলির এত দাম হওয়ার কোন মানে নেই। তিনি বলেছিলেন যে ফোর স্কয়ার অথবা ঐ অতি পুরুষোচিত রেড এন্ড হোয়াইটের তুলনায় এগুলিকেই তার ভাল লাগে।

এখন আর তার নাম ওনার মনে নেই। হয়তোবা কখনও নামটা তিনি জানতেনই না। সে চলে গেছে বহুদিন হয়, সেই লোকটা যে ইংলিশ জানত, যেখানেই হোক তার যাবার কথা ছিল। আর তিনি সরকারী হাসপাতালের পিছনে গোরস্থানে বাস করছিলেন। সংগী হিসেবে সাথে ছিল ওনার স্টিলের গোদরেজ আলমারী। যেটার মধ্যে তিনি তার গানগুলিকে রেখেছিলেন- ঘষা খাওয়া রেকর্ড আর টেপ- একটা পুরোনো হারমোনিয়াম, ওনার কাপড়চোপড়, গহনা, তার বাবার কবিতার বইগুলি, তার ছবির এ্যালবাম আর কিছু খবরের কাগজ থেকে কাটা অংশ যারা খোয়াবগহের আগুন থেকে বেঁচে ফিরেছে। একটি কালো সুতায় চাবিটাকে তিনি নিজের গলায় ঝুলিয়ে রাখতেন তাঁর বাঁকানো রূপালী টুথপিকটার সাথে। তিনি ঘুমাতেন একটা জীর্ণ পারশিয়ান কার্পেটে। সকালবেলায় সেটাকে তিনি তালাবদ্ধ করে রাখতেন আর রাতে বিছিয়ে দিতেন দুটো কবরের মাঝে(একটা ব্যাক্তিগত কৌতুক হিসেবে কখনই পরপর দুরাত একই কবরদের মাঝে নয়)। এখনও ধূমপান করতেন তিনি। এখনও নেভি কাট।

এক সকালে, যখন তিনি জোরে জোরে খবরের কাগজ পড়ে শোনাচ্ছিলেন তাকে, ঐ বৃদ্ধ ইমাম সাহেবটি, যে নিশ্চিতভাবেই এতক্ষণ কিছুই শুনছিল না, জিজ্ঞেস করল- বিঘ্ন ঘটিয়ে এক সরল বাতাসে এটা কি সত্য যে তোমাদের ভিতরের হিন্দুদেরকে পর্যন্ত মরার পর কবর দেয়া হয়, পোড়ানো হয় না?

ঝামেলা বুঝে, তিনি আলাপ ঘুরিয়ে দিলেন। সত্য? কোনটা সত্য? সত্য কি?

নিজের তদন্তের ধারা থেকে সরে যেতে অনিচ্ছুক, ইমাম সাহেব বিড়বিড় করলেন একটি যন্ত্রস্থ প্রত্যুত্তর।সাচ খুদা হ্যায়। খুদা হি সাচ হ্যায়। সত্য হল ঈশ্বর। ঈশ্বরই সত্য। যে ধরণের জ্ঞান সদা সুলভ্য ঐ রঙ করা ট্রাকগুলির পশ্চাৎভাগে যারা হাইওয়েগুলি ধরে গর্জন করতে করতে চলে যায়। তারপর সে তার অন্ধসবুজ আঁখিদ্বয় সরু করল আর জিজ্ঞাসিল এক ধূর্তসবুজ ফিসফিসে: আমাকে একটা কথা বল, তোমরা, যখন তোমরা মারা যাও, তোমাদেরকে ওরা কবর দেয় কই? তোমাদের লাশের গোসল দেয় কে? জানাযা পড়ায় কে?

আনজুম কোন কথা বললেন না অনেকক্ষণ। তারপর তিনি ঝুঁকে আসলেন আর ফিসফিস করলেন তিনিও, অবৃক্ষ সুলভ ভাবে, ইমাম সাহেব, যখন লোকজন রঙ নিয়ে কথা বলে- লাল, নীল, কমলা, যখন তারা আলাপ করে সুর্যাস্তের আকাশ নিয়ে , বা রমযানের সময় চাঁদ ওঠা নিয়ে- আপনার মনে তখন কি আসে?

অতঃপর একে অন্যকে আঘাত করে, গভীরভাবে, প্রায় মরণঘাতী ভাবে, তারা দুজন বসে রইলেন চুপচাপ পাশাপাশি কারো একজনের রৌদ্রসিক্ত কবরের ওপরে, রক্তক্ষরণরত। একসময় সেটা ছিলেন আনজুম যিনি নীরবতা ভাঙলেন।

একটা কথা বলেন আমাকে, তিনি বললেন, ইমাম সাহেব তো আপনি, আমি না। বুড়ো হওয়া পাখিগুলি মরার জন্য কই যায়? তারা কি আমাদের উপর আকাশ থেকে পাথরের মত খসে পড়ে? আমরা কি রাস্তায় তাদের লাশগুলির উপর হোঁচট খাই? আপনার কি মনে হয় না যে যিনি সব কিছু দেখেন, সবচেয়ে শক্তিমান যিনি আমাদের এই পৃথিবীতে রাখেন আমাদেরকে ফেরত নেয়ার জন্যেও তিনি ঠিকঠাক ব্যাবস্থা করে রেখেছেন?

ঐদিন ইমামের বেড়াতে আসাটি অন্যদিনের তুলনায় তাড়াতাড়ি শেষ হল। আনজুম দেখছিলেন তার চলে যাওয়া, কবরগুলোর মাঝখান দিয়ে ঠক-ঠক ঠক-ঠক করে নিজের পথ করে নিচ্ছিলেন তিনি, তার দেখার-চোখ বেতের ছড়িটি সৃষ্টি করছিল সংগীতের যখন সেটার সংঘর্ষ ঘটছিল ইমাম সাহেবের পথ নোংরা করে রাখা শুন্য হওয়া মদের বোতল আর ফেলে দেয়া সিরিন্জের সাথে। তিনি তাকে আটকালেন না। তিনি জানতেন সে ফেরত আসবে। যত বিশদই হোক না কেন তার নাট্যকলা, একাকীত্বকে তিনি দেখলেই চিনে নিতে পারতেন। তিনি অনুভব করতেন যে কোন এক অদ্ভুত স্পর্শরৈখিক উপায়ে, ওনার ছায়া তার প্রয়োজন যতটা ওনার প্রয়োজন তারটা। এবং অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শিখেছিলেন যে প্রয়োজনীয়তা হল একটা গুদামঘরের মত যার যথেষ্ট পরিমাণ নিষ্ঠুরতাকে জায়গা করে দিতে কোন সমস্যা হয় না।

যদিও খোয়াবগাহ থেকে আনজুমের প্রস্থানটি আন্তরিকতার ধারে কাছেও ছিল না, তিনি জানতেন যে সেটার স্বপ্নগুলির আর গোপনীয়তাগুলির সাথে ছলনা করাটা তার একার ব্যাপার নয়।  


                                      ২.
                                 খোয়াবগাহ
                      
তিনি ছিলেন পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ। জন্মেছিলেন জানুয়ারীর এক শীতল রাতে, কুপির আলোয়(বিদ্যুত বন্ধ ছিল), শাহজাহানবাদে, দিল্লীর দেয়াল ঘেরা শহরটিতে। আহলাম বাজি, যেই ধাত্রী ওনাকে প্রসব করাল আর দুটো শাল দিয়ে জড়িয়ে ওনার মায়ের হাতে তুলে দিল, বলল যে, ছেলে হয়েছে। তখনের পরিস্থিতির বিবেচনায়, তার ভুলটি বোধগম্য।

সন্তানধারণের প্রথম মাসের মধ্যেই জাহানারা বেগম এবং তার স্বামী ঠিক করেছিলেন যে যদি তাদের বাচ্চাটি পুত্র হয় তবে তার নাম রাখবেন তারা আফতাব। তাদের প্রথম তিনটি সন্তান ছিল কণ্যা। ছয় বছর যাবত তারা তাদের আফতাবের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি জন্মালেন যেই রাতে সেটি ছিল জাহানারা বেগমের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের।

পরদিন সকালে, যখন সূর্য উঠেছে আর উষ্ণ চমৎকার হয়েছে ঘরটা, তিনি ছোট্ট আফতাবের গায়ে জড়ানো কাপড়গুলো খুললেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করলেন তার ক্ষুদ্র শরীরটা- চোখ নাক মাথা গলা বগল হাত পায়ের আঙুল- ধীর তৃপ্ত উল্লাসে। তখনই তিনি আবিষ্কারটি করলেন। তার পুরুষাঙ্গটির নীচে লুকিয়ে আছে, ছোট, অগঠিত, কিন্তু সন্দেহাতীত ভাবে একটি নারী-অঙ্গ।

কোন মায়ের পক্ষে কি সম্ভব নিজের বাচ্চার ভয়ে দিশেহারা হওয়া? জাহানারা বেগম হয়েছিলেন। তার প্রথম প্রতিক্রিয়াটি ছিল এরকম একটি অনুভুতি যে তার হৃদযন্ত্রটি থেমে গেছে এবং তার হাড়গুলি ভস্ম হয়ে যাচ্ছে। তার দ্বীতিয় প্রতিক্রিয়াটি ছিল তিনি কোন ভুল করেননি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরেকবার দেখা। তার তৃতীয় প্রতিক্রিয়া ছিল তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা থেকে দ্রুত পিছিয়ে আসা। এই সময় তার দেহাভ্যন্তরে একটা গোলযোগ ঘটে গেল এবং মলের একটি ক্ষীণ ধারা তার পা বেয়ে গড়িয়ে নামতে লাগল। তার চতুর্থ প্রতিক্রিয়াটি ছিল নিজেকে এবং নিজের সন্তানটিকে মেরে ফেলার ব্যাপারে মনস্থঃ করা। তার পন্চম প্রতিক্রিয়াটি ছিল যে তিনি তার বাচ্চাটিকে তুলে নিলেন এবং নিজের কাছে আকড়ে ধরলেন। আর সেই অবস্থায় তিনি তার চেনা বিশ্ব এবং যেসব বিশ্বের অস্তিত্ব সমন্ধে তিনি জানতেন না কোনদিন, তাদের মাঝখানের একটা ফাটল দিয়ে নীচে পড়ে যেতে লাগলেন। সেখানে, সেই অতল গহ্বরটিতে, আধারের মাঝে ঘুরতে ঘুরতে, এতদিন পর্যন্ত যা কিছুর ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন তিনি, প্রত্যেকটা জিনিষ, সবচেয়ে ক্ষুদ্র থেকে নিয়ে সবচেয়ে বড় পর্যন্ত, তার কাছে অর্থবহ হওয়া বন্ধ করে দিল। উর্দুতে, তার জানা একমাত্র ভাষাটিতে, সব জিনিষের, শুধু জীবীত জিনিষদের নয় বরন্চ সকল জিনিষের- কার্পেটদের, কাপড়দের, বইদের, কলমদের, বাদ্যযন্ত্রদের- একটা লিঙ্গ আছে। সবকিছু্‌ই ছিল হয় পুরুষ অথবা নারী, ছেলে অথবা মেয়ে। শুধুমাত্র তার বাচ্চাটি ছাড়া। হ্যাঁ অবশ্যই তিনি জানতেন যে তার বাচ্চার মতদের জন্য একটা শব্দ আছে- হিজরা। শব্দ আসলে দুটো, হিজরা এবং কিন্নার। কিন্তু দুটো শব্দ মিলে তো একটা ভাষা হয় না।

এটা কি সম্ভব ভাষার বাইরে বসবাস করা? স্বভাবতঃই এই প্রশ্নটি জাহানারার কাছে নিজেকে সম্ভাষিত করল না একটিমাত্র শব্দের মাধ্যমে , বা একটি প্রান্জল বাক্যের দ্বারা। সে নিজেকে তার কাছে সম্ভাষিত করল একটি আওয়াজহীন, আদিম হাহাকার হিসেবে।

তার ষষ্ঠ প্রতিক্রিয়াটি ছিল নিজের শরীর পরিষ্কার করা এবং এই মূহুর্তে কাউকে কিছু না জানানোর সংকল্প করা। এমনকি তার স্বামীকেও না। তার সপ্তম প্রতিক্রিয়া ছিল শুয়ে পড়া আফতাবের পাশে এবং বিশ্রাম নেয়া। যেমনটা করেছিলেন খ্রিষ্চানদের ঈশ্বর। যখন তিনি স্বর্গ এবং পৃথিবী নির্মাণ সমাপ্ত করলেন। পার্থক্য হল যে ঈশ্বরের ক্ষেত্রে তিনি বিশ্রাম করেছিলেন নিজের সৃষ্ট জগতটিকে একটি অর্থ প্রদানের পর। যেখানে জাহানারা বেগম বিশ্রাম করছিলেন তার সৃষ্টটি তার জগতের অর্থকে তছনছ করে দেয়ার পর।

যতযাই হোক ওটা কোন আসল যোনি না, তিনি নিজেকে বোঝালেন। ওটার পথগুলো খোলা নয়(তিনি পরীক্ষা করেছেন)। ওটা একটা উপাঙ্গ মাত্র, বাচ্চা-কাচ্চাদের থাকে এসব। হয়তোবা এটা বন্ধ হয়ে যাবে, বা সেরে যাবে, বা চলে যাবে কোন একভাবে। তিনি তার পরিচিত সবকটা দর্গায় মানত করবেন আর সর্বশক্তিমানকে বলবেন তাকে রহমত করার জন্য। সর্বশক্তিমান করবেন। জাহানারা জানেন তিনি করবেন। আর হয়তোবা তিনি করেছিলেনও। যেভাবে করেছিলেন সেটা হয়তো জাহানারা বুঝতে পারেননি পুরোপুরি।

প্রথম যেদিন শরীরে জোর পেলেন জাহানারা বেগম শিশু আফতাবকে সাথে নিয়ে গেলেন হযরত শারমাদ শহীদের দরগায়। দর্গাটি তার বাসা থেকে একটা সরল দশমিনিটের হাঁটা দূরত্বে। হযরত শারমাদ শহীদের কাহিনীটি জাহানারা তখনও জানতেন না। তার কোন ধারণাও ছিল না কীসে তার পদযাত্রাটিকে হুজুরের দরগার দিকেই ধাবিত করল। হয়তোবা হুজুর তাকে নিজের কাছে ডেকে নিয়েছেন। অথবা সেখানে তাঁবু করে বসবাসরত অদ্ভুত মানুষগুলি তাকে আকর্ষণ করেছিল কোন একভাবে। মীনা বাজার যাওয়ার পথে এই মানুষগুলিকে তিনি প্রায়ই দেখতেন। তার আগের জীবনে জাহানারা এই ধরণের লোকদের প্রতি কৃপাপরবশেও তাকানোর দরকার মনে করেননি যদিনা তারা রাস্তাঘাটে তার সামনে পড়ে গেছে। হঠাৎ করে তাদেরকেই মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।

হযরত শারমাদ শহীদের দর্গায় আগমনকারীদের সকলে হুজুরের গল্পটি জানত না। কেউ কিছু অংশ জানত, কেউ কিছুই জানত না, এবং কেউ তাদের নিজস্ব সংস্করণ বানিয়ে নিত। অধিকাংশ লোকে জানত যে শারমাদ ছিলেন একজন ইহুদী আর্মেনীয় বণিক যিনি নিজের জীবনের প্রেমটিকে অনুসরণ করতে করতে পারশিয়া থেকে যাত্রা শুরু করে দিল্লী চলে এসেছিলেন। কম লোকই জানত যে তার জীবনের প্রেমটি ছিল অভয় চাঁদ, একজন কমবয়সী হিন্দু বালক যার সাথে তার দেখা হয়েছিল সিন্ধুতে। বেশীর ভাগ লোক জানত যে তিনি ইহুদীবাদ ত্যাগ করে ইসলামকে গ্রহণ করেছিলেন। কম লোকই জানত যে আধ্যাত্নিক সাধনার একটি পর্যায়ে গতানুগতিক ইসলাম থেকেও তার মন উঠে যায়। অধিকাংশ লোক জানত শারমাদ হুজুর জীবনযাপন করতেন শাহজাহানবাদের রাস্তাঘাটে একজন নগ্ন ফকির হিসেবে। পরে একদিন তাকে জনসমক্ষে হত্যা করা হয়। কম লোকেই জানত তাকে হত্যার কারণটি জনসমক্ষে নগ্ন থাকার অপরাধ নয় বরন্চ তার অপরাধের কারণটি ছিল স্বধর্ম ত্যাগ। আওরঙ্গযেব, তৎকালীন সম্রাট, তাকে নিজের দরবারে ডেকে পাঠাল এবং তাকে বলল প্রমাণ করতে যে তিনি একজন প্রকৃত মুসলিম। তিনি তাকে পাঠ করতে বললেন কালিমা: লা ইলাহা ইল্লালাহু মুহাম্মাদুর রাসুলু্ল্লাহ আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ(সঃ) তার বার্তাবহণকারী। লাল দুর্গের রাজদরবারে কাজী আর মাওলানাদের একটি জুরির সামনে শরমাদ নগ্ন হয়ে দাড়িয়ে ছিলেন। আকাশে মেঘেদের ভেসে বেড়ানো বন্ধ হয়ে গেলো, উড়ন্ত পাখিরা মাঝপথে স্থির হয়ে গেল, দুর্গের ভেতরের বাতাস ক্রমশঃ ঘন আর দুর্ভেদ্য হয়ে উঠল যখন তিনি কালিমা পাঠ শুরু করলেন। কিন্তু তিনি শুরু করতে না করতেই থেমে গেলেন। তিনি বললেন শুধু প্রথম অংশটুকু: লা ইলাহা। কোন ঈশ্বর নেই। এর বেশী আর অগ্রসর হওয়া তার হবে না, হুজুর দৃঢ়কন্ঠে জানালেন, যতক্ষণ না তিনি তার আধ্যাত্নিক সাধনা সমাপ্ত করছেন এবং ঈশ্বরকে গ্রহণ করতে পারছেন নিজের সমস্ত হৃদয় দিয়ে। তার আগপর্যন্ত, তিনি বললেন, কালিমা পাঠ করা হবে শুধুই প্রার্থনা নিয়ে তামাশা করা। কাজীদের সমর্থনক্রমেঃ, আওরঙ্গজেব শারমাদের মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিলেন।

এর থেকে যদি এমনটা ধরে নেয়া হয় যে, এই গল্পটি না জেনেই যারা তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হযরত শারমাদ শহীদের কাছে গিয়েছেন তারা সেটা করেছেন অজ্ঞতাবশতঃ, ইতিহাস আর সত্যের ব্যাপারে খুব বেশী সচেতন না হয়ে, তাহলে ভুল হবে। কারণ দর্গার ভেতরে, শরমাদের স্বাধীন আত্নাটি, প্রবল, অনুভবযোগ্য, এবং যেকোন ঐতিহাসিক তথ্যাবলীর স্তুপের থেকে অনেক বেশী সত্য, দেখা দিত তাদের সামনে যারা তাঁর দোয়াকামী। এটা উদযাপন করত(কিন্তু কখনও উপদেশ দিত না) ধর্মীয় দীক্ষাদানের বদলে আধ্যাতিকতার শুদ্ধ শক্তিকে, বিত্ত আর জিদের তুলনায় সারল্যকে, এমনকি নিঃশেষিত হওয়ার সম্মুখ সম্ভাবনার সামনে পরমানন্দদায়ক প্রেমকে। শারমাদের আত্না ওনার কাছে আগতদেরকে অনুমতি দিত তার গল্পটিকে নেয়ার এবং তাদের সেটাকে যা হওয়া প্রয়োজন তাই বানিয়ে নেয়ার।

যখন জাহানারা বেগম দর্গায় একটি পরিচিত মুখ হয়ে গেল তখন সে গল্পটি শুনল(এবং তারপর খুচরা করে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিল) যে কিভাবে শারমাদের শিরচ্ছেদ করা হয়েছিল জামা মসজিদের সিড়িতে এক সমুদ্রপ্রমাণ জনতার সম্মুখে যারা তাকে ভালবাসত এবং সেদিন সমবেত হয়েছিল তাকে বিদায় জানাতে। যে কিভাবে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরেও হুজুরের মস্তকটি আবৃত্তি করে যাচ্ছিল তার প্রেমের কবিতাগুলি, এবং কিভাবে তিনি তার বাক্যরত মাথাটিকে তুলে নিলেন, যেরকম স্বাভাবিকভাবে আজকের দিনের একজন মর্টরসাইকেল চালককে দেখা যায় তার হেলমেটটিকে তুলে নিতে, আর হেঁটে উঠলেন জামা মসজিদের সিড়ি ধরে এবং তারপর, ঐ একইরকম সাবলীলভাবে, সরাসরি স্বর্গে চলে গেলেন। সেই কারণেই, জাহানারা বেগম বলত (শুনতে ইচ্ছুক যে কাউকে), হযরত শারমাদের ক্ষুদ্র দর্গায় (যেটা পর্বতের গায়ে সেঁটৈ থাকা শামুকের মত আটকে ছিল জামা মসজিদের পূর্বদিকের সিড়ির ধাপগুলোতে, সেই একই জায়গা যেখানে তার রক্ত গড়িয়ে পড়ে একটা ছোটখাট পুকুরের মত তৈরী করেছিল), মেঝেটি লাল, দেয়ালগুলি লাল এবং ছাদটি লাল। তিনশ বছরের উপর চলে গেছে, তিনি বলতেন, কিন্তু হযরত শারমাদের রক্ত ধুয়ে ফেলা যায়নি। যে রঙেই তারা রঙ করুক না কেন তার দর্গাটিকে, জাহানারা বেগম জোর দিয়ে বলতেন, সময়ের সাথে সাথে এটা নিজে থেকেই লাল হয়ে যায়।

প্রথমাবারের মত যখন জাহানারা পার হলেন সেই জনতার ভীড়টি- আতর আর তাবিজের দোকানদাররা, দর্গায় আগতদের জুতার জিম্মাদাররা, খোড়া-আতুররা, ভিখারীরা, ঘরহারারা, ঈদে কোরাবানির জন্য মোটা করা হচ্ছিল যেই ছাগলগুলাকে, আর নীরব, বয়স্ক খোঁজাদের যেই জটলাটি সংসার পেতেছিল দর্গার বাইরে একটি তার্পোলিনের নীচে এবং ক্ষুদ্র লালরঙের কক্ষটিতে প্রবেশ করলেন, জাহানারা বেগম শান্ত হয়ে গেলেন। রাস্তার শব্দগুলো ধীরে ধীরে মুছে যেতে লাগল আর মনে হল খুব দূর থেকে আসছে। তিনি এক কোনায় বসলেন কোলে তার ঘুমন্ত সন্তানটিকে নিয়ে, দেখতে লাগলেন লোকজনদের, মুসলিম এবং সেই সাথে হিন্দুরা, একজন দুজন করে আসে, আর সমাধিটির চারপাশের গ্রীলে লাল সুতা, লাল চুড়ি আর কাগজের টুকরা বেঁধে দেয়, সকাতরে প্রার্থনা করছে শারমাদ যেন তাদের আশীর্বাদ করেন। একমাত্র যখন জাহানারা বেগম খেয়াল করলেন ঘষাকাঁচের মত অস্বচ্ছ শরীরের এক বৃদ্ধ লোককে, যিনি তার কাগজের মত চামড়া আর আলো দিয়ে বোনা সুতার মত দাড়ি নিয়ে এক কোনায় বসে আছেন, দোলা খাচ্ছেন সামনে পিছে, নীরবে কেঁদে চলেছেন যেন তার হৃদয় ভেঙে গেছে, তখন জাহানারা নিজের অশ্রুধারাকে বইতে দিলেন। এই আমার ছেলে, আফতাব, তিনি ফিসফিস করে বললেন হযরত শারমাদকে। আমি তাকে এখানে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি। তার দিকে খেয়াল রাখবেন। আর আমাকে শেখান কিভাবে তাকে ভালবাসব।
 হযরত শারমাদ তেমনটাই করেছিলেন।

                                     **
 আফতাবের জীবনের প্রথম কয়েক বছরে, জাহানারা বেগমের গোপনীয়তাটি নিরাপদে ছিল। তিনি অপেক্ষা করছিলেন আফতাবের নারী-অঙ্গটি সেরে যাবার জন্য। একই সময়ে তিনি পুত্রকে সবসময় কাছে কাছে রাখতেন এবং তার ব্যাপারে হিংস্রভাবে রক্ষণমূলক ছিলেন। এমনকি তার ছোট ছেলে, সাকিব, জন্মানোর পরও তিনি নিজের কাছ থেকে বেশীদূরে আফতাবকে একা একা যেতে দিতেন না। একজন মহিলা যিনি এতদিন ধরে এত দুঃশ্চিন্তার সাথে একটি পুত্রের জন্য অপেক্ষা করেছেন তার জন্য এই ধরণের আচরণকে খুব একটা অস্বাভাবিক হিসেবে দেখা হত না।

আফতাবের বয়স যখন পাঁচ সে চুড়িওয়ালীর গলিতে ছেলেদের উর্দু-হিন্দী মাদ্রাসায় পড়তে যেতে শুরু করল। এক বছরের মধ্যে সে কোরানের একটা ভাল পরিমাণ অংশ আরবীতে তেলওয়াত করতে পারত, যদিও এটা পরিষ্কার নয় যে তার কতটুকু সে বুঝতে পারত- তবে সেটা সত্য ছিল অন্য বাচ্চাগুলোর ব্যাপারেও। আফতাব সাধারণের থেকে ভাল ছাত্র ছিল, কিন্তু সে যখন খুব ছোট তখন থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠল যে তার আসল গুণ হল সংগীতে। তার একটা মিষ্টি, প্রকৃত গান গাওয়ার কন্ঠ ছিল এবং মাত্র একবার শুনেই সে একটা সুরকে তুলে নিতে পারত। তার বাবামা ঠিক করল তাকে উস্তাদ হামিদ খানের কাছে পাঠানোর, একজন অসামান্য কমবয়স্ক সংগীতজ্ঞ যিনি চাদনী মহলে তার সংকীর্ণ ঘরগুলোতে বাচ্চাদের দলগুলিকে ভারতীয় ক্লাসিকাল সংগীত শেখাতেন। ছোট আফতাব কোনদিন একটা ক্লাসও বাদ দিত না। যখন তার বয়স নয় হয়েছে, সে রাগ ইয়ামান, দুর্গা আর ভৈরবীতে বাড়া খায়াল এর পুরো একটি বিশমিনিটের মত অংশ গাইতে পারত আর রাগ পুরিয়া ধানাশ্রির সমতল রেখাবটি থেকে তার কন্ঠকে আলতো করে উঠিয়ে নিতে পারত যেন পুকুরের জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে একটা পাথরের টুকরা লাফিয়ে চলে যাচ্ছে। লক্ষণৌয়ের একজন রাজ-গণিকার দক্ষতা আর ভঙ্গিমা নিয়ে সে চৈতী আর ঠুমরী গাইতে পারত। প্রথমদিকে লোকজন মুগ্ধ হত এবং এমনকি উৎসাহও দিত, কিন্তু শীঘ্রই অন্য ছেলেমেয়েদের ঠাট্টা আর জ্বালাতনটি শুরু হয়ে গেল: ও একটা মেয়ে। ও মেয়েও না ছেলেও না। ও একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। মেয়ে-ছেলে। ছেলে-মেয়ে হে! হে! হে!

জ্বালাতন যখন সহ্যাতীত হয়ে উঠল আফতাব তার সংগীতের ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দিল। কিন্তু ওস্তাদ হামিদ খান, যিনি খুব ভালবাসতেন তাকে, নিজে নিজে তাকে আলাদা করে শেখাতে চাইলেন। তাই সংগীতের ক্লাসগুলি চালু থাকল, কিন্তু আফতাব আর স্কুলে যেতে চাইত না। ততদিনে জাহানারা বেগমের আশাগুলি কম বেশী ম্লান হয়ে গেছে। দিগন্তের কোথাও সেরে যাওয়ার কোন ইশারা নেই। কিছু সৃষ্টিশীল অজুহাত তৈরী করে তিনি গত কয়েক বছর ধরে আফতাবের খৎনার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পেরেছেন। কিন্তু ছোট সাকিব তারটার জন্য লাইনে আপেক্ষা করছিল, এবং তিনি জানতেন তার সময় ফুরিয়ে গেছে। শেষপর্যন্ত তিনি তার যা করার ছিল তাই করলেন। তিনি অন্তরে সাহস সন্চয় করলেন আর তার স্বামীকে জানালেন, শোকে কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়ে এবং একই সাথে এই শান্তির সাথে যে অবশেষে তার অন্য কেউ একজন আছে যার সাথে তিনি তার দুঃস্বপ্নকে ভাগ করে নিতে পারছেন।

তার স্বামী, মুলাকাত আলী, ছিল একজন হাকিম, ভেষজ চিকিৎসার একজন ডাক্তার, এবং উর্দু ও পারশিয়ান কাব্যের এক প্রেমিক। তার সারাটা জীবন তিনি আরেকজন হাকিমের পরিবারের জন্য কাজ করেছেন- হাকিম আব্দুল মাজিদ, যিনি রূহ আফজা(পারশিয়ানে আত্নার মহৌষধ) নামক একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের শরবতের উদ্যোক্তা ছিলেন। রূহ আফজা, যা তৈরী হত খুরফার বিচি, আঙুর, কমলা, তরমুজ, পুদিনা, গাজর, সামান্য পালংশাক, খুস খুস, শাপলা, দুই ধরণের লিলি আর দামাস্কার গোলাপের নির্যাস থেকে, বানানো হয়েছিল একপ্রকার টনিক হিসেবে। কিন্তু লোকজন দেখল যে ঝিকমিকে রুবী-রঙের তরলটির দুই টেবিল চামচ একগ্লাস ঠান্ডা দুধে বা সাধারণ পানিতে মেশালে শুধু স্বাদেই চমৎকার লাগে না বরন্চ দিল্লীর আগুনের মত গ্রীষ্ম এবং মরুভুমির বাতাসে বহমান অদ্ভুত জ্বরজারিগুলোর বিরুদ্ধে সেটি একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা। দ্রুতই যার সূচনা ঘটেছিল ঔষধ হিসেবে তা হয়ে গেল ঐ এলাকার একটি জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন পানীয়। রুহ আফজা হয়ে উঠল একটি বর্ধিষ্ণু ব্যাবসা এবং একটি সাংসারিক নাম। চল্লিশ বছর ধরে এটি বাজার শাসন করল, তারা হেডকোয়ার্টার থেকে পণ্য পাঠাত পুরাতন শহরে অনেক দক্ষিণে সেই হায়দারাবাদ পর্যন্ত এবং অনেক পশ্চিমে সেই আফগানিস্তান পর্যন্ত।
এর পর আসল দেশভাগ। ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যকার নতুন সীমানায় ঈশ্বরের কন্ঠের ধমনীটি ফেটে খুলে গেল এবং লাখ লাখে মানুষ মারা গেল ঘৃণাজনিত কারণে। প্রতিবেশীরা দাড়িয়ে গেল একে অন্যের বিপক্ষে, যেন তারা কোনদিন একে অন্যকে চিনত না, কখনও একে অন্যের বিয়েতে যাইনি, কখনও গায়নি একে অন্যের গান। দেয়ালঘেরা শহরটা ভেঙে খুলে গেল। পুরান পরিবারগুলি(মুসলিম)পালাল। নতুনরা(হিন্দুরা) এসে পৌছাল আর সংসার পাতল শহরের দেয়ালগুলির আশেপাশে। রুফ আফজা বেশ ভালভাবেই পিছিয়ে পড়ল, তবে সামলে নিল দ্রুতই আর পাকিস্তানে একটা শাখা খুলল। শতাব্দীর এক সিকিভাগ পার হলে, পূর্ব পাকিস্তানে ঘটা নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞটির পর, এটি বাংলাদেশের আনকোড়া নতুন রাষ্ট্রটিতে একটি নতুন শাখা খুলল। তবে শেষমেষ, যে আত্নার মহৌষধটি টিকে থেকেছে যুদ্ধ আর তিনটি দেশের রক্তস্নাত জন্মের মধ্য দিয়ে, ধরা খেয়ে গেল, পৃথিবীর অন্য আর সবকিছুর মতই, কোকা-কোলার কাছে।

যদিও মুলাকাত আলী একজন বিশ্বস্ত আর মূল্যায়িত কর্মচারী ছিলেন হাকিম আব্দুল মজিদের, যে বেতন তিনি পেতেন তা সংসার চালানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাই তার কর্মঘন্টাগুলোর বাইরের সময়টাতে তিনি বাসায় রোগী দেখতেন। তার সাদা সূতির গান্ধী টুপি বানানোর আয় থেকে জাহানারা বেগম সংসারের ইনকামে যোগ করতেন, যেগুলো তিনি চাদনি চকের হিন্দু দোকানদারদের কাছে পাঠাতেন স্তুপে স্তুপে।

মুলাকাত আলী তার পারিবারিক বংশরেখাটিকে চিহ্নিত করতে পারতেন সরাসরি মঙ্গলীয় সম্রাট চাঙ্গেজ খান পর্যন্ত। তার মাধ্যমটি ছিল সম্রাটের দ্বীতিয় পুত্র চাগাতাই। মুলাকাত আলীর কাছে ছিল ফাটা ফাটা একটি চর্মখন্ডের উপর অংকিত বিশদ এক বংশলতিকা আর একটি ছোট টিনের ট্রাঙ্ক ভর্তি ছেড়া, হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজের টুকরা যেগুলো তিনি বিশ্বাস করতেন যে তার দাবীকে প্রতিষ্ঠিত করে আর ব্যাখ্যা করে কিভাবে গোবি মরুভূমি থেকে শামানের বংশধররা, অন্তহীন নীল আকাশের উপাসকরা, যাদেরকে একসময় ইসলামের শত্রু মনে করা হত, হয়ে গেল সেই মোঘল সাম্রাজ্যের পূর্বপুরুষ যারা শত শত বছর ভারতকে শাসন করেছিল, আর কিভাবে মুলাকাত আলীর নিজের পরিবার, বংশধর সেই মোঘলদের, যারা ছিল সুন্নি, হয়ে গেল শিয়া। হঠাৎ হঠাৎ, হয়তো প্রতি কয়েক বছরে একবার, তিনি তার ট্রাঙ্কটি খুলবেন আর তার কাগজগুলি দেখাবেন কোন বেড়াতে আসা সাংবাদিককে যিনি, অধিকাংশ সময়ই, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবেনও না বা তাকে গুরুত্বসহকারেও নেবেন না। খুব বেশী হলে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি একটি কৌতুকপূর্ণ, অদ্ভুত উল্লেখ্য হিসেবে পুরাতন দিল্লীর ওপর সপ্তাহান্তের বিশেষ সংখ্যায় জায়গা পেতে পারে। যদি আয়োজনটি দুই পাতা জুড়ে হয় সেক্ষেত্রে, মুলাকাত আলীর একটি ক্ষুদ্র পোট্রেটও থাকতে পারে সেখানে, সাথে মোঘলদের রান্নাঘরের কিছু কাছ থেকে তোলা ছবি, সরু নোংরা গলিগুলিতে স্তুপ করে থাকা সাইকেল রিক্সায় বসা বোরখা পড়া মহিলাদের দূর থেকে তোলা ছবি, এবং অবশ্যই সেই অতিআবশ্যকীয় উপর থেকে তোলা সাদা টুপি মাথায় হাজার হাজার মুসলিম লোকদের ছবি, নিঁখুত সারিবদ্ধ ভাবে দাড়িয়ে, জামা মসজিদের জামাতের নামাজে রুকু করছে। কিছু পাঠক এই ছবিগুলিকে ইহবাদ ও অন্য ধর্মমত সহিষ্ণুতার ব্যাপারে ভারতের একনিষ্ঠতার সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে দেখতেন। অন্যরা তার মধ্যে একটি ঈষৎ প্রশান্তি মিশ্রিত করতেন যে দিল্লীর মুসলিম জনতাকে দেখে মনে হচ্ছে তারা তাদের প্রাণচন্চল পাড়াটিতে যথেষ্ট সুখেই আছে। তারপরো অন্যরা ছিল যারা এগুলোকে দেখত প্রমাণ হিসেবে যে মুসলিমরা স্বাভাবিক মানুষদের সাথে মিলে নিজেদের জাতিগত ভাবে পূর্ণ করে তোলার কোন ইচ্ছা রাখে না এবং তারা ব্যাস্ত রয়েছে সন্তান উৎপাদনে ও নিজেদেরকে গোছানোতে, আর শীঘ্রই তারা একটা হুমকি হয়ে উঠবে হিন্দু ভারতের জন্যে। এই মতবাদটির অংশীদাররা একটি আশংকাজনক হারে প্রভাব বিস্তার করছিলেন।

খবরের কাগজে কি আসল বা আসল না সেই বিবেচনায় না গিয়ে, ভীতরতি বা অতি অনুরাগবশতঃ মুলাকাত আলী তার ক্ষুদ্র ঘরগুলিতে অতিথিদের স্বাগত জানাতেন একজন পদমর্যাদাবান ব্যাক্তির ম্লান মাধুর্য নিয়ে। তিনি অতীত নিয়ে আলোচনা করতেন দম্ভের সাথে কিন্তু কখনই ব্যাকুলতার সাথে নয়। তিনি বর্ণণা করতেন কিভাবে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, তার পূর্বপুরুষরা একটি সাম্রাজ্য শাসন করেছে যার বিস্তৃতি ছিল যেই দেশগুলো আজকে নিজেদের ডাকে ভিয়েতনাম আর কোরিয়া- তাদের থেকে শুরু করে সেই হাঙ্গেরী আর বালকানস পর্যন্ত, উত্তরের সাইবেরিয়া থেকে শুরু করে ভারতের ডেক্কান মালভূমি পর্যন্ত, যার থেকে বড় কোন সাম্রাজ্য এই বিশ্ব কোনদিন দেখেনি। তিনি বেশির ভাগ সময়েই সাক্ষাৎকারটি সমাপ্ত করতেন তার প্রিয় কবিদের একজন মীর ত্বাকী মীরের একটি দ্বিপদী উর্দু পঙক্তিমালার আবৃত্তি দিয়ে:

       জিস সার কো ঘুরুর আজ হ্যায় ইয়ে তাজ ভারি কা
       কাল উস পে ইয়াহি শোর হ্যায় ফির নওহাগারি কা
   
      যে মস্তক আজ প্রবল দম্ভে মুকুট শোভিত করে
      আগামীকাল সে, ঠিক এখানেই, মহাশোকে ডুবে মরে

তার অধিকাংশ অতিথিরা, একটি নতুন শাসকশ্রেনীর দুর্বিনিত গুপ্তচরগণ, নিজেদের যৌবনজনিত অহমিকার ব্যাপারে অসচেতন যারা, তার ঠিক পুরোপুরি ধরতে পারতেন না তাদের কাছে এই মাত্র নিবেদিত দ্বিপদী কাব্যটির অন্তর্নিহিত অর্থটি কি, যেন কোন তেলে ভাজা খাবার যেটাকে অঙ্গুঠীয়-আকৃতির এক কাপ মিষ্টি ঘন চা পানের মাধ্যমে গলা দিয়ে নামাতে হচ্ছে। এটুকু তারা অবশ্যই বুঝতেন যে এটি ছিল একটি শোকগীতি কোন পতিত সম্রাটের জন্য যার আন্তর্জাতিক সীমানাগুলি সংকুচিত হতে হতে একটা জীর্ণ বস্তিতে এসে ঠেকেছে। সেই বস্তির চতুর্পাশ একটি পুরাতন শহরের ধ্বংসপ্রাপ্ত দেয়াল দিয়ে ঘেরা। আর হ্যাঁ, এটুকুও তারা বুঝত যে একই সাথে মুলাকাত আলীর নিজের দারিদ্রপীড়িত অবস্থা নিয়ে এটি একটি অনুতাপমূলক মন্তব্য ছিল। তাদের কাছে যেটা ধরা দিত না তা হল যে এই দ্বিপদী কাব্যটি ছিল একটি চতুর জলখাবার, একটি ছলনাময় সমুচা, বিলাপে জড়ানো একটি সাবধানবাণী, বেখাপ্পা বিনম্রতায় যাকে নিবেদন করছেন একজন যথেষ্ট বুদ্ধিমান লোক যার পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস ছিল তার শ্রোতাদের উর্দুর অজ্ঞতা নিয়ে, একটি ভাষা যেটি, যারা তাতে কথা বলত তাদের মতই, ধীরে ধীরে মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছিল।

মুলাকাত আলীর কাব্যের প্রতি অনুরাগটি তার হাকিমের পেশা থেকে ভিন্ন একটি শখমাত্র ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কবিতা সারিয়ে তুলতে পারে, অথবা সারিয়ে তোলার পথে অনেক দূর যেতে পারে, প্রায় সকল ব্যাধিকে। তিনি তার রোগীদেরকে কবিতার পরামর্শ দিতেন যেভাবে অন্য হাকিমরা তাদের রোগীদেরকে পরামর্শ দিতেন ঔষধের। তিনি তার বিপুল সংগ্রহ থেকে সবসময়ই একটি দ্বিপদী কাব্য বের করে আনতে পারতেন যেটা রহস্যজনকভাবে যথাযথ ছিল প্রত্যেক অসুস্থতা, প্রত্যেক ঘটনা, প্রত্যেক মেজাজ এবং রাজনৈতিক আবহাওয়ার প্রত্যেক সূক্ষ পরিবর্তনের জন্য। তার এই অভ্যাসটি তার আশেপাশের জীবনকে অনেক বেশী প্রগাঢ় করে তুলত এবং সেই একই সময়ে জীবনের স্বতন্ত্রতাকে কমিয়ে দিত। এটা সবকিছুর মধ্যে একপ্রকার ঔদাসীন্যতার বোধ ঢুকিয়ে দিত, একটা বোধ যে যা কিছু ঘটেছে তা সব ঘটে গেছে আরো আগেই। যে সেগুলো ইতোমধ্যেই লেখা হয়ে গেছে, গাওয়া হয়ে গেছে, তাদের নিয়ে মন্তব্য করা হয়ে গেছে এবং তাদের প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়েছে ইতিহাসের সংগ্রশালায়। যে নতুন কোন কিছু নেই যা সম্ভব। এটা একটা কারণ হতে পারে যে কেন তার আশপাশের কমবয়সীরা প্রায়ই পালিয়ে যেত, হি হি করে হাসতে হাসতে, যখন তারা বুঝত যে একটি দ্বিপদী কাব্য এখন সমাগত।

যখন জাহানারা বেগম তাকে আফতাবের ব্যাপারে বললেন, সম্ভবতঃ জীবনে প্রথমবারের মত মুলাকাত আলীর কাছে পরিস্থিতির উপযুক্ত কোন দ্বিপদী কবিতা ছিল না। প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলে নিতে তার কিছুক্ষণ সময় লাগল। সামলে নেয়ার পর, তিনি স্ত্রীকে খুব বকা দিলেন আগে তাকে না জানানোর জন্য। সময় বদলে গেছে, তিনি বললেন। এটা আধুনিক জামানা। তিনি নিশ্চিত ছিলেন তাদের পুত্রের সমস্যাটির জন্য কোন সরল বৈজ্ঞানিক সমাধান আছে। তারা নিউ দিল্লীতে এখন ডাক্তার খুঁজে বের করবেন, পুরাতন শহরের এই মহল্লায় যে ফিসফাস আর গুজব চলে তার থেকে বহুদূরে। সর্বশক্তিমান তাদেরকেই সহায়তা করে যারা নিজেদের সাহায্য করে, তিনি স্ত্রীকে জানালেন একটু কড়া ভাবে।

এক সপ্তাহ পর, তাদের সবচেয়ে ভাল কাপড়গুলি গায়ে দিয়ে, একটি লৌহ-ধূসর পাঠান স্যুট আর কাল এমব্রোয়ডারী করা ওয়েস্ট-কোট, একটা নামাযের টুপি, আর ভেনিসের নৌকার মত বাঁকানো জুতা পরিহিত এক বিমর্ষ আফতাবকে সঙ্গে নিয়ে, তারা একটি ঘোড়ায় টানা টাঙ্গায় চড়ে রওয়ানা দিলেন নিজামুদ্দিন বস্তির উদ্দেশ্য। তাদের এই বেড়াতে যাওয়ার লোকদেখানো কারণটি ছিল যে তারা একজন সম্ভাব্য কনের পরিদর্শনে চলেছেন তাদের ভাতিজা আজিজের বিয়ের জন্য- সর্বকনিষ্ঠ পুত্র মুলাকাত আলীর বড় ভাইয়ের, কাশেমের, যিনি দেশভাগের পর পাকিস্তান চলে গেছেন এবং বর্তমানে রূহ আফজার করাচি শাখায় কর্মরত ছিলেন। আসল কারণটি হল যে তাদের একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল জনৈক ডাক্তার গুলাম নাবীর সাথে, যিনি নিজের পরিচয় দিতেন একজন যৌনবিশেষজ্ঞ

ডক্টর নাবির নিজের ব্যাপারে অহংকার ছিল যে তিনি একজন সূক্ষ ও বৈজ্ঞানিক মেজাজ সম্পন্ন স্পষ্ট-কথার লোক। আফতাবকে ভালমত দেখে টেখে তিনি বললেন আফতাব আসলে ঠিক, চিকিৎবিজ্ঞানের ভাষায়, হিজড়া নয়-মানে পুরুষের শরীরে বন্দী হয়ে পড়া একজন নারী না- যদিও ব্যাবহারিক উদ্দেশ্য এই শব্দটি ব্যাবহার করা যেতে পারে, তিনি বললেন, সে হল উভলিঙ্গের এক বিরল উদাহরণ, যার নারী এবং পুরুষ দুটো বৈশিষ্ট্যই আছে, যদিও বাহ্যিকভাবে, পৌরষিক বৈশিষ্ট্যগুলোকেই দেখা যাচ্ছে বেশী প্রকট। তিনি জানালেন তিনি একজন সার্জনের নাম দিতে পারেন যিনি নারী-অঙ্গটা বন্ধ করে ফেলবেন, সেলাই দিয়ে দিবেন ওটাকে। তিনি কিছু ঔষধপত্রও লিখে দিবেন। কিন্তু, তিনি বলে দিলেন, সমস্যাটি শুধুমাত্র বাহ্যিক নয়। চিকিৎসা যেথায় নিশ্চিতভাবেই সাহায্য করবে, কিছু হিজড়াসুলভ প্রবণতা থেকেই যাবে যেগুলি কখনই চলে যাওয়ার কথা না। (প্রবণতার জন্য তিনি ফিতরাত শব্দটি ব্যাবহার করেছিলেন)। পুরোপুরি সফলতার ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত করতে পারবেন না। মুলাকাত আলী, খড়কুটো আঁকড়ে ধরতেও প্রস্তুত, অনুপ্রাণিত হলেন। প্রবণতা? তিনি বললেন। প্রবণতা কোন সমস্যা না। সবারই থাকে কিছু না কিছু প্রবণতা.....প্রবণতা সবসময়ই ঠিক করে ফেলা যায়।

এখন, ডক্টর নাবীর কাছে যাওয়াটা, মুলাকাত আলীর বিচারে আফতাবের যেটা দুর্ভোগ, তার কোন তাৎক্ষণিক সমাধান না দিলেও, মুলাকাত আলীর এখানে বেশ ভাল পরিমাণ একটা উপকার করল বটে। তিনি দিক নির্দেশনা পেলেন নিজের একটি অবস্থান নির্দিষ্ট করার জন্য, নিজের জাহাজটিকে স্থির করার জন্য যেটা একটি দ্বিপদী কাব্যশূণ্য দুর্বোধ্যতার মহাসমুদ্রে বিপদজনকভাবে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এখন তিনি তার মনোঃকষ্টকে একটি বাস্তব সমস্যায় পাল্টে নিতে পারবেন আর তার শক্তি আর মনোযোগকে এমন কিছুর দিকে নিতে পারবেন যা তিনি ভাল বোঝেন: কিভাবে সার্জারির জন্য টাকা ওঠানো যায়?

তিনি গৃহস্থালী খরচ কমিয়ে আনলেন এবং টাকা ধার করা যেতে পারে এমন লোকজন এবং আত্নীয়দের একটি তালিকা এঁকে ফেললেন। একই সাথে, তিনি আফতাবের অন্তরে পৌরষিকতা প্রবেশ করানোর সাংস্কৃতিক প্রকল্পটিও হাতে নিলেন। তিনি তার ভিতর নিজের কাব্যপ্রেমটি ছড়িয়ে দিলেন এবং তার ঠুমরী আর চৈতী গাওয়াকে নিরুৎসাহিত করলেন। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতেন তিনি, গল্প বলতেন আফতাবকে তাদের যোদ্ধা পূর্বপুরুষদের এবং যুদ্ধের ময়দানে তাদের শৌর্যবীর্যের। আফতাবের ওপর এগুলো কোন প্রভাব ফেলত না। কিন্তু যখন সে ঐ গল্পটা শুনল যে কিভাবে তেমুজিন- চাঙ্গেজ খান- জিতে নিয়েছিলেন তার সুন্দরী স্ত্রী, বোর্তে খাতুনকে, কিভাবে সেই মহিলাকে লুন্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছিল একটি শত্রু গোষ্ঠী আর কিভাবে তেমুজিন বলতে গেলে একদম একাই একটা পুরো সৈন্য বাহিনীর সাথে লড়াই করেছিল কারণ এত ভালবাসতেন তিনি তাকে, আফতাব নিজেকে খেয়াল করল সে বোর্তে খাতুন হতে চাচ্ছে।

তার ভাই আর বোনারা যখন স্কুলে যেত, আফতাব তার বাসার ছোট বারান্দায় ঘন্টা পর ঘন্টা কাটিয়ে দিত নীচে চিতলী কাবারের দিকে তাকিয়ে- লোকের কথিত  অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাসম্পন্ন, গায়ে ফোটাফোটা দাগওয়ালা সেই ছাগলটার ছোট্ট দর্গাটি - আর তার পাশ দিয়ে যে ব্যাস্ত রাস্তাটি বয়ে গেছে এবং গিয়ে যুক্ত হয়েছে মাতিয়া মহল চকের সাথে। সে দ্রুতই এই প্রতিবেশী এলাকাটির তাল আর লয়টি শিখে ফেলল, যেটা ছিল মূলতঃ উর্দু খিস্তির একটি বিরতিহীন স্রোত- তোর মারে চুদি, তোর বোনরে গিয়া চোদ, তোর মায়ের ভোদার কসম- যেটাতে ভাটা পড়ত দিনে পাঁচবার জামা মসজিদ এবং পুরাতন শহরের অন্যান্য ছোট ছোট মসজিদগুলি থেকে নামাজের আযান ভেসে আসার সময়। যখন আফতাব কঠোর নজর রাখত, দিনের পর দিন, তেমন বিশেষ কোন কিছুর উপর নয়, গুড্ডু ভাই, সাত-সকালের উগ্র মাছওয়ালাটি যে তার ঝিকমিকে তাজা মাছের ঠেলাগাড়িটা চকের একদম মাঝখানে রাখত, ঠিকই, যেমন অবশ্যই সূর্য পুর্ব দিকে উঠে আর অস্ত যায় পশ্চিমে, প্রসারিত হয়ে পরিণত হত ওয়াসিমে, সেই লম্বা, অমায়িক দুপুরবেলার নান খাটাই- বেচা লোকটা যে তারপর সংকুচিত হয়ে ইউনুস হয়ে যেত, সেই ছোট, শীর্ণ, সন্ধ্যাবেলার ফল বিক্রেতা, যিনি, বেশ রাত হলে, প্রশস্ত হয়ে আর ফুলে হাসান মিয়া হয়ে যেতেন, মাতিয়া মহলের শ্রেষ্ঠ খাসীর বিরিয়ানীর সেই গাট্টাগোট্টা দোকানদারটি, যে তামার এক বিশাল হাড়ি থেকে বিরিয়ানী বেড়ে দিত। এক বসন্তের সকালে আফতাব একটা লম্বা, সরু-নিতম্বের, খুব উগ্র লিপস্টিক দেয়া, সোনালী হাই-হিল আর ঝলমলে সবুজ সাতিনের সালওয়ার কামিজ পরা মহিলাকে দেখল চুড়ি কিনতে মীর যিনি চুড়ি বেচতেন তার কাছ থেকে যে আবার একই সাথে চিতলী-কাবারের দেখভালকারীও ছিলেন। প্রতি রাতে সে তার চুড়িগুলো মাজারের ভিতরে ভরে রাখত যখন যে দর্গা আর দোকান বন্ধ করত।(তিনি এটুকু নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে কর্মঘন্টাগুলি একে অন্যের সাথে মিলে যাবে।) লম্বা লিপস্টিক দেয়া মহিলাটির মত কাউকে কোনদিন দেখেনি আফতাব। খাড়া খাড়া সিড়িগুলি দিয়ে দৌড়ে সে দ্রুত রাস্তায় নামল আর তাকে চুপিচুপি অনুসরণ করতে লাগল যতক্ষণে মহিলা খাসির পায়া কিনল, চুলের ক্লিপ, পেয়ারা কিনল আর নিজের স্যান্ডেলের ফিতাটা ঠিক করল।
আফতাব ঐ মহিলাটি হতে চেয়েছিল।
আফতাব সমস্ত রাস্তা ধরে তাকে অনুসরণ করে একেবারে টার্কম্যান গেট পর্যন্ত আসল আর দাড়িয়ে রইল দীর্ঘক্ষণ নীল দরজাটার সামনে যার পেছনে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কোন সাধারণ মহিলাকে শাহজাহানবাদের রাস্তায় এরকম সাজগোজ করে অবলীলায় চলাফেরা করতে দেয়ার কথা না। শাহজাহানবাদে সাধারণ মহিলারা বোরখা পড়ত বা অন্তত তাদের হাতের তালু আর পায়ের পাতা ব্যাতীত নিজেদের মাথা আর সমস্ত শরীর ঢাকত। যে মহিলাটির পিছু আফতাব নিয়েছিল সে সাজতে পারত যেভাবে সে সেজেছিল আর হাঁটতে পারত যেভাবে সে হেঁটেছিল একমাত্র এই কারণে যে সে একজন মহিলা নয়। যাই হোক না কেন সে, আফতাব ঐ মহিলাটি হতে চেয়েছিল। সে যতটা না বোর্তে খাতুন হতে চেয়েছিল তার চেয়েও বেশী হতে চেয়েছিল ঐ মহিলাটি। সে তার মত ঝিকমিকিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল গোশতের দোকানগুলির পাশ দিয়ে যেখানে চামড়া ছাড়ানো ছাগলের আস্ত আস্ত তাজা দেহগুলি ঝুলে রয়েছে মাংসের মহাপ্রাচীরের মত; সে অকারণে হাসতে হাসতে নিউ লাইফস্টাইল মেনস হেয়ার ড্রেসিং সেলুনের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে চেয়েছিল যেখানে ইলিয়াস নাপিতটা লিয়াকাত নামের সুঠান কমবয়সী কসাইটার চুল কাটে আর ব্রায়ালক্রিম দিয়ে চকচকে করে তোলে। সে চেয়েছিল নখে রঙ করা আর কব্জি ভর্তি চুড়িওয়ালা একটা হাত মেলে ধরতে আর দরদাম করে দাম কমানোর আগে আলতো করে একটা মাছের কানকো উঠিয়ে দেখতে যে মাছটা কতটুকু তাজা। রাস্তার জমাট জলের ওখান দিয়ে পা ফেলার আগে ছেলেটা চেয়েছিল তার সালোয়ার কামিজটা অল্প করে উঠিয়ে নিতে- সামান্য যতটুকুতে তার পায়ের রুপালী নুপুরগুলি দেখানো যায়।
আফতাবের নারী-অঙ্গটি যে সেটা শুধুই একটি উপাঙ্গ মাত্র ছিল, এমন নয়।
গানের ক্লাস আর লম্বা মহিলাটা গালি ডাকোতানের যেই বাসায় থাকত সেটার নীল দরজাটির বাইরে ঘোরাঘুরির মধ্যে আফতাব তার সময়কে ভাগ করতে শুরু করল। সে জানতে পারল যে মহিলাটির নাম ছিল বোম্বে সিল্ক এবং  তার মত আরও সাতজন ওখানে আছে, বুলবুল, রাজিয়া, হীরা, বেবি, নিম্মো, ম্যারি, আর গুড়িয়া, যারা একসাথে থাকত নীল দরজাওয়ালা সেই হাওয়েলিতে, আর তাদের ছিল একজন উস্তাদ, একজন গুরু, নাম ছিল যার কুলসুম বাঈ, তাদের অন্য সবার থেকে বয়সে বড়, যে ছিল সেই গৃহস্থালীটির প্রধান। আফতাব জেনেছিল তাদের বাড়িটার নাম খোয়াবগহ্ স্বপ্নের বাড়ি।

প্রথমদিকে তাকে তাড়িয়ে দূর করে দেয়া হত কারণ সবাই, যার মধ্যে রয়েছেন খোয়াবগহের বাসিন্দারাও, মুলাকাত আলীকে চিনত আর তার বিরাগভাজন হওয়ার কোন ইচ্ছা তাদের ছিল না। কিন্তু কিছু যায় আসত না যত হুঁশীয়ারী আর শাস্তিই অপেক্ষা করুক তার জন্যে, আফতাব একগুঁয়ের মত তার জায়গাটিতে ফিরে আসত, দিনের পর দিন। তার জগতে এটাই ছিল একমাত্র জায়গা যেখানে তার এমন লাগত যে বাতাস তার জন্য জায়গা করে দিচ্ছে। যখন সে আসত, বাতাসটা মনে হত সরে গেল, একদিকে চেপে গেল, যেন একটা স্কুলের বন্ধু ক্লাসরুমের বেন্চে তার বসার ব্যাবস্থা করে দিচ্ছে। কয়েকমাসের একটি সময়কাল পরে, টুকটাক কাজ করে দিয়ে, তাদের ব্যাগ আর বাদ্যযন্ত্র বহন করে যখন বাসিন্দারা তাদের শহর পরিভ্রমণে বেরোত, একটা কর্মময় দিনের শেষে তাদের পা গুলি মালিশ করে দিয়ে, শেষ পর্যন্ত আফতাব খোয়াবগহের অভ্যান্তরে নিজের প্রবেশাধিকার অর্জন করতে পারল। অবশেষে সেই দিন আসল যখন তাকে ভিতরে যেতে দেয়া হল। সে অতিসাধারণ, ভেঙে-পড়া সেই বাড়িটাতে ঢুকল যেন সে স্বর্গের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে।

নীল দরজাটা খুলল একটা ইট বসানো উঁচু দেয়ালঘেরা উঠানে যার এক কোনায় একটা চাপকল আরেক কোনায় একটা ডালিম গাছ। লম্বা লম্বা খাঁজ কাটা কলামের একটা গভীর বারান্দার পেছনে দুটো ঘর ওঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে একটা ঘরের ছাদ ধ্বসে গিয়েছে আর দেয়াল ভেঙে গুড়িয়ে ইট পাথরের একটা স্তুপে পরিণত হয়েছে যেখানে একটা বিড়ালের পরিবার নিজেদের সংসার পেতেছে। যে ঘরটা লুটিয়ে পড়েনি সেটা বেশ বড়, এবং ভাল অবস্থাতেই ছিল। ঘরটির চুনকাম উঠতে থাকা, হালকা সবুজ বর্ণের দেয়ালগুলোর গায়ে সারিবদ্ধ ভাবে লেগে ছিল চারটি কাঠের এবং দুটো গোদরেজের আলমারি যেগুলো ঢাকা পড়েছিল ফিল্ম তারকাদের ছবি দিয়ে- মধুবালা, ওয়াহিদা রেহমান, নার্গিস, দিলীপ কুমার(আসলে যার নাম ছিল মুহাম্মাস ইউসুফ খান), গুরু দত্ত, আর স্থানীয় যুবক জনি ওয়াকার(বদরুদ্দিন জামালুদ্দিন কাজী), যেই কৌতুকাভিনেতা পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী লোকটিকেও হাসাতে পারেন। আরেকটা আলমারির দরজার উপর লাগানো ছিল একটা ম্লান, পূর্ন-দৈর্ঘ্য আয়না। আরেক কোনায় ছিল একটা বহুল ব্যাবহৃত পুরাতন ড্রেসিঙ টেবিল। উপরের উঁচু ছাদ থেকে ঝুলছিল একটা কোনাওঠা ভাঙা ঝাড়বাতি যার একটামাত্র বাল্ব কাজ করছিল, আর একটা লম্বা-রডের গোড়ায় একটা গাঢ় বাদামী ফ্যান। ফ্যানটির কিছু মানবীয় গুণাবলী ছিল- সে ছিল লাজুক, মেজাজী এবং যার হাবভাব বোঝা দায়। তার একটা নামও ছিল, উষা। উষা এখন ঠিক আর যুবতীটি নেই, আর বেশীরভাগ সময় তাকে মিষ্টি কথা দিয়ে ভুলাতে হত আর লম্বাহাতলের একটা ঝাড়ু দিয়ে ঠেলা দিতে হত এবং তারপরই সে কাজে যেত, একটা গতিহীন পোলনর্তকীর মত চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে। হাওয়েলির একমাত্র বিছানাটিতে উস্তাদ কুলসুম বাঈ ঘুমাত। সাথে থাকত তার টিয়াপাখি, বিরবল, তার মাথার উপরের ঝুলন্ত খাচায়। রাতে কুলসুম বাঈ তার কাছে না থাকলে বিরবল এমনভাবে চিৎকার করত যেন তাকে জবাই করে ফেলা হচ্ছে। তার জাগ্রত ঘন্টাগুলিতে বিরবল কিছু অস্ত্র-প্রমাণ গালিগালাজে পারদর্শী ছিল যাদের শুরুটা হত সবসময়ই অর্ধ-বিদ্রুপ আর অর্ধ-প্রণয়কৌতুক মিশ্রিত সেই আই-হাই! দিয়ে, যেটা সে শিখেছিল তার অন্যান্য গৃহসংগীদের কাছে থেকে। বিরবলের সবচেয়ে পছন্দের গালিটি ছিল যেটা প্রায়ই শোনা যেত খোয়াবগহে: সালি রান্ডি হিজরা (বাইনচোদ হিজরা মাগী)। বিরবল সবকটা রুপাভেদ জানত। এটা সে বিড়বিড় করতে পারত, বলতে পারত সামান্য প্রেম-প্রেম ভাব নিয়ে, ঠাট্টা করে, আদর করে, আর প্রকৃত তিক্ত ক্রোধ সহকারে।

অন্য সবাই ঘুমাত বারান্দায়, তাদের বিছানাপত্র দিনের বেলায় গুটানো থাকতো বিশাল বিশাল কোলবালিশের মত। শীতের দিনে, যখন উঠানটা ঠান্ডা আর স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যেত, সবাই মিলে তখন ভীড় করত কুলসুম বাঈয়ের ঘরে। টয়লেটে যাওয়ার রাস্তাটি ছিল লুটিয়ে পড়া ঘরটির ধ্বংসস্তুপের মধ্য দিয়ে। চাপকলটিতে গোসলের জন্য সবাই পালাবদল করত। একটা আজব ধরণের খাড়া, সরু সিড়ি গিয়ে উঠেছিল প্রথমতলার রান্নাঘরটিতে। রান্নাঘরের জানালাটি দিয়ে হলি ট্রিনিটি চার্চের গম্বুজ দেখা যেত।

ম্যারি ছিল খোয়াবগহের বাসিন্দাগনের মধ্যে একমাত্র ক্রিশ্চান। সে গির্জায় যেত না, কিন্তু গলায় একটা ছোট ক্রুশ ঝোলাত। গুড়িয়া আর বুলবুল দুজনেই হিন্দু ছিল আর মাঝে মাঝে যেসব মন্দির তাদের ঢুকতে দিত সেগুলোতে যেত। বাকীরা ছিল মুসলিম। তারা জামা মসজিদে যেত আর সেসব দর্গায় যেত যেগুলো তাদের অনুমতি দিত ভেতরের কক্ষগুলিতে যাওয়ার (কারণ জীববিজ্ঞানের বিচারে যারা নারী তাদের মত, হিজরাদেরকে অপবিত্র বিবেচনা করা হত না যেহেতু তাদের রজঃক্রিয়া নেই)। খোয়াবগহের সবচেয়ে পৌরষিক ব্যাক্তিটি অবশ্য, রজঃস্বলা ছিলেন বটে। বিসমিল্লা ওপরতলায় রান্নাঘরের মেঝেতে ঘুমাতেন। সে ছিল একজন ছোটখাট, পাকানো শরীরের, কৃষ্ণগাত্রের রমণী যার বাসের হর্ণের মত একটা গলার আওয়াজ ছিল। তিনি ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন এবং খোয়াবগহে এসে উঠেছিলেন কয়েক বছর আগে(এই ঘটনাদ্বয়ের মাঝে কোন সংযোগ নেই), যখন তার স্বামী, দিল্লী ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের একজন বাস ড্রাইভার, তাকে তাদের ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন কোন সন্তান তাকে জন্ম দিতে না পারার জন্য। অবশ্যই তার এটা কোন দিনই মাথায় আসেনি যে তাদের সন্তানহীনতার জন্য সে নিজেও একইভাবে দায়ী থাকতে পারে। বিসমিল্লা (পূর্বে বিমলা) রান্নাঘরটা দেখতেন আর একজন পেশাদার শিকাগোর গুন্ডার হিংস্রতা আর ক্রুরতা নিয়ে খোয়াবগহকে পাহারা দিতেন বাহিরের অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশকারীদের থেকে। তার প্রকাশ্য অনুমতি ব্যাতীত কমবয়সী ছেলেদের খোয়াবগহতে প্রবেশ করা কঠোরভাবে নিষেধ ছিল। এমনকি নিয়মিত খদ্দেরদেরকেও, যেমন আনজুমের ভবিষ্যত অতিথি- ইংলিশ জানত যে লোকটা- ভেতরে ঢুকতে দেয়া হত না এবং তাদেরকে নিজস্ব ব্যাবস্থা করে নিতে হত নিজেদের সাক্ষাতের জন্য। রান্নাঘরের চত্বরে বিমলার সাথী ছিল রাজিয়া, যার বিচারবুদ্ধির বিনাশ ঘটেছিল আর একই সাথে স্মৃতিবিলুপ্তিও এবং এখন আর সে জানত না সে কে ছিল অথবা কোথা থেকে সে আসল। রাজিয়া কোন হিজরা ছিল না। সে ছিল একজন পুরুষ যে মেয়েদের কাপড়ে সাজতে পছন্দ করত। তবে, সে আবার চাইত না যে তাকে মহিলা ভাবা হোক, বরন্চ সে একজন পুরুষ যে মহিলা হতে চায়। লোকজনের কাছে (যার মধ্যে হিজড়ারাও আছেন) পার্থক্যটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টাটি সে বহু আগেই বন্ধ করে দিয়েছে। রাজিয়া তার দিন কাটাত ছাদের কবুতরদের খাইয়ে আর সকল আলোচনার মোড় একটি গোপন, অব্যাবহৃত সরকারী চক্রান্তের(দাও-পেচ, সে বলত সেটাকে) দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে যেটা সে আবিষ্কার করেছে হিজড়াগণ আর তার মত মানুষদেরকে নিয়ে। চক্রান্তটি অনুসারে, তারা সবাই একসাথে থাকবে একটা আবাসন প্রকল্পের মত কলোনিতে আর তাদেরকে সরকারী ভাতা দেয়া হবে এবং জীবিকা রোজগারের জন্য তাদেরকে আর যেটা রাজিয়ার বর্ণণায়- বেত্তমিযি- আজেবাজে আচরণ- সেটা করতে হবে না। রাজিয়ার অন্য আলোচ্য বস্তুটি ছিল রাস্তার বিড়ালদের জন্য সরকারী ভাতা নিয়ে। কোন এক কারণে তার স্মৃতিহীন, বাঁধনহীন মনটা সবসময় অভ্রান্তভাবে সরকারী চক্রান্তের দিকে নিজেকে ঘুরিয়ে নিত।

খোয়াবগহতে আফতাবের প্রথম প্রকৃত বন্ধুটি ছিল নিম্মো গোরাখপুরী, তাদের সবার মধ্যে কমবয়সী এবং একমাত্র ব্যাক্তি যে হাইস্কুল শেষ করেছে। নিম্মো পালিয়ে এসেছে তার গোরাখপুরের বাড়ি থেকে যেখানে তার বাবা জৈষ্ঠ- বিভাগীয়- কেরানী হিসেবে কাজ করত প্রধান ডাক অধিদপ্তরে। যদিও সে অনেক বেশী বড় হওয়ার একটা ভাব ধরত, আসলে নিম্মো আফতাবের থেকে মাত্র ছয় কি সাত বছরের বড় ছিল। সে ছিল বেঁটে আর গোলাগাল, সাথে ঘন, কোকড়ানো চুল, পুরাতন তুর্কী তালোয়ারের মত বাঁকানো মারাত্নক একজোড়া ভুরু, আর অসামান্য রকমের ঘন আঁখিপল্লব। সে হয়তো সুন্দরী হত কিন্তু সমস্যা ছিল তার মুখমন্ডলের দ্রুত বর্ধনশীল কেশমালা যাদের কারণে মেকআপের নীচে তার গালের চামড়াগুলোকে নীল দেখাত, এমনকী সে শেভ করার পরেও। পশ্চিমা নারীদের ফ্যাশন নিয়ে নিম্মোর আগ্রহটি ছিল আচ্ছন্নতার পর্যায়ে এবং সে হিংস্রভাবে রক্ষণমূলক ছিল নিজের ফ্যাশন ম্যাগাজিনের সংগ্রহটির ব্যাপারে যেগুলির যোগাড় হয়েছিল দারিয়াগন্জের রাস্তার উপর রবিবারের পুরাতন বই বাজার থেকে, খোয়াবগহ থেকে একটি পাঁচ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে। বইবিক্রেতাদের একজন, নওশাদ, যে শান্তিপাথের দূতাবাসে চাকরী করা বর্জ্য সংগ্রাহকদের কাছ থেকে তার ম্যাগাজিনের যোগানটি কিনত, সেগুলোকে একপাশ আলাদা করে রাখত, আর নিম্মোর কাছে বেচত একটা ব্যাপক মূল্যহ্রাসে।

তুমি জান কেন ঈশ্বর হিজড়াদের বানালেন? সে আফতাবকে জিজ্ঞেস করল একদিন দুপুরে কোনা বেঁকে যাওয়া একটা ভোওগ ম্যাগানিজের ১৯৬৭ সালের সংখ্যার পাতা উল্টাতে উল্টাতে, সামান্য থেমে গিয়ে উন্মোচিত ফর্সা ফর্সা পা-ওয়ালা ব্লন্ড মেয়েগুলির উপর যারা তাকে মুগ্ধ করত খুব।

না , কেন?
এটা একটা পরীক্ষা ছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এমন কিছু একটা সৃষ্টি করার, একটা জীবিত প্রাণী যেটার সুখী হওয়ার ক্ষমতা নেই। তাই, তিনি আমাদের বানালেন।
একটা শারীরিক আঘাতের শক্তি নিয়ে তার কথাগুলো আফতাবকে আক্রমণ করল। এটা তুমি কিভাবে বললা? এখানে তোমারা সবাই সুখে আছো! এটা হচ্ছে সেই স্বপ্নের বাড়ি! উদীয়মান উৎকন্ঠা নিয়ে, সে বলল।

কে সুখী এখানে? সবটাই ছলনা আর অভিনয়, নিম্মো স্বল্পবাক্যে বলল, ম্যাগাজিনের থেকে চোখ তোলারও প্রয়োজন বোধ না করল না। কেউ এখানে সুখী না। সেটা সম্ভবই না। আরে ইয়ার, চিন্তা করে দেখো, কোন জিনিষগুলো নিয়ে তোমরা সাধারণ লোকেরা অসুখী হও? মানে আমি তোমার কথা বলছি না, কিন্তু তোমার মত বয়স্করা কি তাদেরকে অসুখী করে? দাম-বাড়া, বাচ্চাদের স্কুলে-ভর্তি, স্বামীর মারধোর, বউয়ের ধোঁকা, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ- বাইরের জিনিষপত্র যেগুলো ঠিক হয়ে যায় একটা সময়ে। কিন্তু আমাদের জন্য দাম-বাড়া আর স্কুলে-ভর্তি আর মারধোর করা স্বামী আর ধোঁকা দেয়া বউ সবটাই আমাদের ভিতরে। দাঙ্গাটা আমাদের ভিতের। যুদ্ধটা আমাদের ভিতরে। ভারত-পাকিস্তান আমাদের ভিতরে। এটা কোনদিনই ঠিক হবে যাবে না। হতে পারে না।

আফতাব ব্যাকুলভাবে তাকে ভুল প্রমাণ করতে চাইল, তাকে বলতে চাইল যে সে মারাত্নক ভুল বলেছে, কারণ সে সুখী ছিল, যতটা না সুখী সে ছিল আগে কোনদিন। সে জীবন্ত প্রমাণ ছিল যে নিম্মো গোরাখপুরী ভুল, ছিল না সে? কিন্তু সে কিছুই বলল না, কারণ সেটার মধ্যে তার নিজের ব্যাপারে প্রকাশ করাটা চলে আসবে যে সে একজন সাধারণ মানুষ না, যেটা করতে এখনও প্রস্তুত সে নয়।

একমাত্র যখন তার বয়স চৌদ্দ হল, যতদিনে নিম্মো খোয়াবগহকে থেকে পালিয়ে গিয়েছিল একজন স্টেট ট্রান্সপোর্ট বাসের ড্রাইভারের হাত ধরে (যে কিছুদিন পরেই নিম্মোকে ছেড়ে দিল আর নিজের পরিবারের কাছে ফেরত গেল), যে আফতাব বুঝতে পারল নিম্মো ঠিক কি বুঝিয়েছিল। তার শরীর হঠাৎ করেই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ফেলেছে। সে হয়ে উঠল লম্বা আর পেশীবহুল। এবং লোমশ। অতি আতঙ্কবশতঃ সে তার চেহারা আর শরীরের লোমগুলো উঠানোর চেষ্টা করল বার্নোল দিয়ে- একটা ফোস্কার মলম যেটা তার চামড়ার উপর কাল কাল দাগ ফেলে দিল। এরপর যে ব্যাবহার করে দেখল অ্যান্নে ফ্রেন্চ ক্রীম হেয়ার রিমুভার যেটা সে তার বোনদের কাছে থেকে চুরি করেছিল(সে দ্রুতই ধরা পরে গিয়েছিল কারণ সেটার গন্ধটা ছিল একটা খোলা নর্দমার মত)। সে তার ঝোপের মত ঘন ভুরুর লোমগুলোকে উপড়ে দুটো সরু, প্রতিসম, চন্দ্রে পরিণত করেছিল বাসায় বানানো একজোড়া সন্না দিয়ে যেগুলো দেখতে লাগত সাড়াশির মত। ধীরে ধীরে তার একটা কন্ঠমণি দেখা দিল যেটা দ্রুত ওপর নীচে ওঠানামা করত। তার ইচ্ছা করত গলা থেকে ওটাকে ছিড়ে বের করে ফেলতে। সবচেয়ে নিষ্ঠুর বিশ্বাসঘাতকতাটি এল এরপর- যে জিনিসটার ব্যাপারে তার কিছুই করার ছিল না। তার কন্ঠস্বর ভেঙে গেল। একটা গভীর, শক্তিশালী পুরুষের গলার স্বর দেখা দিল তার মিষ্টি, চিকন কন্ঠের জায়গায়। তার ঘেন্না হত সেটাকে এবং নিজের কাছে ভয় লাগত যখনই সে কথা বলত। সে চুপচাপ হয়ে গেল, আর কথা বলত একমাত্র একটা শেষ সম্বল হিসেবে, যখন তার হাতে আর কোন উপায় নেই। যখন সে গান শুনত, মনোযোগ দিচ্ছে এমন যে কেউ খেয়াল করত একটা চিকন, প্রায় শোনাই যায় না, পোকার-মত গুনগুন শব্দ যেটা মনে হত যে আফতাবের মাথার উপরের কোন সুক্ষ-ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসছে। এমন কোন প্রকার যুক্তি উপদেশ ছিল না, এমন কি খোদ উস্তাদ হামিদ খানের কাছ থেকেও, যে ভুলিয়ে ভালিয়ে একটা গান বের করতে পারবে আফতাবের থেকে। সে আর কোনদিন গান গায় নি, একমাত্র পার্থক্য যখন সে হিন্দী ফিল্মের গান নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করত হিজড়াদের অশ্লীল আড্ডাগুলিতে অথবা যখন (তাদের পেশাগত কারণে) তারা আবির্ভুত হত সাধারণ লোকদের উৎসবগুলিতে- বিয়ে, জন্ম, গৃহপ্রবেশের অনুষ্ঠানগুলিতে- নাচতে নাচতে, তাদের বণ্য, খসখসে কন্ঠে গাইতে গাইতে, নিজেদের আশীর্বাদ নিবেদন করত আর হুমকি দিত গৃহকর্তাকে লজ্জিত করার (তাদের বিকৃত গোপনাঙ্গ গুলি অতিথিদের সামনে উন্মোচিত করার মাধ্যমে) আর উপলক্ষ্যটিকে নষ্ট করে দিত খিস্তিখেউড় করে আর অচিন্তনীয় অশ্লীলতার প্রদর্শন করে যদিনা তাদেরকে একটা সম্মানী দেয়া হত।(এটার কথাই রাজিয়া বুঝিয়েছিল যখন সে বলেছিল বেত্তমিযি আর যেটা নিম্মো গোরাখপুরী বুঝিয়েছিল যখন সে বলেছিল, আমরা হায়েনা যারা অন্য মানুষদের সুখের উপর খাওয়াদাওয়া করে বেঁচে থাকি, আমরা সুখ-শিকারী। তার ব্যাবহৃত শব্দমালাটি ছিল খুশি-খোড়।)

একবার যখন সংগীত আফতাবের সঙ্গ ত্যাগ করল তার কাছে আর কোন কারণ রইল না সেখানে বাস করতে থাকার যেটাকে অধিকাংশ সাধারণ মানুষ মনে করত বাস্তব জগত- হিজড়ারা বলত যেটাকে দুনিয়া, বিশ্ব। একরাতে সে কিছু টাকা আর তার বোনদের ভাল কাপড়গুলি চুরি করল আর থাকতে চলে আসল খোয়াবগহে। জাহানারা বেগম, কখনই তার লাজুকতার জন্য পরিচিত ছিলেন না, আফতাবকে ফিরে পাওয়ার জন্য রীতিমত হামলা করে খোয়াবগহে ঢুকে পড়লেন। আফতাব চলে আসতে রাজি হল না। তিনি অবশেষে ফিরে গেলেন উস্তাদ কুলসুম বাইকে প্রতিজ্ঞা করানোর পর যে সপ্তাহান্তে, অন্তত, আফতাবকে সাধারণ ছেলেদের পোশাক পড়ানো হবে আর বাসায় পাঠানো হবে। উস্তাদ কুলসুম বাঈ নিজের প্রতিজ্ঞার মান রাখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেই ব্যাবস্থাটি টিকেছিল মাত্র কয়েক মাসের জন্য।

আর তাই, পনের বছর বছর বয়সে, সেখান থেকে মাত্র কয়েকশ গজ দূরে যেখানে তার পরিবার শত শত বছর ধরে বসবাস করেছে, একটা সাধারণ দরজার মধ্য দিয়ে আফতাব পা রাখল আরেকটি ব্রক্ষান্ডে। খোয়াবগহের একজন স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে তার প্রথম রাতে, সে উঠানের মধ্যে সবার প্রিয় চলচ্চিত্র থেকে সবার প্রিয় গানের সাথে নাচল- মুঘলে আযম থেকে পিয়ার কিয়া তো ডারনা কিয়া। দ্বীতিয় রাতে একটা ছোট উৎসবে তাকে উপহার দেয়া হল একটা সবুজ খোয়াবগহ দোপাট্টা আর দীক্ষিত করা হল নিয়ম আর রীতিতে যেটা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে হিজড়া সম্প্রদায়ের একজন সদস্য বানিয়ে দিল। আফতাব হয়ে গেল আনজুম, শিষ্য উস্তাদ কুলসুম বাঈয়ের যিনি দিল্লী ঘরানার, যেটা দেশের সাতটি আন্চলিক হিজড়া ঘরাণার একটি, প্রত্যকটির নেতৃত্বে একজন নায়াক, একজন অধিপতি, তাদের সবার নেতৃত্বে একজন মহান অধিপতি।

যদিও জাহানারা বেগম ওখানে আর কোনদিন তার কাছে যাননি, বছরের পর বছর তিনি খোয়াবগহে প্রতিদিন একবেলার একটা গরম খাবার পাঠাতে লাগলেন। একমাত্র যেই জায়গাটিতে তিনি আর আনজুম দেখা করতেন সেটা ছিল হযরত শারমাদ শহীদের দর্গা। সেখানে তারা একসাথে বসে থাকতেন কিছুক্ষণের জন্য, আনজুম প্রায় ছয় ফিটের মত লম্বা তখন, তার মাথাটি প্রশান্তভাবে ঢাকা একটা চুমকি বসানো ওড়নায়, আর ক্ষুদ্র জাহানারা বেগম, যার চুল ধূসর হতে শুরু করেছে তার কাল বোরখার নীচে। মাঝেমাঝে, তারা একে অন্যের হাত ধরতেন চুপি চুপি। মুলাকাত আলী তার দিক থেকে এই পরিস্থিতি অতটা মেনে নিতে পারেন নি। তার ভগ্ন হৃদয় কোনদিই আর জোড়া লাগে নি। যদিও তিনি তার সাক্ষাৎকারগুলি দেয়া চালু রেখেছিলেন, তিনি কখনই ব্যাক্তিগতভাবে বা জনসম্মুখে বলতেন না সেই দুর্ভাগ্যের কথা যেটা চাঙ্গেজ খানের সাম্রাজ্যের উপর পতিত হয়েছে। তিনি তার পুত্রের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করাকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি আর কোনদিন আনজুমের সাথে দেখা করেননি বা তার সাথে কথা বলেননি। হঠাৎ হঠাৎ তারা রাস্তায় একে অন্যকে পাশ কাটিয়ে যেত এবং দৃষ্টি বিনিময় করত, কিন্তু কখনই সম্ভাষণ নয়। কোনদিন নয়।

বছরগুলির পরিক্রমায় আনজুম হয়ে উঠলেন দিল্লীর সবচেয়ে বিখ্যাত হিজড়া। চলচ্চিত্র-নির্মাতারা একে অন্যের সাথে লড়াই করত ওনার জন্যে, এনজিওরা তাকে সযত্নে লালন করত, বিদেশী প্রতিনিধিরা একটি পেশাগত সহায়তা হিসেবে একে অন্যকে ওনার ফোন নাম্বার উপহার দিত, যার সাথে আরো থাকত বার্ড হসপিটাল ও ফুলান দেবী, দস্যুরানী হিসেবে পরিচিত আত্নসমর্পণকারী সেই ডাকাতের নাম্বার এবং নিজেকে হুদের বেগম দাবি করতেন এমন একজন মহিলার সাথে যোগাযোগের ঠিকানা যিনি রিজ ফরেস্টের একটা পুরাতন ধ্বংসস্তুপের মধ্য বাস করতেন তার চাকরগণ এবং তার ঝাড়বাতিগুলি নিয়ে আর তার দাবী আকড়ে থাকতেন একটা অস্তিত্বহীন রাজ্যের ব্যাপারে। সাক্ষাতকারে আনজুমকে উৎসাহিত করা হত সেই অত্যাচার আর নিষ্ঠুরতা নিয়ে কথা বলার জন্য যেটা ওনার সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীরা ধরেই নিত তিনি মুখোমুখি হয়েছেন তার গতানুগতিক মুসলিম বাবা-মা , ভাইবোন আর প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। তারা সবাই অভিন্নভাবেই মনক্ষুণ্ণ হত যখন তিনি তাদেরকে জানাতেন কতটা তার বাবা আর মা তাকে ভালবেসেছে আর কিভাবে তিনিই ছিলেন সেই নিষ্ঠুর জনটি। অন্যদের খুব ভয়ংকর সব গল্প আছে, যেমনটা তোমারা লিখতে পছন্দ কর, তিনি বলতেন। তাদের সাথে আলাপ কর না কেন? কিন্তু অবশ্যই সংবাদপত্রগুলি ঐভাবে কাজ করত না। তিনিই ছিলেন নির্ধারিত জন। সেটা ওনাকেই হতে হবে, এমনকি যদি তার গল্পটি ঈষৎ পরিবর্তনও করা হত পাঠকের রুচি আর চাহিদার সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্য।

একবার যখন সে খোয়াবগহের একজন স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেল, আনজুম অবশেষে সেইসব কাপড়গুলোতে সাজতে পারল যেগুলো পরার শখ তার বহুদিনের- সেই চুমকি বসানো, মাকড়সার জালের মত মিহি সূতায় বোনা কুর্তা আর ভাঁজ ভাঁজওয়ালা পাটিয়ালা সালোয়ার কামিজগুলি, শারারাগুলি, ঘারারাগুলি, রূপার নুপুর, কাঁচের চূড়ি আর ঝোলানো কানের দুল। সে তার নাকে ফুটো করাল এবং একটা প্রশস্ত পাথর বসানো নাকফুল পড়ল, খোল আর আইশ্যাডো দিয়ে চোখগুলোকে এঁকে নিল আর নিজের মুখটাকে বানাল একটা চকচকে লাল রঙের লিপ্সটিক দেয়া কামনার্ত, ধনুকাকৃতির মধুবালার মত। তার চুল খুব বেশী বড় হত না, তবে এতটুকু লম্বা হত যে পিছনের দিকে টানা যেত আর বুনে দেয়া যেত একটা নকল চুলের বেণীর সাথে। তার ছিল একটা শক্তপোক্ত, কাটা কাটা চেহারা আর তার বাবার মত একটা মনোমুগ্ধকর হুকেরমত বাঁকানো নাক। সে সেইভাবে সুন্দর ছিল না যেভাবে বমবেয়ে সিল্ক ছিলেন, কিন্তু আরো আবেদময়ী ছিল, আরো উত্তেজক, সুদর্শন যেইভাবে কিছু মেয়েরা হয়ে থাকেন। এইরকম চেহারা আর সাথে একটা অতিরন্জিত, সীমা ছাড়ানো নারীত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে তার একনিষ্ঠ অধ্যাবসায়ের কারণে আশপাশের প্রতিবেশী এলাকার আসল, পূর্ণ জৈবিক গুণাবলী সম্পন্না মেয়েদেকে- এমনকি যারা পুরোটা ঢাকতেন না তাদেরকেও- ওনার সামনে ধুসরিত আর ছত্রভঙ্গ দেখাত। সে শিখল হাঁটার সময় নিজের নিতম্বের দোলাটিকে একটি অস্থিরতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া আর ভাব বিনিময়ের জন্য ব্যাবহার করা আঙুল ছড়ানো চিহ্নিত সেই হিজড়া তালি, যেটা বন্দুকের গুলির মত বেজে উঠত আর যেকোন অর্থ বোঝাতে পারত- হ্যা। না। হয়তোবা, ওয়াহ! বেহেন কা লওড়া (বাহ!তোর বোনের ল্যাওঢ়া), ভোসাদিকে (পুটকি দিয়া জন্মানো)। একমাত্র আরেকজন হিজড়াই সংকেতটি ভাঙতে পারবেন যে ঐ বিশেষ মূহুর্তে ঐ বিশেষ তালিটি দিয়ে কি বিশেষ মানেটা বোঝানো হয়েছে।

আনজুমের আঠারোতম জন্মদিনে কুলসুম বাঈ তার জন্য একটা পার্টি দিলেন খোয়াবগহে। সারা শহর থেকে হিজড়াগণ এসে জড়ো হলেন, কেউ কেউ শহরের বাইরে থেকে আসলেন। তার জীবনে প্রথমবারের মত আনজুম শাড়ি পড়লেন, একটা লাল ডিসকো শাড়ি, সাথে একটা পিঠখোলা চোলি। সেই রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে নিজের বিয়ের বাসর রাতে তিনি একজন নববধূ। জেগে উঠে তিনি প্রবল মনোকষ্টের সাথে লক্ষ্য করলেন যে তার যৌন সুখ নিজেকে একজন পুরুষের মত করে প্রকাশ করেছে তার চমৎকার নতুন শাড়িতে । এটা প্রথমবার নয় যে এমনটা ঘটেছিল, কিন্তু কোন একটি কারণে, হয়তোবা শাড়িটার জন্যই, তার যে অপমান বোধ হল সেটা আগে কখনও এত প্রবল ছিল না। তিনি উঠানে বসলেন আর নেকড়ের মত হু হু করতে লাগলেন, নিজের মাথায় আর দুই পায়ের মাঝখানে বাড়ি দিতে দিতে, আত্নপ্রদত্ত আঘাতের যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে। উস্তাদ কলুসুম বাঈ, এজাতীয় মন্চকলার সাথে যিনি যথেষ্ট পরিচিত, আনজুমকে একটা স্নায়ুশীতলকারী দিলেন আর ঘরে নিয়ে গেলেন।

আনুজম ঠান্ডা হওয়ার পরে উস্তাদ কুলসুম বাঈ তার সাথে ধীরকন্ঠে এমন একভাবে কথা বললেন যেভাবে তিনি আগে কোনদিন বলেননি। কিছু নিয়েই লজ্জিত হওয়ার কোন কারণ নেই, উস্তাদ কুলসুম বাঈ ওনাকে বললেন, কারণ হিজড়ারা হলো বাছাই করা মানুষ, সর্বশক্তিমানের বিশেষ ভালবাসার। হিজড়া শব্দটার, তিনি বললেন, মানে দাড়ায় একটা দেহ, যার মধ্যে একটা পবিত্র আত্না থাকে। পরবর্তী ঘন্টাটিতে আনজুম শিখলেন যে পবিত্র আত্নারা বিভিন্ন রকমের হয় আর খোয়াবগহের জগতটাও ঐ ধরণেরই জটিলতাতেই ভরা, এবং সেটা দুনিয়ার তুলনায় কম তো নয় বরং বেশী। হিন্দুগণ, বুলবুল আর গুড়িয়া, দুজনেই তারা খোয়াবগহে থাকতে আসার আগে বম্বাইয়ের সেই আনুষ্ঠানিক (প্রচন্ড যন্ত্রণাময়) পুরুষাঙ্গ কর্তনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পাড় হয়েছে। বোম্বে সিল্ক আর হীরারও এমনটা করতে পারলে ভাল লাগত, কিন্তু তারা মুসলিম ছিল আর বিশ্বাস করত যে নিজেদের ইশ্বর প্রদত্ত লিঙ্গ পরিবর্তন করতে ইসলাম তাদের নিষেধ করে, তাই তারা মানিয়ে নিত, কোন এক ভাবে, ঐসব বাধা নিষেধের মধ্যেই। বেবি, রাজিয়ার মতই, একজন পুরুষ ছিল যে পুরুষই থাকতে চাইত কিন্তু চাইত যে প্রত্যেক একদিন পর একদিন সে নারী হয়ে হবে। উস্তাদ কুলসুম বাঈয়ের দিক থেকে, তিনি বলতেন যে ইসলামের ব্যাপারে বোম্বে সিল্ক আর হীরার ব্যাখ্যার সাথে তিনি একমত না। তিনি আর নিম্মো গোরাখপুরী -যারা ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের লোক- সার্জারী করে নিয়েছিলেন। তিনি একজন ডাক্তার মুখতারকে চিনতেন, কুলসুম বাঈ বললেন, যিনি ভরসাযোগ্য আর ফালতু কথা বলেন কম এবং নিজের রোগীদের নিয়ে পুরান দিল্লীর প্রত্যেক গলি আর কূচার মধ্যে গাল গল্প ছড়িয়ে বেড়ান না। তিনি আনজুমকে বললেন তার এটা ভেবে দেখা উচিত আর সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত সে কি করতে চায়। পুরো তিন মিনিট নিল আনজুম সিদ্ধান্ত নিতে।

ডঃ নাবী যতটা ছিলেন তার তুলনায় ডঃ মুখতার ছিলেন দেখা গেল আরো অনেক বেশী আশ্বস্তকারী। তিনি জানালেন তিনি আনজুমের পুরুষ অংগুলোকে বাদ দিয়ে দিতে পারবেন আর চেষ্টা করবেন তার বিদ্যমান যোনিপথটিকে আরো ফুটিয়ে তুলতে। তিনি পিলের পরামর্শও দিলেন যেগুলো তার কন্ঠস্বরকে পাতলা করে দিবে আর তাকে স্তন তৈরী করতে সাহায্য করবে। একটু কম টাকার মধ্যে, কুলসুম বাই জোর দিলেন। একটু কম টাকার মধ্যেই, ডঃ মুখতার রাজী হলেন।  কুলসুম বাঈ হরমোন আর সার্জারীর জন্য টাকা দিলেন; আনজুম বছরগুলোর পরিক্রমায় সেটা তাকে ফিরিয়ে দিলেন, বেশ কয়েকবারে।

সার্জারীটা কঠিন ছিল, সেরে ওঠাটা তার চেয়েও বেশী, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা একটা প্রশান্তি হয়ে আসল। আনজুমের মনে হল যেন তার রক্ত থেকে একটা কুয়াশা সরে গেছে আর এখন সে পরিষ্কার ভাবে চিন্তা করতে পারছে। ডাক্তার মুখতারের যোনিটা, যাই হোক, দেখা গেল একটা ভাওতা। এটা কাজ করত, কিন্তু যেভাবে তিনি বলেছিলেন সেভাবে না, এমনকি দুটো সংশোধনকারী সার্জারীর পরেও না। তিনি টাকা ফেরত দেয়ার কোন প্রস্তাব দিলেন না অবশ্য যদিও, পুরোটা অথবা আংশিক কোনভাবেই না। তার বিপরীতে দেখা গেল, দিশেহারা লোকজনের কাছে ভেজাল, স্বল্পমানের শারীরিক প্রতঙ্গ বিক্রি করে, তিনি বেশ আরামের সাথে আয়-রোজগাড় করে গেলেন। তিনি মারা গেলেন একজন বিত্তশালী লোক হিসেবে, যার লাক্ষী নগরে দুটো বাড়ি, নিজের প্রত্যেক ছেলের জন্য একটা করে, আর তার কন্যা বিবাহিত রামপুরের একজন ধনবান বিল্ডিঙ কন্ট্রাক্টারের সাথে।

যদিও আনজুম হয়ে উঠলেন একজন কাঙ্ক্ষিত প্রেমিকা, একজন দক্ষ দাতা আনন্দের, যেটা তার লাল ডিসকো শাড়ি পড়া অবস্থায় হয়েছিল সেটাই ছিল তার জীবনের শেষ অর্গাজম। আর সেই প্রবণতাগুলি যদিও রয়ে গেল যাদের ব্যাপারে ড. নাবী তার বাবাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, ড. মুখতারের পিল পাতলা করেছিল তার গলার স্বরকে। কিন্তু সেটা তার কন্ঠের ঝংকারকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলল, কর্কশ করে দিল ধ্বনির মাধু্র্যকে আর কেমন অদ্ভুত, ঘ্যাস ঘ্যাসে করে দিল, যেটা মাঝে মাঝে এমন শোনাত যে একটার বদলে দুটো কন্ঠস্বর ঝগড়া করছে পরস্পরের সাথে। অন্য মানুষদেরকে এটাতে ভয় পেয়ে যেত। তবে এটা তার মালিককে সেভাবে ভয় দিত না যেভাবে দিয়েছিল তার ঈশ্বর-প্রদত্তটি কন্ঠটি। এবং উল্লসিতও করত না এটা তাকে।

তার জোড়া-তালি দেয়া শরীর আর আংশিক বুঝতে পারা স্বপ্নগুলো নিয়ে আনুজুম খোয়াবগহে জীবনযাপন করেছিলেন ত্রিশ বছরের বেশী সময়।

তিনি ছেচল্লিশ বছর বয়সী ছিলেন যখন তিনি ঘোষণা দিলেন যে তিনি বিদায় নিতে চান। মুলাকাত আলি মারা গিয়েছিলেন। জাহানারা বেগম শয্যাশায়ী থাকতেন বেশীর ভাগ সময় এবং সাকিব ও সাকিবের পরিবারের সাথে চিতলী কাবারের পুরাতন বাড়িটার একটি অংশে বাস করতেন(অন্য অর্ধাংশটি ভাড়া দেয়া হয়েছিল একজন আজবধরণের, সংশয়ী যুবককে যে জীবনযাপন করত হাতবদল-হওয়া ইংলিশ বইয়ের উঁচু উঁচু স্তম্ভের মাঝে যেগুলো তার মেঝের উপর, বিছানার উপর এবং সকল সম্ভাব্য আনুভুমিক স্থানের উপর স্তুপ করা থাকত)। আনজুম মাঝে মাঝে আসতে আমন্ত্রিত ছিলেন, কিন্তু থাকতে নয়। খোয়াবগহটিতে ঘর বেঁধেছিল বাসিন্দাদের একটা নতুন প্রজন্ম- পুরানদের মধ্যে শুধু উস্তাদ কুলসুম বাঈ, বোম্বে সিল্ক, রাজিয়া, বিসমিল্লা আর ম্যারি থেকে গিয়েছিল।
আনজুমের কোথাও যাওয়ার ছিল না।

                                  **
হয়তোবা এই কারণটির জন্যেই, কেই তাকে গুরুত্বসহকারে নিল না।
যে বণ্য হিংসেমী, সমাপ্তিহীন উত্তেজনা আর বারবার পাল্টাতে থাকা বিশ্বস্ততা খোয়াবগহের দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল, নাটকীয় বিদায় এবং সম্ভাব্য আত্নহত্যার ঘোষণা ছিল তার প্রতি একটি বেশ নিয়মিত প্রতিক্রিয়া। আবারও একবার, সবাই পরামর্শ দিল ডাক্তার এবং পিলের। ডঃ ভগতের পিল সবকিছু ঠিক করে দিতে পারে, তারা বলল। সবাই ওগুলার উপরেই আছে। আমি সবাই না, আনজুম বলল, আর সেটা আরেক দফা ফিসফিসানির সূচনা করল (পক্ষে এবং বিপক্ষে) যে অহংকারের চোরাগর্তগুলি কেমন আর আনজুম নিজেকে ভাবেনটা কী?

নিজেকে কি ভাবেন তিনি? খুব বেশী না, অথবা অনেক বেশী, নির্ভর করবে আপনি কিভাবে দেখছেন বিষয়টাকে। তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, হ্যা। এবং সেগুলোতে এখন আর কোন অস্পষ্টতা নেই। এখন তিনি চান দুনিয়ায় ফিরে যেতে এবং একজন সাধারণ মানুষের মত জীবনযাপন করতে। তিনি চান একজন মা হতে, ঘুম ভাঙলে তার নিজের বাসায় জেগে উঠতে, জয়নাবকে একটা স্কুল ইউনিফর্ম পরিয়ে দিতে এবং তাকে স্কুলে পাঠিয়ে দিতে তার বইপত্র আর টিফিনবক্সের সাথে। প্রশ্নটি ছিল যে, এই ধরণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা গুলি, তার মত একজনের জন্য, যৌক্তিক নাকী অযৌক্তিক ছিল?

জয়নাব ছিল আনজুমের একমাত্র ভালবাসা। তাকে আনজুম পেয়েছিলেন তিন বছর আগে। সেদিন ঝড়ো বাতাসের এক দুপুর। এরকম দুপুরগুলিতে ঈমানদারদের প্রার্থনার টুপি তাদের মাথা থেকে উড়ে যায় আর বেলুনবেচা লোকদের বেলুনগুলো সব কাত হয়ে থাকে একদিকে। একটা বাচ্চা একা একা বসে খুব চিৎকার করছিল জামা মসজিদের সিড়িতে। বড় বড়, ভীত চোখ। দেখতে বেদনাদায়ক ভাবে শীর্ণ ইদুরের মত একটা জিনিষ। আনজুম আন্দাজ করলেন যে বাচ্চাটার তিন বছরের মত বয়স হবে। গায়ে ছিল একটি ফ্যাকাশে সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজ আর একটা ময়লা সাদা হিজাব। আনজুম আবির্ভুত হলেন তার সমানে আর ধরার জন্য একটি আঙুল বাড়িয়ে দিলেন। শিশুটি একবারের জন্য দ্রুত উপরে তাকিয়ে দেখল। তারপর আন্জুমের আঙুলটা আকড়ে ধরল আর কোন প্রকার বিরতি ছাড়া কেঁদে চলল। হিজাবের-ইদুরটার কোন ধারণাই ছিল না যে যার আঙুলটি সে ধরল তার অন্তরে কি ভীষণ ঝড় তুলে দিল তার বিশ্বাসের সেই অতি সাধারণ ভঙ্গিমাটি। আতঙ্কের বদলে সেই ক্ষুদ্র-প্রাণীটির কাছ থেকে উপেক্ষিত হওয়াটা এক মূহুর্তের জন্য হলেও, সেই ব্যাপারটাকে প্রশমিত করল যেটাকে নিম্মো গোরাখপুরী বলত ইন্ডিয়া-পাকিস্তান। আনজুমের ভেতরে যুদ্ধরত দলগুলির মাঝে নেমে আসল নীরবতা। একটা যুদ্ধক্ষেত্রের বদলে নিজের শরীরটাকে তার মনে হল একজন স্নেহশীল আশ্রয়দাতা। এটা কেমন ছিল? মৃত্যুর মত, নাকী জন্মানো? আনজুম সিদ্ধান্তে আসতে পারলেন না। তার কল্পনায় ঘটনাটির যে পূর্ণতাটুকু ছিল, যেই সমগ্রতার বোধটি ছিল, তা ছিল জন্ম বা মৃত্যুর যেকোন একটির। তিনি নীচু হয়ে উঠিয়ে নিল ঈদুরটাকে। তাকে দুহাতের মাঝে নিয়ে একটু দোল খেলেন। আর পুরো সময়টা বিড়বিড় করে গেলেন তার কলহরত কন্ঠে । এটাও বাচ্চাটাকে তার চিৎকারের প্রকল্পটি থেকে ভীত বা মনোবিচ্ছিন্ন করতে পারল না। কিছু সময়ের জন্য আনজুম শুধু দাড়িয়ে রইলেন সেইখানে, আনন্দিত মুখে হাসতে হাসতে, যতক্ষণ তার বাহুবদ্ধ প্রাণীটি কেঁদেই চলল। তারপর তিনি তাকে সিড়িতে নামিয়ে রেখে কিছু জ্বলজ্বলে গোলাপী রঙের হাওয়াই মিঠাই কিনে দিলেন, আর তার মনোযোগ অন্যদিকে নেয়ার চেষ্টা হিসেবে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে গল্প করতে লাগলেন বড়দের বিষয় নিয়ে। তিনি আশা করছিলেন যে সময়টা কেটে যাবে আর যারই বাচ্চা এটা সে এসে নিয়ে যাবে। এটা একটা এক-মুখী আলাপচারিতা হয়ে দাড়াল, ইদুরটাকে মনে হল নিজের ব্যাপারে তেমন কিছু জানে না, নিজের নামটাও না, আর মনে হল কথাও বলার বিশেষ ইচ্ছে তার নেই। যতক্ষণে সে হাওয়াইমিঠাইটা শেষ করল (বা হাওয়াই মিঠাইটা তাকে শেষ করল) তার একটা উজ্জ্বল গোলাপী দাড়ি দেখা দিয়েছে আর আঙুলগুলো হয়েছে আঠা-আঠা। ভীষণ চিৎকার চেঁচামেচিটা কমে গিয়ে রূপ নিল ফোঁপানিতে আর শেষে একসময় নীরবতা নামল। আনজুম তার সাথে সিড়িতে বসে রইলেন ঘন্টার পর ঘন্টা, অপেক্ষা করতে লাগলেন কারো জন্য যে আসবে তাকে নিতে, পথচারীদের জিজ্ঞেস করতে লাগলেন যে তারা চিনে কিনা কাউকে যার বাচ্চা হারিয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা নামল যখন আর জামা মসজিদের বিশাল কাঠের দরজাগুলি টেনে বন্ধ করে দেয়া হল, আনজুম ইদুরটাকে উঠিয়ে নিলেন নিজের কাঁধে আর তাকে বহন করে নিয়ে চললেন খোয়াবগহে। সেখানে আনজুমকে প্রচুর বকাঝকা দেয়া হল আর বলা হল এজাতীয় পরিস্থিতিতে সঠিক কাজটি হত মসজিদ কর্তৃপক্ষকে জানানো যে একটা হারানো বাচ্চা পাওয়া গিয়েছে। তিনি সেটা পরদিন সকালে করলেন।(প্রবল অনীহার সাথে, সেটা বলে দিতেই হয়, পা টানতে টানতে, আশার বিরুদ্ধে আশা নিয়ে, কারণ ইতোমধ্যে আনজুম ভরসাহীনভাবে প্রেমে পড়ে গিয়েছেন)।

পরবর্তী সপ্তাহ জুড়ে দিনে অনেকবার ঘোষণা দেয়া হল অনেকগুলি মসজিদ থেকে। ইদুরটির দাবী নিয়ে কেউ এগিয়ে আসল না। সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলে গেল, তবুও কেউ আসল না। আর তাই, অনিবার্য কারণেই, জয়নাব- যে নামটি আনজুম তার জন্য ঠিক করেছিল- খোয়াবগহে রয়ে গেল অনেকগুলি মায়েদের(এবং, একভাবে বললে বাবাদের) অনেক বেশী ভালবাসায় অতিপ্রাপ্ত হয়ে, যতটা কোন বাচ্চা আশা করতেও পারে না। তার নতুন জীবনে মানিয়ে নিতে সে খুব বেশী সময় নিল না, যার থেকে মনে হয় পূর্বের জীবনটির সাথে তার খুব নিবিড় বন্ধন ছিল না। আনুজম এই বিশ্বাসে এসে পৌছাল তাকে ফেলে রেখা যাওয়া হয়েছিল এবং হারানো যায়নি। কয়েক সপ্তাহর মধ্যেই সে আনজুমকে আম্মু ডাকতে শুরু করল (কারণ সেটাই আনুজম নিজেকে ডাকতে শুরু করিয়েছিলেন)। অন্য বাসিন্দাদের (আনজুমের অভিভাবকত্ব অনুসারে) ডাকা হত আপা (উর্দুতে, আন্টি), এবং ম্যারি, সে ক্রিশ্চান বলে, ছিল ম্যারি আন্টি। উস্তাদ কুলসুম বাঈ এবং বিসমিল্লাহ হয়ে গেলেন বড় নানী আর ছোট নানী। ঐ ইদুরটি ভালবাসা শুষে নিত যেভাবে বালু সমুদ্রকে শুষে নেয়। খুব দ্রুতই উগ্র, স্পষ্টভাবে ধেড়ে ইদুরের মত প্রবণতা(যেটা সামলানো বেশ কষ্ট) সম্পন্ন একটা দুষ্টু ছোট্ট বালিকায় সে রূপান্তরিত হল।

এসবকিছুর মধ্যে, আম্মুর মাথায় দিন দিন সব আরো তালগোল পাকিয়ে যেতে লাগল। বিষয়টি কোন সর্তকতা ছাড়াই তার কাছে ধরা পড়ল যে এটা সম্ভব কোন একজন মানুষের পক্ষে অন্য একজনকে এত বেশী এবং এত পূর্ণভাবে ভালবাসা। প্রথমদিকে, নতুন নতুন এই ব্যাপারটির সাথে পরিচয়ের কারণে, নিজের অনুভুতিগুলিকে প্রকাশের তার ভঙ্গিমাটি ছিল ব্যাস্ত, উত্তেজিত। যেমন নিজের প্রথম পোষা প্রাণীটার সাথে একটা বাচ্চা করে থাকে। সে জয়নাবকে একটা অপ্রয়োজনীয় পরিমাণে খেলনা আর কাপড়চোপড় কিনে দিল। (ফেনার মত, ফোলা-ফোলা হাতের ফ্রক আর চায়নার-তৈরী কিচ কিচ শব্দের হিলে আলো-জ্বলা জুতা)। অপ্রয়োজনীয় সংখ্যকবার তাকে গোসল করাত, কাপড় পড়াত আর কাপড় খুলত। মিলানো আর মিল নেই এমন দুই ধরণের ফিতা ছিল জয়নাবের জন্য যেগুলি আনজুম এক সাথে দলা পাকিয়ে একটা পুরানো টিনে রাখত। সে বারবার জয়নাবের চুলে তেল দিত, বেণী করত আর বেনী খুলে দিত, ফিতা বেঁধে দিত আর সেই বাঁধন খুলে দিত। তাকে বেশী করে খাওয়াত, হাঁটতে নিয়ে যেত প্রতিবেশী এলাকায় আর, যখন দেখল যে জয়নাব স্বাভাবিক ভাবেই পশুপাখির প্রতি আকৃষ্ট হয়, একটা খরগোশ কিনে দিল তাকে- যে খরগোশটি খোয়াবগহে তার একদম প্রথমরাতেই একটা বিড়ালের হাতে মারা পড়ল- আর কিনে দিল মাওলানাদের মত দাড়িওয়ালা একটা পুরুষ-ছাগল যে উঠানে থাকত এবং যখন তখন, চেহারায় একটি নির্বিকার ভাব দিয়ে, তার চিকচিকে ছাগলের নাদিগুলি ছিটিয়ে ছিটিয়ে পাঠাত সর্ব দিকে।

বহুবছরের তুলনায় খোয়াবগহটি এখন বেশ ভাল অবস্থায় ছিল। ভাঙা ঘরটার সংস্কার করা হয়েছে আর ওটার উপরে প্রথমতলায় আরেকটা ঘর বানানো হয়েছে, যেটা এখন আনজুম আর ম্যারি ভাগ করত। আনজুম ঘুমাত জয়নাবের সাথে মেঝেতে একটা তোষকের উপর, তার দীর্ঘ দেহটি একটা শহর-প্রাচীরের মত রক্ষণাত্নক ভাবে বাঁকা হয়ে ছোট্ট মেয়েটির চারপাশে ঘিরে রাখত। রাতে সে তাকে ঘুম পাড়াত আস্তে আস্তে গান শুনিয়ে, এমন একভাবে যেটা গানের চেয়ে বেশী যেন ফিসফিস। যখন জয়নাব বোঝার জন্য যথেষ্ট বড় হল, আনজুম তাকে ঘুমানোর আগে গল্প বলতে শুরু করল। প্রথমদিকে একটা ছোট্ট বাচ্চার জন্য গল্পগুলো একদমই যথাযথ ছিল না। সেগুলো ছিল আনজুমের একপ্রকার অণিপুণ প্রচেষ্টা হারানো সময়কে পুষিয়ে দেয়ার জন্য, নিজেকে ঢুকিয়ে দেয়া জয়নাবের স্মৃতি আর চেতনায়, নিজেকে প্রকাশ করা কোন কৃত্রিমতা ছাড়া, যেন তারা একে অন্যের হয়ে যেতে পারে পুরোপুরি। জয়নাবকে ঘুম পাড়ানো দূরে থাক, অনেকগুলো গল্পই তাকে দুঃস্বপ্ন দেখাত বা ঘন্টার পর ঘন্টা তাকে জাগিয়ে রাখত, ভীত আর মেজাজগ্রস্থ করে। মাঝে মাঝে আনজুম নিজেও কাঁদত ওগুলো বলার সময়। জয়নাব তার ঘুমানোর সময়টাকে ভয় পেতে শুরু করল এবং নিজের চোখগুলো বন্ধ করে রাখত শক্ত করে, ঘুমের ভান করে যেন আর একটা গল্পও শুনতে না হয়। সময় গেলে, যাই হোক, আনজুম (অন্যান্য জুনিওর আপাদের পরামর্শ মোতাবেক) একটা সম্পাদনার পদ্ধতি বের করল। গল্পগুলো সফলভাবে শিশুরোধক হল, আর এক সময় জয়নাবও রাত্রিকালীন প্রথাটির ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠল।

তার সবচেয়ে প্রিয় গল্পটি ছিল- ফ্লাইওভারের গল্পটা- আনজুমের বর্ণণায় কিভাবে সে আর তার বন্ধুরা এক গভীর রাতে বাড়ি ফিরল সাউথ দিল্লীর ডিফেন্স কলোনি থেকে সেই পুরোটা পথ হেঁটে টার্কম্যান গেটে। তারা পাঁচ থেকে ছয়জন ছিল, সাজগোজ করা, মারাত্নক লাগছিল তাদেরকে দেখতে ডি-ব্লকের এক ধনবান শেঠের বাসায় একটা হৈচৈ এর রাত পার করার পর। পার্টির পর তারা ঠিক করল কিছুক্ষণ হাঁটবে আর একটু তাজা হাওয়া খাবে। সেইসব দিনগুলিতে তাজা হাওয়া বলে একটা জিনিষ শহরে ছিল, আনজুম বলল জয়নাবকে। ডিফেন্স কলোনি ফ্লাইওভারের তারা যখন মাঝপথে চলে এসেছে- শহরের একমাত্র ফ্লাইওভার সেটা সেইসময়ে- তখন বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। আর কেউ একজন কি করতে পারে যখন কোন ফ্লাইওভারের ওপর বৃষ্টি হয়?
তাদেরকে হাঁটতে থাকতে হবে, জয়নাব বলত, একটা যুক্তিবোঝা, বড়দের মত কন্ঠে।
একদম ঠিক। তাদেরকে হাঁটতে থাকতে হবে, আনজুম বলতেন। আর তারপর কি হল?
তখন তোমার হিসু করার ইচ্ছা হল!
তখন আমার হিসু করার ইচ্ছা হল!
কিন্তু তুমি থামতে পারলা না!
আমি থামতে পারলাম না।
তোমাকে হাঁটতেই থাকতে হল!
আমাকে হাঁটতেই থাকতে হল।
তাই আমরা আমাদের ঘাগড়ায় হিসু করলাম! জয়নাব চিল্লিয়ে উঠত, কারণ সে তখন এই বয়সে ছিল যখন হাগা, মুতা এবং পাদ দেয়ার সাথে জড়িত যে কোন কিছু ছিল সবচেয়ে উপরের ব্যাপার, বা হয়তো পরো ব্যাপারটাই, সব গল্পের।
ঠিক, আর সেটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মজা, আনজুম বলত, বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সেই বিশাল, ফাঁকা ফ্লাইওভারটার উপরে, বোম্বে ডাইঙ তোয়ালে দিয়ে নিজেকে মুছতে থাকা একটা ভিজা মহিলার বিশাল এ্যাডের নীচে হাঁটতে হাঁটতে।
আর তোয়ালেটা একটা কার্পেটের মত বড় ছিল!
একটা কার্পেটের মত বড়, হ্যাঁ।
আর তারপর তুমি ঐ মহিলাটাকে জিজ্ঞেস করলা গা মুছার জন্য ওর তোয়ালেটা একটু নেয়া যাবে কি না।
আর কি বলল ঐ মহিলাটা?
ও বলল, নেহ্যি! নেহ্যি! নেহ্যি!
ও বলল, নেহ্যি! নেহ্যি! নেহ্যি! তাই আমরা একদম ভিজে গেলাম, আর আমরা হাঁটতে থাকলাম....
আর গারাম গারাম হিসু গড়ায় যাচ্ছিল তোমার ঠান্ডা ঠান্ডা পা বেয়ে!
অনিবার্যভাবেই এই পর্যায়ে এসে জয়নাব ঘুমিয়ে পড়ত, ঠোঁটৈ হাসি নিয়ে। দুঃখ আর দুর্দশার প্রত্যেকটা সামান্য চিহ্নও সরিয়ে ফেলা আবশ্যক ছিল আনজুমের গল্প থেকে। তার খুব ভাল লাগত যখন আনজুম নিজেকে একটা যৌন-মোহিনীতে পাল্টে ফেলতেন যিনি সংগীত আর নৃত্যের একটা ঝিকিমিকি জীবন যাপিত করে এসেছেন, জমকালো পোশাকে সেজে সাথে মসৃণ পালিশ করা নখ আর চারপাশে গুনমুগ্ধ ভক্তের ভীড়।

আর তাই, এইসব উপায়ে, জয়নাবকে খুশি করতে গিয়ে, আনজুম নিজের জন্য একটি সরলতর, অধিক সুখী জীবনকে পুনরায় লিখতে শুরু করলেন। বদলে এই পুনঃলিখনটি আনজুমকে একটা সরল, সুখী মানুষ বানাতে শুরু করল।

সম্পাদিত হয়ে গেছে ফ্লাইওভারের গল্পটি থেকে, উদাহরণস্বরূপ, এই সত্যটি যে ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭৬ সালে, তখন চূড়ান্ত পর্যায় ইন্দিরা গান্ধী ঘোষিত জরুরী অবস্থাটির যেটি একুশ মাস চলেছিল। তার নষ্ট বখে যাওয়া কনিষ্ঠপুত্র, সন্জয় গান্ধী, তখন যুব কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় নেতা ছিলেন ( শাসক দলটির যুব-নেতৃত্বাধীন অংশ), এবং কম বেশী দেশটাকে চালাচ্ছিলেন, সেটার সাথে এমন ব্যাবহার করছিলেন যেন দেশটা তার ব্যাক্তিগত খেলার বস্তু। বেসামরিক অধিকারকে তখন স্থগিত করা হয়েছে, সংবাদপত্রগুলোকে সেন্সর করা হচ্ছিল এবং, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রয়ণের নামে, হাজারে হাজারে লোক(মুলতঃ মুসলিম) ক্যাম্পে জড়ো করা হয়েছিল এবং জোর করে সন্তানপ্রদানে অক্ষম করে দেয়া হয়েছিল। একটা নতুন আইন- অন্তর্বতী নিরাপত্তা রক্ষামূলক আইন- সরকারকে ক্ষমতা দিল খেয়ালের বশে যে কাউকে গ্রেপ্তার করার। জেল গুলো ভরে গিয়েছিল, আর সন্জয় গান্ধীর সাঙ্গ পাঙ্গদের একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে জনগণের মাঝে লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল তার হুকুম তামিল করার জন্যে।

ফ্লাইওভারের গল্পের রাতে, লোক সমাগমটি- একটা বিয়ের অনুষ্ঠান- আনজুম আর তার সহকর্মীরা আবির্ভুত হয়েছিলেন যেখানে সেটাকে পুলিশ হামলা করে ভেঙে দিল। গৃহকর্তা আর তার তিনজন অতিথিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল আর নিয়ে যাওয়া হল পুলিশ-ভ্যানে করে। কেউ জানত না কেন। আরিফ, সেই ভ্যানের ড্রাইভার যেটা আনজুম এবং কো. কে অনুষ্ঠানস্থলে বহন করে এনেছে, নিজের যাত্রীদের কোন প্রকারে একসাথে করে তার ভ্যানে তুলে নিয়ে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করেছিল। এই ধৃষ্টতার জন্য তার বাম হাতের আঙুলের গাঁট আর ডানপায়ের হাঁটুর বাটি পিটিয়ে ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে দেয়া হয়েছিল। ম্যাটাডরটি থেকে তার যাত্রীদেরকে টেনে হিঁচড়ে নামানো হল, পশ্চাতদ্দেশে লাত্থি দেয়া হল যেন তারা সার্কাসের সঙ কতগুলি এবং নির্দেশ দেয়া হল কেটে পড়ার, বাসা পর্যন্ত পুরো রাস্তা দৌড়ে যাওয়ার যদি তারা না চায় দেহব্যাবসা আর অশ্লীলতার দায়ে গ্রেপ্তার হতে। তার দৌড়াল অন্ধ আতঙ্কে, পিচাশের মত, অন্ধকার আর বর্ষণরত বৃষ্টির মধ্য দিয়ে, তাদের পাগুলির তুলনায় আরো অনেক দ্রুত পালাচ্ছিল তাদের মেক-আপ, ভেজা স্বচ্ছ কাপড়গুলি তাদের পদক্ষেপকে সীমিত করছিল আর গতিকে বাধাগ্রস্ত করছিল। সত্য যে, হিজড়াদের জন্য নিয়মিত অপমানের একটি অংশ মাত্র ছিল এটি, সাধারণের বাইরের কিছু নয়, সেইসব দুঃখ কষ্টের তুলনায় কিছুই না যেগুলি অন্যদেরকে সেই ভয়াবহ মাসগুলিতে সহ্য করতে হত।

ওটা কিছুই ছিল, কিন্তু তারপরো, কিছু একটা ছিল।

আনজুমের সম্পাদনাকে উপেক্ষা করে, সত্যের কিছু অংশকে ফ্লাইওভারের গল্পটা ধরে রেখেছিল। যেমন ধরা যাক, আসলেই বৃষ্টি হয়েছিল সেই রাতে। আর আনজুম আসলেই দৌড়ানোর সময় পেশাব করেছিল। সেখানে আসলেই বোম্বে ডাইং তোয়ালের একটা বিজ্ঞাপন ছিল ডিফেন্স কলোনি ফ্লাইওভারের উপর। আর বিজ্ঞাপনের মহিলাটি একদম সরাসরিই জানাল তার তোয়ালেটা ভাগাভাগি করবে না।

                            **
   
জয়নাব স্কুলে যাওয়ার মত বড় হওয়ার এক বছর আগে, আম্মু নিজেকে ঘটনাটির জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করলেন। তিনি তার পুরাতন বাসা থেকে ঘুরে আসলেন আর, তার ভাই সাকিবের অনুমতিক্রমে, খোয়াবগহে নিয়ে আসলেন মুলাকাত আলীর বইয়ের সংগ্রহটি। তাকে প্রায়ই দেখা যিত পায়ের উপর পা তুলে একটা খোলা বইয়ের সামনে বসে আছেন(পবিত্র কোরান নয়), পৃষ্ঠায় আঙুল দিয়ে কোন লাইনকে অনুসরণ করতে করতে মুখ নাড়াচ্ছেন, অথবা চোখ বন্ধ করে সামনে পিছে দোল খাচ্ছেন, চিন্তা করছেন এক্ষুণি তিনি কি পড়লেন তা নিয়ে, অথবা হয়তো তার স্মৃতির ডোবাটি সেঁচে একসময় তিনি জানতেন এমন কোন কিছু তুলে আনার চেষ্টা করছিলেন।

যখন জয়নাবের পাঁচ হল, সংগীত সিক্ষা শুরু করার জন্য আনজুম তাকে উস্তাদ হামিদ খানের কাছে নিয়ে গেলেন। প্রথম থেকেই একটা বিষয় পরিষ্কার ছিল যে সংগীত জয়নাবের জিনিষ নয়। তার ক্লাসগুলো জুড়ে সে অপ্রসন্ন চিত্তে ছটফট করত। এমন ঝামেলা লাগিয়ে দিত সুর লয়ে যে সেটাকেই একটা আলাদা দক্ষতা ভাবা যাতে পারে। ধৈর্যশীল, কোমল হৃদয়ের উস্তাদ হামিদ খান এমনভাবে নিজের মাথা নাড়তেন যেন একটা মাছি তাকে জ্বালাতন করছে। তিনি তার গালগুলোকে মৃদু-উষ্ণ চা দিয়ে পূর্ণ করে হারমোনিয়ামের সুরের চাবিগুলি চেপে ধরতেন। যার মানে ছিল , তিনি চান তার ছাত্র আরেকবার চেষ্টা করুক। সেসব বিরল মূহূর্তে যখন জয়নাব সুরের কিছুটা নিকটে হলেও পৌছাতে পারত, তিনি মাথা নাড়তেন আনন্দের সাথে আর বলতেন, এই তো আমার ছেলে!। শব্দ মালাটি তিনি শিখেছিলেন কার্টুন নেটওয়ার্কের টম এন্ড জেরি অনুষ্ঠানটি থেকে। এই অনুষ্ঠানটি তিনি খুব পছন্দ করতেন আর তার নাতিদের সাথে বসে দেখতেন (যারা পড়ছিল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে)। ছাত্রটির লিঙ্গের অপরিপ্রেক্ষিতে, এটা ছিল প্রশংশার সর্বোচ্চ রূপ। এটা জয়নাবকে তিনি দান করতেন সেটা তার প্রাপ্য ছিল বলে নয়। বরন্চ সেটার কারণটা ছিল আনজুম আর তাকে নিয়ে হামিদ খানের সেই স্মৃতি যে সে(যখন সে আফতাব ছিল)কত সুন্দর গান গাইত। আনজুম সবগুলো ক্লাসের মধ্যে বসে থাকত। তার চিকন, মাথার-ফুটো-দিয়ে পোকার গুন্জনটি পুনরায় দেখা দিত। এইবার সেটা দেখা দিত একটা নীরব প্রদর্শক হিসেবে যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জয়নাবের পথছাড়া কন্ঠটিকে বশে আনতে এবং সেটাকে সঠিক রাস্তায় রাখতে। ওটাতে কোনই লাভ হল না। ধেড়ে ইদুরটা গাইতে পারত না।

জয়নাবের প্রকৃত অনুরাগ, দেখা গেল যে, পশুপাখি। পুরাতন শহরের রাস্তায় সে ছিল একটা ত্রাস। সে মুক্ত করে দিতে চাইত সব অর্ধেক-ন্যাড়া, অর্ধ-মৃত সাদা মুরগীগুলিকে যেগুলোকে নোংরা খাচাগুলির মধ্যে ঠেসে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল আর খাচাগুলিকে বোঝাই করা হয়েছিল একটার উপরে আরেকটাকে, কসাইয়ের দোকানের সামনে। সে আলাপ করতে চাইত প্রত্যেকটি বিড়ালের সাথে যারা তার পথের সামনে দিয়ে ছুটে যেত। খোলা নর্দমা দিয়ে বয়ে যাওয়া রক্ত আর গরু-মুরগি জবাইয়ের উচ্ছিষ্টের মধ্যে খুঁজে পাওয়া প্রত্যেক বিলাপরত  ছন্নছাড়া কুকুরের বাচ্চাদের সে নিয়ে যেতে চাইত বাসায়। সে কানে তুলত না যখন তাকে বলা হত যে কুকুররা নাপাক- নাজি- মুসলিমদের জন্য আর ওদেরকে ছোঁয়া ঠিক না। ঐ বড়, লোমশ ইদুরগুলির কাছ থেকে সে সরে আসত না যেগুলো তাড়াহুড়ো করে চলে যেত সেই রাস্তা ধরে যেটা দিয়ে তাকে হাঁটতে হত প্রতিদিন। হলুদ মুরগির ঠ্যাঙের তোড়া, কেটে ফেলা খাসীর পায়া, ছাগলের মাথার পিরামিড যেগুলোর চোখগুলি একদৃষ্টিতে খোলা, অন্ধ আর নীল আর বড় বড় ইস্পাতের বাটিতে জেলীর মত থিকথিক করে কাঁপতে থাকা ছাগলের মুক্তোর মত সাদা মগজগুলির দৃশ্যের সাথে সে যেন কখনই মানিয়ে নিতে পারত না।

তার পোষা ছাগলের সাথে যোগ করার জন্য, যেটা, ধন্যবাদ জয়নাবকে, রেকর্ড সংখ্যক তিনটি বকরী-ঈদ জবাই হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছে, আনজুম তাকে এনে দিলেন একটা সুদর্শন মোরগ, যে তার নতুন মালেকিনের স্বাগত আলিঙ্গনের প্রত্যুত্তর জানাত একটি হিংস্র ঠোকর দিয়ে। জয়নাব কাঁদত জোর জোরে, যন্ত্রণার তুলনায় অনেক বেশী হৃদয় ভঙ্গের বেদনায়। ঠোকরটি তাকে সংযত করেছিল, কিন্তু পাখিটির জন্য তার ভালবাসায় কোন কমতি ঘটল না। যখনই এই প্রেম মোরগটি তার কাছে আসত সে তার হাতগুলো জড়িয়ে নিত আনজুমের পায়ের চারপাশে আর আম্মুর হাঁটুতে চুক চুক করে কতগুলো চুমু পৌছে দিত। চুমুর মাঝে মাঝে যে মাথা ঘুরিয়ে স্নেহময় আর ভালবাসার দৃষ্টিতে মোরগটির দিকে তাকাত যেন তাতে করে তার আদরের পাত্রটি আর চুমু প্রাপ্ত পক্ষটির কারোরই কোন সন্দেহ থাকবে না যে ঘটনা কি ঘটছে আর চুমুগুলি আসলেই কার উদ্দেশ্যে। কোন কোন দিক থেকে ভাবলে, জয়নাবের প্রতি আনজুমের আচ্ছন্নের মত ভালবাসাটাই সমানুপাতিকভাবে প্রতিফলিত হত পশুপাখির ব্যাপারে জয়নাবের ভালবাসার আচ্ছন্নতায়। জীবিত প্রানীদের প্রতি তার কোন কোমলতাই, অবশ্য, তার রাক্ষুসে মাংস ভক্ষণের পথে বাধা হয়ে দাড়াত না। বছরে অন্তত দুবার আনুজম তাকে পুরানো কেল্লার ভেতরের চিড়িয়াখানাটিতে নিয়ে যেত। ওখানে গন্ডার, হিপ্পোপটেমাস আর তার প্রিয় চরিত্র বর্ণিও থেকে আসা বাচ্চা গিবনটার কাছে জয়নাব বেড়াতে যেত।

 টেনডার বাডস নার্সারী স্কুলের কেজিবি(কিন্টার গার্ডেন সেকশান বি) তে তাকে ভর্তি করার কয়েক মাস পরে
সাকিব আর তার বউকে রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল তার অফিসিয়াল বাব মা হিসেবে- এমনিতে স্বাস্থ্যশক্তিতে ভরপুর ধেড়ে ইদুরটাকে একটা অসুস্থতার সময় পার করতে হল। খুব গুরুতর কিছু ছিল না, কিন্তু অসুখগুলি বারবার হচ্ছিল, আর এটা তাকে ক্লান্ত করে ফেলল, প্রত্যেকটা অসুখ তাকে পরবর্তীটার জন্য রেখে যেত আরো অরক্ষিত করে। ম্যালেরিয়ার আগে হল ফ্লু তার আগে হল দুটো ভিন্ন দফায় ভাইরাল জ্বর, একটা তেমন কিছু না, দ্বীতিয়টা চিন্তিত হওয়ার মত। অসহায়ের মত আনুজম জয়নাবকে নিয়ে ছটফট করত আর তার খোয়াবগহের দ্বায়িত্ব(যেগুলো এখন প্রধানতঃ ছিল প্রশাসনিক আর রক্ষণাবেক্ষণমূলক) পরিত্যাগ বিষয়ক গুন্জনগুলিকে পাত্তা না দিয়ে রাত দিন ধেড়ে ইদুরটার সেবা করত, মনে গোপন, বাড়তে থাকা আতঙ্ক নিয়ে। তার বদ্ধ বিশ্বাস দাড়িয়ে গেল যে কেউ একজন তার সৌভাগ্যে (আনজুমের) ইর্ষান্বিত হয়ে জয়নাবকে মন্ত্র করেছে। তার সন্দেহের সূচকটি সংশয়হীন ভাবে নির্দেশিত হল সায়ীদার দিকে, খোয়াবগহের তুলনামুলক ভাবে নতুন একজন বাসিন্দা। সায়ীদা আনজুমের তুলনায় বেশ কমবয়সী ছিল, এবং জয়নাবের স্নেহের জন্য সারিতে দ্বীতিয়জন। সে গ্রাজুয়েট ছিল আর ইংলিশ জানত। তার চেয়েও বড় কথা, সে হালের নতুন ভাষাটা জানত- সে সিসম্যান শব্দটা আর এফ থেকে এম আর এম থেকে এফ ব্যাবহার করতে পারত আর সাক্ষাৎকারগুলিতে নিজেকে সম্বোধন করত ট্রান্সপার্সন বলে। আনজুম, অন্যদিকে, ঠাট্টা করে এসবকে বলত ট্রান্স-ফ্রান্স ব্যাবসা, আর জেদির মত নিজেকে একজন হিজরা বলে সম্বোধন করার ব্যাপারে জোর দিত।

নতুন প্রজন্মের আরো অন্য অনেকের মতই, সায়ীদা প্রথাগত সালোয়ার কামিজ আর পশ্চিমা পোশাকের মধ্যে সহজেই বদলা বদলি করত। জিনস, স্কার্ট, হল্টার-নেক যেগুলো তার দীঘল, চমতকার পেশীবহুল পিঠটাকে দেখিয়ে বেড়াত। আন্চলিক স্বাদ আর পুরাতন দুনিয়ার মায়ামন্ত্রে তার যতটুকুই দৈন্যতা থাকুক, সেটা সে পূরণ করে ফেলত তার আধুনিক বিষয়ের বোঝাপড়া, তার জ্ঞান এবং লৈঙ্গিক অধিকারের দলগুলোর(দুটো কনফারেন্সে সে বক্তব্য পর্যন্ত দিয়েছে) সাথে তার সংলগ্নতার মাধ্যমে। এইসব কিছু তাকে আনজুমের থেকে বেশ ভিন্ন একটা দলে স্থাপন করত। একই সাথে, মিডিয়ার এক নম্বর জায়গাটি থেকে সায়ীদা আনজুমকে সরিয়ে দিয়েছিল। নতুন প্রজন্মের আনুকূল্যে বিদেশী পত্রিকারা পুরাতন বিচিত্রদেরকে ঝুড়িতে নিক্ষেপ করেছিল। বিচিত্রগণ মানানসই ছিলেন না নতুন ভারতের চেহারাটির সাথে একটা পারমাণবিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির একটি উত্থানশীল লক্ষ্যস্থল। উস্তাদ কুলসুম বাঈ, একজন কূটকৌশলী বৃদ্ধা-নেকড়ে, পরিবর্তনের এই বাতাসগুলির বিষয়ে হঁশিয়ার ছিলেন, আর খোয়াবগহে লাভের আগমন দেখতে পেলেন। তাই সায়ীদা, যদিও তার বয়োজৈষ্ঠতার অভাব ছিল, আনজুমের সাথে নিবিড় প্রতিযোগিতায় ছিল উস্তাদ হিসেবে খোয়াবগহের দ্বায়িত্ব গ্রহণের যখন উস্তাদ কুলসুম বাঈ সেটায় ইস্তফা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন, যেটা, ইংল্যান্ডের রাণীর মতই, করার ব্যাপারে তার কোন তাড়াহুড়ো আছে বলে মনে হত না।

উস্তাদ কুলসুম বাঈ এখনও খোয়াবগহের প্রধান সিদ্ধান্ত-গ্রহণকারী ছিলেন, তবে সেটার দৈনন্দিন বিষয়াদিতে তিনি প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন না। সকাল গুলিতে তার বাতের ব্যাথা তাকে কষ্ট দিত। তাকে তার চারপাইয়ে করে উঠানে শুইয়ে দেয়া হত। লেবু আর আমের আচারের বয়ামগুলির সাথে তিনিও রৌদ্রস্নাত হতেন। পাশে আটার পোকা দূর করা জন্য খবরের কাগজের উপর গমের আটা বিছানো থাকত। যখন রোদ খুব বেশী গরম হয়ে উঠত তাকে ফেরত নিয়ে যাওয়া হত ভেতরে। সেখানে ওনার পা টেপা হত আর সরিষার তেল মালিশ করা হত তার কোচকানো চামড়ায়। তিনি এখন পুরুষদের মত পোশাক পড়তেন। একটা দীর্ঘ হলুদ কুর্তা হলুদ কারণ তিনি হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়ার একজন শিষ্য ছিলেন- আর চেকের কাজ রা সাড়ং। তার মাথার যে পাতলা সাদা চুলগুলি কোনমতে তার তালু ঢেকে রাখত সেগুলিকে তিনি পিছনে একটা ছোট ঝুঁটি করে বাঁধতেন। কোন কোন দিন তার পুরাতন বন্ধু হাজী মিঞা, যিনি রাস্তার মাথায় সিগারেট আর পান বেচতেন, এসে হাজির হতেন তার সর্বকালের প্রিয় ফিল্মের অডিও ক্যাসেট নিয়ে, মুঘাল-এ-আজম। প্রত্যেকটা গান আর সংলাপের প্রত্যেকটা লাইন তারা অন্তর দিয়ে মুখস্থ করেছিলেন। তাই টেপটির সাথে সাথে তারাও গাইতেন আর বলতেন। তারা বিশ্বাস করতেন এমন কেউ নেই যে আর কোনদিন ওভাবে উর্দু লিখতে পারবেন। আর কোন অভিনেতা নেই যে কোনদিন দিলীপ কুমারের শব্দচয়ন আর বাচনভঙ্গির কাছাকাছি আসতে পারে। কোন কোন দিন উস্তাদ কুলসুম বাই সম্রাট আকবরের অভিনয় করতেন আর একই সাথে হতেন তার ছেলে শাহজাদা সেলিম, সিনেমার যে নায়ক, আর হাজী মিয়া হতেন আনারকালি (মধুবালা), সেই দাসী-কন্যা যাকে ভালবেসেছিলেন শাহজাদা সেলিম। কখনো কখনো তারা ভূমিকা পাল্টাতেন। অন্য আর কিছুর তুলনায়, তাদের এই সম্মিলিত পরিবেশনটি আসলে ছিল, একটা হারানো অহংকার আর মৃতপ্রায় ভাষার জন্য উদ্দীপনা।

এক সন্ধ্যায় আনজুম ছিলেন উপরতলায় তার রুমে ধেড়ে ইঁদুরটির উষ্ণ কপালটি ঠান্ডা পানিতে ভেজানো কাপড় দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছিলেন যখন তিনি উঠানে একটা গোলমালের আওয়াজ শুনলেন উঁচু গলার স্বর, দৌড়রত পা, লোকজনের চিল্লাচিল্লি। তার প্রথম সহজাত বোধটি ছিল অনুমান করা যে আগুন লেগে গেছে। এটা প্রায়ই ঘটত- রাস্তার ওপর ঝুলে থাকা খোলা বৈদ্যুতিক তারের বিশাল, জটপাকানো দংগলটির একটি অভ্যাস ছিল নিজে নিজে অগ্নিশিখায় বিস্ফোরিত হওয়ার। তিনি জয়নাবকে তুলে নিয়ে দৌড়ে সিড়ি দিয়ে নামলেন। সবাই উস্তাদ কুলসুম বাঈয়ের রুমের টিভির সামনে জড়ো হয়েছিলেন, টিভির ধিকধিকি আলোতে তাদের চেহারাগুলো আলো হয়ে আছে। একটা বানিজ্যিক বিমান একটা লম্বা বিল্ডিঙের মধ্যে ক্র্যাশ করেছে। তার অর্ধেকটা এখনও বেরিয়ে আছে, শুন্যে ঝুলে আছে অনিশ্চিতভাবে একটা ভাঙা খেলনার মত। মুহূর্তের মধ্যে একটা দ্বীতিয় বিমান একটা দ্বীতিয় বিল্ডিঙের মধ্যে ক্র্যাশ করল আর একটা আগুনের গোলকে পরিণত হল। খোয়াবগহের সাধারণতঃ বাচাল বাসিন্দারা মৃত্যুর মত নীরবতা নিয়ে দেখল যে লম্বা বিল্ডিঙদ্বয় বালুর স্তম্ভের মত ধ্বসে পড়ল। সবদিকে ধোঁয়া আর সাদা ধূলা। ধুলাটাও দেখতে অন্যরকম- পরিষ্কার আর বিদেশী। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানুষেরা লম্বা বিল্ডিঙগুলো থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে এল আর ভাসতে ভাসতে নীচে নামতে লাগল ছাইয়ের কণার মত।

এটা কোন চলচ্চিত্র ছিল না, টিভির লোকগুলি বলেছিল। এটা আসলেই ঘটছিল। আমেরিকায়। নিউ ইয়র্ক নামের একটি শহরে।
খোয়াবগহের ইতিহাসের দীর্ঘতম নীরবতাটি ভাঙল অবশেষে একটি প্রগাঢ় জিজ্ঞাসায়।
ওরা কি ওখানে উর্দু বলে? বিসমিল্লা জানতে চাইলেন
কেউ জবাব দিলেন না।
রুমের ভেতরের ধাক্কাটি জয়নাবকেও ছুয়ে গেল আর সে তার জ্বরজনিত একটি স্বপ্নের ঘোর থেকে নড়েচড়ে উঠেই সরাসরি আরেকটির মধ্যে চলে গেল। টেলিভিশনের পুনঃপ্রচার বিষয়টার সাথে সে পরিচিত ছিল না, তাই সে বিল্ডিঙের মধ্যে দশটা বিমানকে ক্র্যাশ করতে গুনল।
সবমিলিয়ে দশটা, যে শান্তভঙ্গিতে ঘোষণা দিল, তার নতুন, টেন্ডার বাডস ইংলিশে, আর নিজের মোটা, জ্বরগ্রস্থ গালটাকে আনজুমের গলার উপর তার স্বস্থানে ফিরিয়ে দিল।
 জয়নাবের উপর যে জাদু করা হয়েছে সেটা পুরো বিশ্বকেই অসুস্থ করে দিয়েছে। এটা ছিল শক্তিশালী সিফলি জাদু। আনজুম চোখের কোনা দিয়ে চতুর একটি দৃষ্টিপাত করল সায়ীদার দিকে দেখার জন্য যে সে কি নির্লজ্জের মত নিজের সফলতাকে উদযাপন করছে নাকী নিষ্পাপের ভাব ধরছে। অতিকৌশলী কুত্তীটা অভিনয় করছিল যে সে অন্য সবার মতই বিরাট একটা ধাক্কা খেয়েছে।

ডিসেম্বর নাগাদ পুরাতন দিল্লীতে বন্যা বয়ে গেল আফগান পরিবারদের, যারা পালিয়ে এসেছিল যুদ্ধবিমান থেকে-যেগুলো তাদের আকাশে গান গেত অমৌসুমী মশার মত, আর বোমার থেকে যেগুলো ইস্পাতের বৃষ্টির মত ঝরে পড়ত। অতি অবশ্যই মহান রাজনীতিবিদদের( পুরাতন শহরে, যেটার মধ্যে ছিল প্রত্যেক দোনাকদার আর মাওলানা) নিজ নিজ তত্ত্ব ছিল। বাকীদের ক্ষেত্রে, তাদের কেউই কিছুতেই বুঝতে পারত না আমেরিকার লম্বা বিল্ডিঙগুলির সাথে এই অভাগা লোকগুলির সম্পর্কটি কোথায় ছিল। কিন্তু পারতই বা কিভাবে? কে ছিল আর আনুজম ছাড়া যে জানত এই ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যের মূল কারিগর ওসামা বিন লাদেন, আতংকবাদী নয়, অথবা জর্জ ডব্লিউ বুশ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও নয়, বরন্চ আরেকটি অনেক বেশী শক্তিশালী, অধিক ধূর্ত, শক্তি: সায়ীদা (গুল মোহাম্মাদ), বাসিন্দা: খোয়াবগহ, গালি ডাকোটান, দিল্লী- ১১০০০৬, ভারত।

যে দুনিয়ায় ধেড়ে ইদুরটা বেড়ে উঠছৈ তার রাজনীতিটাকে আরো ভালভাবে বুঝার জন্য, আর একই সাথে  ঐ শিক্ষিত সায়ীদার সিফলী জাদু কে নস্যাৎ করে দেয়া বা অন্তত আগেই বুঝে ফেলার জন্য , আম্মু সংবাদপত্র পড়তে শুরু করলেন আরো মনোযোগের সাথে এবং টিভির খবরও দেখতে শুরু করলেন( যখনই অন্যরা তাকে সুযোগ দিত ডেইলী-সোপ গুলো থেকে সরে অন্য চ্যানেলে যাওয়ার।)

লম্বা বিল্ডিঙগুলির মধ্যে যে বিমানগুলো উড়ে এসে ঢুকে গিয়েছিল তারা ভারতের অনেকের জন্যও আশীর্বাদ হয়ে আসল। দেশটির কবি প্রধানমন্ত্রীটি আর তার কিছু বয়োজেষ্ঠ্য মন্ত্রীগণ একটা পুরাতন সংগঠনের সদস্য ছিলেন যারা বিশ্বাস করতেন যে ভারত আসলে মূলতঃ একটি হিন্দু জাতি এবং, ঠিক যেভাবে পাকিস্তান নিজেকে একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে, ভারতেরও সেরকম হিন্দু একটি হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দেয়া উচিত। এর কিছু সমর্থক আর আদর্শবাণী খোলাখুলিভাবে হিটলারের প্রশংসা করত আর ভারতের মুসলিমদেরকে তুলনা করত জার্মানীর ইহুদীদের সাথে। এখন, হঠাৎ করেই যখন, মুসলিমদেরকে শত্রুজ্ঞান করার ব্যাপারটা বেড়ে গেল, সংগঠনটির কাছে এরকম মনে হতে লাগল যে পুরো বিশ্ব এখন তার দিকে এসে দাড়িয়েছে। কবি-প্রধানমন্ত্রীটি আধো আধো বোলে একটা বক্তৃতা করলেন, বাচনভঙ্গি চমৎকার, শুধু সেই দীর্ঘ, ধৈর্যচ্যুতি ঘটানো বিরতিগুলি ছাড়া যখন তিনি তার তর্কের সুত্রটি হারিয়ে ফেলছিলেন, যেটা বারবার ঘটছিল। তিনি একজন বৃদ্ধ লোক ছিলেন, কিন্তু তার একটা যুবা পুরুষের মত মাথা ঝাঁকি দেয়ার ভঙ্গিমা ছিল, অনেকটা ১৯৬০ সালের বোম্বে ফিল্মস্টারদের মত।
এই মুসালমান, সে পছন্দ করে না অন্যকে তিনি বললেন কাব্যিকভাবে হিন্দীতে, এবং তার মানদন্ডের বিবেচনাতেও যথেষ্ট দীর্ঘ একটা সময় বিরতি দিলেন। তার বিশ্বাস সে ছড়াতে চায় আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। এই দ্বিপদী চরণটি তিনি তৎক্ষণাৎ রচিত করলেন এবং নিজের ব্যাপারে অতিরিক্ত খুশি হয়ে গেলেন। প্রত্যেকবার যখন তিনি মুসলিম বা মুসালমান বললেন তার আধো আধো বোলটি একটা ছোট বাচ্চার মতই আদুরে শোনাল। নতুন বিধানে তাকে একজন আধুনিক বিবেচনা করা হয়েছিল। তিনি সাবধান করে দিলেন যে যা ঘটেছে আমেরিকায় তা খুব সহজেই ভারতে ঘটতে পারে এবং যে, এখন সময় হয়েছে সরকারের নিরাপত্তামূলক ব্যাবস্থা হিসেবে একটি নতুন জঙ্গি-বিরোধী আইন পাশ করার।

প্রত্যেক দিন আনজুন, খবরের নতুন দর্শক, বোমা বিস্ফোরণ আর জঙ্গি হামলা নিয়ে টিভির প্রতিবেদনগুলি দেখতেন যেগুলি হঠাৎ করেই বেড়ে গিয়েছিল ম্যালেরিয়ার মত। উর্দু পত্রিকাগুলি প্রতিদিনই বহন করে নিয়ে আসত পুলিশের কথিত এনকাউন্টার নামক এক জিনিষে কম বয়সী মুসলিম ছেলেদের মারা যাওয়ার গল্প, অথবা জঙগি হামলার পরিকল্পনাকালে হাতে নাতে ধরা পড়ার এবং গ্রেপ্তার হওয়ার খবর। একটা নতুন আইন পাশ হয়েছিল যেটার আওতায় সন্দেহভাজনদের মাসের পর মাস কোন বিচার প্রক্রিয়া ব্যাতীতই আটকে রাখা যেত। খুব একটা সময় যেতে না যেতেই সব কারাগারগুলো ভর্তি হয়ে গেল কমবয়সী মুসলিম পুরুষদের দিয়ে। আনজুম সর্বশক্তিমানকে ধন্যবাদ দিলেন যে জয়নাব মেয়ে ছিল। এটা অনেক বেশী নিরাপদ একটা ব্যাপার।

যখন শীত পড়ে গেল, ধেড়ে ইদুরটার একটা গাঢ়, বুকে-বসে-যাওয়া কাশি হল। আনজুম তাকে চায়ের চামচে করে করে হলুদ মেশানো দুধ দিতেন আর সারা রাত জেগে জেগে শুনতেন জয়নাবের হাপাঁনির মত বিজবিজ শব্দ। তার নিজেকে একেবারে অসহায় মনে হত। তিনি হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়ার দর্গায় উপস্থিত হয়ে একটু কম উগ্র খাদিমদের একজনের সাথে কথা বললেন যাকে জয়নাবের অসুস্থতার ব্যাপারে তিনি ভালভাবে জানিয়েছিলেন আর জিজ্ঞেস করলেন যে কিভাবে তিনি সায়ীদার সিফলি জাদুকে নস্যাৎ করে দিতে পারেন। বিষয়গুলি হাতের বাইরে চলে গিয়েছে, তিনি ব্যাখ্যা করলেন, আর এখন যখন জিনিষটা একটা ছোট্ট মেয়ের ভাগ্যের থেকেও বেশী কিছুর সাথে জড়িত, তার, আনজুমের, যিনি ছিলেন সেই একমাত্র ব্যাক্তি যিনি জানতেন সমস্যাটা কি, কিছু দ্বায়িত্ব রয়েছে। যা করা দরকার তা করার জন্য তিনি যতদূর যাওয়া প্রয়োজন যেতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি যেকোন মুল্য দিতে রাজী ছিলেন, তিনি বললেন, এমনকি যদি তার মানে দাড়ায় ফাঁসির মন্চে যাওয়া। সায়ীদাকে আটকাতেই হবে। তার খাদিম সাহেবের আশীর্বাদ দরকার। তিনি নাটকীয় আর আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলেন, লোকজন ঘুরে তাকাতে লাগল আর খাদিম সাহেবের তাকে শান্ত করতে হল। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন যে জয়নাব তার জীবনে আসার পর থেকে তিনি আজমীরে হযরত গরীব নওয়াজের দর্গায় গিয়েছিলেন কি না। যখন তিনি বললেন যে এই কারণ আর সেই কারণে তার সেটা করা হয়ে ওঠেনি, তিনি তাকে বললেন সমস্যা ওইখানে, কারো সিফলী জাদু নয়। তিনি তার সাথে একটু বেজার হলেন যে আনজুম নিজেকে জাদুবিদ্যা আর মন্ত্রতন্ত্রে বিশ্বাস করতে দিলেন যেখানে হযরত গরীব নেওয়াজ রয়েছেনই তার সুরক্ষার জন্য। আনজুমের মন পুরোপুরি মানল না, কিন্তু স্বীকার করলেন যে তিন বছর ধরে আজমীর শরীফে না যাওয়াটা তার নিজের দিক থেকে একটা মারাত্নক ত্রুটি হয়ে গিয়েছে।

সেটা ছিল ফেব্রুয়ারীর শেষদিক যতদিনে জয়নাব অতটুকু সুস্থ হয়েছিল যে আনজুমের মনে হল তাকে সে কয়েক দিনের জন্য রেখে ঘুরে আসতে পারে। জাকির মিঞা, এ-ওয়ান ফ্লাওয়ারের মালিক এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টার, রাজী হলেন আনজুমের সাথে ভ্রমণ করতে। জাকীর মিঞা ছিলেন মুলাকাত আলীর একজন বন্ধু মানুষ আর আনজুমকে তার জন্ম থেকে চিনতেন। তার বয়স সত্তর ছাড়িয়ে আশির দিকে যাচ্ছিল, একজন হিজড়ার সাথে ভ্রমণ করছেন দেখে লজ্জিত হওয়ার মত বয়সটা তার ছিল না। তার দোকান, এ-ওয়ান ফ্লাওয়ার, ছিল মূলতঃ একটি কোমর সমান উঁচু সিমেন্টের বেদী, একটা এক মিটারের বর্গ, আনজুমের পুরাতন বাসার একটি বারান্দার নীচে অবস্থিত, রাস্তার সেই বাঁকটিতে যেখানে চিতলী কাবার এসে খুলেছে মাতিয়া মহল চকে। জাকির মিয়াকে এটা ভাড়া দিয়েছিলেন মুলাকাত আলী আর এখন সাকিব- এবং সেখান থেকে তিনি এ-ওয়ান ফ্লাওয়ার পরিচালনা করেছেন গত পন্চাশ বছর ধরে। তিনি সারাদিন একটা মোটা কাপড়ের ওপর বসে থাকতেন, মালা গাথতেন লাল গোলাপের আর (আলাদাভাবে) নতুন-কড়কড়ে টাকার নোট দিয়ে যেগুলোকে তিনি ভাজ করে বানাতেন ছোট ছোট ফ্যান আর ছোট ছোট পাখি। তিনি এসব তৈরী করতেন বরগণ তাদের বিয়ের দিনে পরবে বলে। তার প্রধান চ্যালেন্জটি ছিল এবং এখনও হল যে তার দোকানের ক্ষুদ্র জায়গাটুকুর মধ্যে, ফুলগুলোকে তাজা আর ভিজা ভিজা রাখা এবং টাকার নোটগুলোকে কড়কড়ে আর শুকনা রাখা। জাকির মিয়া বললেন তার আজমীর যাওয়া দরকার আর ওখান থেকে পরে যাবেন গুজরাটের আহমেদাবাদে। আহমেদাবাদে ওনার কিছু কাজ আছে নিজের স্ত্রীর পরিবারের সাথে। আজমীর থেকে তিনি একা একা ফিরে আসলে যেই হেনস্থা আর আপমান সহ্য করতে হবে (দেখা ফেলার এবং একই সাথে না দেখে ফেলারও) সেই ঝুঁকির তুলনায় আনজুম জাকির মিয়ার সাথে আহমেদাবাদে ভ্রমণ করতে প্রস্তুত ছিলেন। তার দিকে থেকে, জাকির মিয়া, এখন বেশ দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন আর সাথের মালামাল টানাটানিতে সাহায্য করার মত কেউ একজন পাশে আছে এতেই তিনি বেশ খুশি ছিলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন যে যখন তারা আহমেদাবাদে যাবেন তারা ওয়ালি দাখানির মাজারটি থেকে ঘুরে আসতে পারেন, সেই সপ্তদশ শতাব্দীর উর্দু কবি, প্রেমের কবি হিসেবে তিনি সুপরিচিত, যার প্রবল ভক্ত ছিলেন মুলাকাত আলী, এবং কবি সাহেবের আশীর্বাদও নেয়া যেতে পারে। তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনার তারা সমাপ্তি টানলেন হাসতে হাসতে কবি সাহেবের একটা দ্বিপদী চরণমালার আবৃত্তি করে মুলাকাত আলীর প্রিয়গুলির একটি-
   
             প্রেমের তীর বিধিল যারে
              বোঝার মত ভারী তার তো লাগেই দুনিয়ারে
কয়েকদিন পর তারা ট্রেনে করে বেরিয়ে পড়লেন। তারা আজমীর শরীফে ব্যায় করলেন দুই দিন। আনজুম ভক্তদের ভীড় ঠেলে এগিয়ে চললেন আর একহাজার রুপি দিয়ে একটা সবুজ আর সোনালী চাদর কিনলেন জয়নাবের নামে হযরত গারীব নেওয়াজের প্রতি নিবেদন হিসেবে। দুই দিনই তিনি পাবলিক পেফোন থেকে খোয়াবগহে ফোন করলেন। তৃতীয় দিনে, জয়নাবের দুঃশ্চিন্তায়, আহমেদাবাদগামী গারীব নেওয়াজ এক্সপ্রেসে ওঠার ঠিক আগে তিনি আবারো ফোন করলেন আজমীর রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে। সেটার পর তার বা জাকির মিয়া কারো কাছ থেকেই আর কোন খবর পাওয়া গেল না। জাকির মিয়ার ছেলে তার মায়ের পরিবারকে আহমেদাবাদে ফোন করল। লাইনটা দেখা গেল কাজ করছে না।

                                  ****
যদিও আনজুমের কাছ থেকে তারা কোন খবর পেল না, গুজরাট থেকে খবরটা ছিল ভয়াবহ। একদল লোক একটি রেলওয়ে কোচে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল যাদেরকে সংবাদপত্র প্রথমে বলল দুষ্কৃতিকারী। ষাটজন হিন্দু তীর্থযাত্রী জ্যান্ত পুড়ে গেলেন। তারা নিজেদের ঘরে ফিরছিলেন অযোধ্যা থেকে। অযোধ্যায় তারা আনুষ্ঠানিক ইট বহন করেছিলেন একটা গ্র্যান্ড হিন্দু মন্দিরের ভীত বসানোর জন্য। মন্দিরটি তারা যেখানে নির্মাণ করতে চাচ্ছিলেন সেখানে আগে একটা পুরাতন মসজিদ ছিল। মসজিদটিকে, সেই বাবরী মসজিদকে, একটা চিৎকাররত উশৃঙ্খল জনতা দশ বছর আগে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিল। একজন সিনিওর ক্যাবিনেট মন্ত্রী(যিনি বিরোধী দলে ছিলেন এবং প্রত্যক্ষ করেছিলেন ঘটনাটি যখন চিৎকাররত জনতাটি মসজিদটি ছিড়ে খুড়ে ফেলছিল), বললেন যে ট্রেন পোড়ানোটা দেখে একদম মনে হচ্ছে পাকিস্তানী জঙ্গিদের কাজ। পুলিশ গ্রেপ্তার করল শতশত মুসলিমদের- যারা সকলেই তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে পাকিস্তানীদের দোসর। পুলিশরা মুসলিমদের গ্রেপ্তার করল রেলওয়ে স্টেশনের আশেপাশের এলাকা থেকে এবং তাদের নিক্ষেপ করল কারাগারে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী, সংগঠনটির একজন বিশ্বস্ত সদস্য(যেমনটি ছিলেন গৃহমন্ত্রী আর প্রধানমন্ত্রী)সেই সময় পুনরায় নির্বাচনে লড়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তিনি টিভিতে দেখা দিলেন গায়ে একটি জাফরানী কুর্তা আর কপালে সিঁদুরের একটি দাগ নিয়ে এবং ঠান্ডা, মৃত আঁখিদ্বয়ে হুকুম দিলেন হিন্দু তীর্থযাত্রীদের দগ্ধ মৃতদেহগুলি আহমেদাবাদে নিয়ে আসার, রাষ্ট্রের রাজধানীতে। সেখানে লাশগুলোকে নিয়ে সাধারণ জনতার জন্য একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে যেখানে জনতা নিজেদের শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবেন। একজন বেজির মত দেখতে অনানুষ্ঠানিক প্রতিনিধি অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলেন যে প্রত্যকটি ক্রিয়ার জবাব দেওয়া হবে একটা সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া দিয়ে। তিনি অবশ্য সঙ্গত কারণেই নিউটনের প্রতি কোন প্রকার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন না, কারণ, বিরাজমান পরিস্থিতিতে, আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত অবস্থানটি ছিল যে প্রাচীন হিন্দুরাই আবিষ্কার করেছেন সকল বিজ্ঞান।

প্রতিক্রিয়াটি, যদি আসলেই তাই হয় যা সেটা ছিল, না ছিল সমান না বিপরীত। হত্যাকান্ডটি সপ্তাহর পর সপ্তাহ চলল এবং শুধু শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকল না। উগ্র জনতার হাতে শোভা পাচ্ছিল তরবারী আর ত্রিশূল এবং তাদের কপালে বাঁধা ছিল জাফরানী রঙের ফেট্টি। তাদের কাছে পরিপূর্ণ তথ্য সম্বলিত তালিকা ছিল মুসলিমদের ঘরবাড়ি, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান এবং দোকানের। তাদের কাছে গ্যাস সিলিন্ডারের মজুদের স্তুপ ছিল(যেটা মনে হয় বিগত সপ্তাহগুলোতে গ্যাসের সংকটটিকে ব্যাখ্যা করে)। যেসব লোক আহত হয়েছে তাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে, উগ্র জনতা হাসপাতালে আক্রমণ করত। হত্যার মামলা খাতায় তুলছিল না পুলিশ। তারা জানালেন, বেশ যৌক্তিকতার সাথেই, যে তাদেরকে আগে লাশ দেখাতে হবে। এখানে চাতুরীটা ছিল যে পুলিশ অধিকাংশ সময়েই উগ্র জনতার অংশ ছিল, এবং একবার যখন জনতা তাদের কার্য সমাধা করে ফেলেছে, লাশগুলোকে আর লাশের মত দেখাত না।

কেউই দ্বিমত করল না যখন সায়ীদা (যে আনজুমকে ভালবাসত এবং তাকে নিয়ে আনজুমের সন্দেহের বিষয়ে কোন ধারণাই রাখত না) প্রস্তাব দিলেন যে টিভির সোপ অপেরাগুলি বন্ধ করে খবর চালু করা উচিত এবং চালু করে রেখে দেয়া উচিৎ কারণ যদি, কোন এক ক্ষুদ্র নিয়তিবশতঃ, তারা কোন সামান্য সূত্র হলেও উদ্ধার করতে পারে যে কি হয়ে থাকতে পারে আনজুম আর জাকির মিয়ার। টিভি চালু করলেই, টিভি চ্যানেলের চিত্রায়িত প্রতিবেদকগণ ক্যামেরার-দিকে-তাদের খবরগুলো চিৎকার করতে থাকতেন শরনার্থী শিবির থেকে, যেখানে এখন হাজার দশেক গুজরাটি মুসলিম বাস করছিলেন। খোয়াবগহে তারা টিভির আওয়াজটা বন্ধ করে দিতেন আর পেছনের দৃশ্যগুলি খুঁটিয়ে মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন যদি এক ঝলকের জন্য আনজুম আর জাকির মিয়াকে দেখা যায় খাবার বা কম্বলের জন্য লাইন ধরতে, অথবা কোন তাঁবুতে গাদাগাদি করে থাকতে। তারা আশপাশ থেকে জানলেন যে ওয়ালি দাখানির মাজারটি গুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে এবং ওপর দিয়ে একটা আলকাতরা লেপিত রাস্তা বানিয়ে দেয়া হয়েছে, কোন দিন তার অস্তিত্ব ছিল তেমন সকল চিহ্ন মুছে দিয়ে।(তবে না পুলিশ না উগ্র জনতা না মুখ্যমন্ত্রী কেউই কিছু করতে পারল ঐ লোকদের বিষয়ে যারা আলকাতরা লেপিত রাস্তাটির মধ্যভাগে ফুল রেখে যেতে লাগল। ঐখানেই আগে দাখানি সাহেবের মাজারটা ছিল। দ্রুতগমনকারী গাড়িদের চাকার নীচে যখন ফুলগুলো পিষ্ট হয়ে যেত, তখন নতুন ফুলেরা দেখা দিত। আর ফুলের প্যেস্ট এবং কবিতার মধ্যকার সংযোগটি নিয়ে কারই বা কি করার থাকে?) সায়ীদা তার চেনা প্রত্যেক সাংবাদিক আর প্রত্যেক এনজিও কর্মীকে ফোন দিলেন আর তাদের কাছে হাতজোড় করলেন সাহায্যের জন্য। কেউ কিছু বের করতে পারল না। সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলে গেল কোন খবর ছাড়া। জয়নাব তার অসুস্থতার পালাটি কাটিয়ে উঠল এবং স্কুলে ফিরে গেল, কিন্তু স্কুলের সময় টুকুর বাইরে সে ছিল ঝগড়াটে এবং দিনরাত সায়ীদার সাথে ঝুলে থাকত।

                **********
দু মাস পর, খুনাখুনিটা যখন একটু বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছে এবং কম বেশী হ্রাস পেয়ে আসছিল, জাকির মিয়ার জৈষ্ঠ পুত্র, মানসুর, নিজের বাবার খোঁজে আহমেদাবাদে তার তৃতীয় সফরে গেলেন। সাবধানতা হিসেবে, তিনি তার দাড়ি কামিয়ে ফেললেন এবং কব্জিতে পূজার লাল সুতা বাঁধলেন, হিন্দু হিসেবে নিজেকে চালিয়ে দেয়ার আশায়। তিনি কখনই নিজের বাবাকে আর খুঁজে পেলেন না, যদিও জানতে পারলেন বাবার সাথে কি ঘটেছিল। তার অনুসন্ধান তাকে নিয়ে গেল আহমেদাবাদের বাইরের দিকে একটা মসজিদের ভেতরের ছোট্ট শরণার্থী শিবিরে, যেখানে পুরুষদের অংশে তিনি আনজুমকে খুঁজে পেলেন, এবং তাকে খোয়াবগহে ফেরত নিয়ে আসলেন।

আনজুম চুল কেটেছিলেন। তার চুলের যা-ই বা থেকে গেছে সেটুকু এখন তার মাথার উপর একটি ইয়ারমাফ বিহীন হেলমেটের মত বসে আছে। একটা জুনিওর আমলার মত পোশাক পড়েছিলেন তিনি। গাঢ় বাদামী রঙের পুরুষদের টেরী কটনএর পায়জামা আর একটা চেক-চেক, ছোট হাতার সাফারী শার্ট। তার বেশ ভাল পরিমাণ ওজন কম গিয়েছিল।

জয়নাব, সাময়িক ভাবে আনজুমের নতুন পৌরষালি রূপটি দেখে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল। তবে সে নিজের ভয় কাটিয়ে উঠল আর ছুটে গেল আনজুমের বাহুডোরে। খুশিতে সে ছোট ছোট চিৎকারের মত আওয়াজ করতে লাগল। আনজুম তাকে নিজের কাছে আকড়ে ধরল। কিন্তু অন্যদের অশ্রু আর প্রশ্ন আর স্বাগত আলিঙ্গনের জবাব দিল আবেগহীনভাবে, যেন তাদের অভ্যার্থনাগুলো ছিল একটি ধৈর্যের পরীক্ষা এবং সে নিতান্ত নিরুপায় হয়ে সেটাতে অংশ নিচ্ছে। আনজুমের শীতলতায় তারা আহত এবং সামান্য ভীত হলেন। কিন্তু নিজেদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাত্যয় ঘটিয়ে আন্তরিক রইলেন তাদের সহমর্মিতা এবং উৎকন্ঠায়।

যত তাড়াতাড়ি পারলেন, আনজুম উপরে তার রুমে গেলেন। তিনি আবির্ভুত হলেন ঘন্টাখানেক পড়ে, তার স্বাভাবিক পোশাকে, চেহারায়্ লিপস্টিক আর মেকাপ এবং চুলে কতগুলো সুন্দর সুন্দর ক্লিপ। এটা দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে উঠল যে যা ঘটেছে তা নিয়ে তিনি কথা বলতে চান না। তিনি জাকির মিয়ার ব্যাপারেও কোন প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। সবই ছিল ইশ্বরের ইচ্ছা, এতটুকুই তিনি বললেন।

আনজুমের অনুপস্থিতিতে জয়নাব নীচের তলায় সায়ীদার সাথে ঘুমাতে শুরু করেছিল। সে আনজুমের সাথে ঘুমাতে ফিরে আসল, কিন্তু আনজুম লক্ষ্য করলেন যে সে সায়ীদাকেও আম্মু ডাকতে শুরু করেছে।
ও যদি আম্মু হয়, তাহলে আমি কে? আনজুম জয়নাবকে জিজ্ঞেস করলেন কয় দিন পর।কারও তো দুটো আম্মু থাকে না।
বারি আম্মি, জয়নাব বলল। বড় আম্মু।
উস্তাদ কুলসুম বাঈ নির্দেশনা দিলেন যে আনজুম যা চায় তাই করতে দিয়ে তাকে শান্তিতে থাকতে দিতে হবে, যতদিন সে চায় ততদিনের জন্য।
যা আনজুম চাইতেন তা হল একা থাকতে।
তিনি নীরব ছিলেন, অস্বস্তিজনক ভাবেই, এবং নিজের অধিকাংশ সময় ব্যায় করতেন তার বইগুলির সাথে। এক সপ্তাহ সময়ের মধ্যে তিনি জয়নাবকে কিছু একটা জপ করতে শেখালেন যেটা খোয়াবগহের কেউই বুঝত না। আনুজম জানালেন যে সেটা ছিল একটি সংস্কৃত স্তব, গায়ত্রী মন্ত্র। গুজরাটের শিবিরে থাকার সময় তিনি এটা শিখেছিলেন। লোকেরা সেখানকার বলেছিল যে এটা জেনে রাখা ভাল কারণ উগ্র জনতার সামনে পড়ে গেলে তারা এটা আবৃত্তি করে নিজেদেরকে হিন্দু হিসেবে চালিয়ে দিতে পারবে। যদিও সে বা আনজুম কারোরই কোন ধারণা ছিল না যে এর অর্থ কি, জয়নাব দ্রুতই সেটা শিখে নিল এবং আনন্দিত চিত্তে জপ করত দিনে অন্তত বিশবার, যখন সে স্কুলে যাওয়ার জন্য কাপড় পড়ত, যখন ব্যাগ গোছাতো, যখন সে তার ছাগলকে খাওয়াত:

ওম ভার ভুবাহ সোয়াহা
তাত সাভিতার ভারেনাম
ভারগো দেবাশ্যা ধীমাহি
ধিয়ো ইয়ো না প্রাচোডায়াত

এক সকালে আনজুম বাড়ি ছেড়ে বের হলেন, জয়নাবকে তার সঙ্গে নিয়ে। তিনি ফিরলেন একজন সম্পুর্ণ রুপান্তরিত ধেড়ে ইদুরকে নিয়ে। তার চুল কেটে ছোট করা হয়েছিল এবং সে ছেলেদের পোশাক পরা ছিল; একটা বাচ্চাদের পাঠান স্যুট, এমব্রোয়ডারী করা জ্যাকেট, জুতা যাদের অগ্রভাগগুলি গন্ডোলা নৌকার মত উপরের দিকে বাঁকানো।
এভাবেই বেশী নিরাপদ, আনজুম ব্যাখ্যা করার ভঙ্গিতে বললেন।গুজরাট  দিল্লীতে আসতে পারে যে কোনদিন। আমরা ও-কে ডাকব মাহদী।
 জয়নাবের বিলাপ শোনা গেল সমস্ত রাস্তা জুড়ে এ মাথা থেকে ও মাথায়- মুরগিরা শুনল নিজেদের খাচার ভেতর থেকে আর কুকুর ছানারা তাদের নর্দমায়।

                               **********

একটা জরুরী মিটিং ডাকা হয়েছিল। সময়টা ধরা হয়েছিল দৈনন্দিন বিদ্যুত বন্ধ থাকার দুটি ঘন্টায় । এতে করে কারো কাছ থেকে টিভির সিরিয়ালগুলো মিস করার অভিযোগ আসবে না। জয়নাবকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল হাসান মিয়ার নাতনিদের সাথে সন্ধ্যাটি কাটানোর জন্য। তার মোরগটি টিভির পাশের শেলফের উপর তার নিজস্ব ঝিমানোর জায়গাটিতে ছিল। উস্তাদ কুলসুম বাই সভাটিকে সম্ভাষণ করলেন তার বিছানার উপর ঠেস দিয়ে। তার পিঠটাকে ঠেকা দেয়া হয়েছিল একটা গোটানো রাযাই দিয়ে। বাকী সবাই বসেছিল মাটিতে। আনজুম গোমড়ামুখে চৌকাঠের আশেপাশে ঘুর ঘুর করছিলেন। পেট্রোম্যাক্স লন্ঠনের হিসহিস করা নীল আলোয় কুলসুম বাইয়ের চেহারাটি একটি শুকিয়ে যাওয়া নদীর তলদেশের মত দেখাল, তার পাতলা হয়ে আসা সাদা চুল সেই ক্ষীয়মান তুষারস্রোতটি যার থেকে এই নদী শুরু হয়েছিল একদিন। অনুষ্ঠানটি উপলক্ষ্যে তিনি তার নকল দাঁতের অস্বস্তিকর নতুন পাটিটি লাগিয়েছিলেন। তিনি কথা বললেন কর্তৃত্ব এবং একটি ব্যাপক নাটকীয়তা বোধ সহকারে। তার শব্দগুলোকে মনে হল খোয়াবগহের সবেমাত্র যোগদানকারী নবাগতদের প্রতি উদ্দিশ্ট। তবে কথার ধরণটি নির্দেশিত ছিল আনজুমের দিকে।
এই বাড়িটার, এই সংসারটার, একটা ভাঙনহীন ইতিহাস রয়েছে যা এই ভাঙা চোরা শহরটির মতই পুরান, তিনি বললেন। এই চুন উঠতে থাকা দেয়াল, এই পানি পড়া ছাদ, এই রোদে ভেজা উঠান সবই একসময় সুন্দর ছিল। এই মেঝেগুলি কার্পেটে ঢাকা থাকত যেগুলি সরাসরি আসত ইশাফান থেকে, ছাদগুলো সাজানো ছিল আয়না দিয়ে। যখন শাহেনশাহ শাহ জাহান লাল দুর্গ আর জামা মাসজিদ বানালেন, তিনি যখন বানালেন এই দেয়ালঘেরা শহরটা, তিনি আমাদের ছোট হাভেলিটাও তৈরী করলেন। আমাদের জন্য। সবসময় মনে রাখবা- আমরা শুধু যেকোন একটা জায়গার যেকোন হিজড়া নই। আমরা শাহজাহানাবাদের হিজড়া। আমাদের শাসকরা আমাদেরকে যথেষ্ট বিশ্বাস করতেন যে তাদের স্ত্রী আর মায়েদের দেখাশোনার ভার আমাদেরকে দিয়েছিলেন। একসময় আমরা মুক্তভাবে তাদের ব্যাক্তিগত ঘরগুলোর মধ্যে চলাফেরা করতাম, লাল দুর্গের জেনানায়। তারা সবাই এখন চলে গিয়েছে, ঐসব মহা শক্তিধর সম্রাটরা আর তাদের রাণীগণ। কিন্তু আমরা এখনও এখানে আছি। সেটা নিয়ে চিন্তা কর আর নিজেদেরকে জিজ্ঞেস কর যে কেন তেমনটা হবে।

উস্তাদ কুলসুম বাইয়ের খোয়াবগহের ইতিহাস বিষয়ক স্মৃতিচারণে লাল দুর্গটি সবসময়ই একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। পুরান দিনগুলিতে, যখন তিনি সক্ষম শরীরের ছিলেন, আলো আর শব্দের খেলা দেখার জন্য দুর্গে একটি ক্ষুদ্র সফর করা নবাগতদের দীক্ষিতকরণ অনুষ্ঠানের একটি বাধ্যতামূলক অংশ ছিল। তারা যেতেন একটি দল বেঁধে, হাত ধরাধরি করে, জীবন আর অঙ্গের ঝুঁকি নিয়ে ঢুকে পড়তেন চাদনী চকের ট্রাফিকের মধ্যে। সেখানে বিভ্রান্তিকর একটি  জটলা লেগে থাকত গাড়ি, বাস, রিক্সা আর টাঙ্গার। যারা এই বাহনগুলো চালাতেন সেই লোকগুলি একটি যন্ত্রণাদায়ক শ্লথ গতি সত্ত্বেও কিভাবে জানি বেপোরোয়া হতে পারতেন।

দুর্গটি পুরাতন শহরটির পাশে দৃশ্যমান ছিল। বেলে পাথরের একটি বিশাল মালভূমি। আকাশরেখার এত ব্যাপক একটি অংশজুড়ে তার অবস্থান যে আন্চলিক লোকেরা দুর্গটিকে আলাদা করে খেয়াল করাই বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন। যদি না কুলসুম বাঈ বেশী জোরাজুরি করতেন, হয়তো খোয়াবগহের কারুরই সেখানে কোনদিন যাওয়ার মত সাহস হয়ে উঠত না, এমনকি আনজুমেরও না, যার জন্ম আর বেড়ে ওঠাই এই দুর্গের ছায়াতে। চারপাশের পরিখাটি তারা পাড় হওয়ার পর আবর্জনা আর মশায় যেটা পরিপূর্ণ- এবং দরজার বিশাল পথটি পার হওয়ার পর, শহরটি নিজের অস্তিত্ব নিয়ে উধাও হয়ে যেত। ছোট ছোট, পাগলাটে চোখের বানরেরা ছোটাছুটি করছে বেলে পাথরের উঁচু উঁচু কেল্লাগুলির উপর থেকে নীচে। যে কেল্লাগুলো নির্মিত হয়েছিল এমন একটা মাপে আর সৌষ্ঠবে যেটা আধুনিক মানসের চিন্তাতেও আসে না। দুর্গের ভেতরে ছিল একটি ভিন্ন জগত, একটি ভিন্ন সময়, একটি ভিন্ন বাতাস (যেটার গন্ধটা ছিল বিশেষভাবে গাঁজার মত) আর একটা ভিন্ন আকাশ- একটা চিকন, রাস্তার সমান প্রশস্ত টুকরো নয় যেটা বৈদ্যুতিক তারের একটি জটলার মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়, বরন্চ সীমাহীন একটি আকাশ যেটাতে ঘুড়িরা চক্কর খায়, অনেক উপরে আর নীরবে, ঘূর্ণিবাতাসের বাঁকে।

সাউন্ড এন্ড লাইট শো টা ছিল লাল দুর্গ আর সেখান থেকে যেসব সম্রাটগণ দুশ বছরের বেশী সময় ধরে শাসন করেছেন তাদের ইতিহাসের একটি পুরাতন-সরকার-স্বীকৃত সংস্করণ(নতুন সরকার এটির উপর তখনও হস্তক্ষেপ করেনি)। সম্রাটদের মধ্যে ছিলেন শাহজাহান যিনি দুর্গটি নির্মাণ করেছিলেন তার থেকে নিয়ে বাহদুর শাহ জাফর, শেষ মুঘল যিনি, যাকে ১৮৫৭ সালের ব্যার্থ অভ্যুত্থানের পর বৃটিশ কর্তৃক নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। এটা ছিল উস্তাদ কুলসুম বাইয়ের জানা একমাত্র আনুষ্ঠানিক ইতিহাস। যদিও এই বিষয়ে ওনার পঠনটি যতটা অগতানুগতিক ছিল লেখকরাও ততটা চাননি। তাদের বেড়াতে যাওয়ার সময়গুলিতে, তিনি এবং তার ক্ষুদ্র বাহীনিটি নিজেদের জায়গা ভাগ করে নিতেন অন্য দর্শকদের সাথে, যারা মুলতঃ পর্যটক আর স্কুলের বাচ্চারা। তারা বসতেন সারি সারি কাঠের বেন্চগুলিতে যেগুলোর নীচে
বাস করত মশাদের ঘন মেঘ । কামড় খাওয়া উপেক্ষা করার জন্য দর্শকদেরকে একটি আরোপিত ঔদাসীন্যের ভঙ্গিমা নিয়ে বসতে হত, এবং প্রত্যেক অভিষেক, যুদ্ধ, গনহত্যা, বিজয় আর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে নিজেদের পা গুলো দোলাতে হত।

উস্তাদ কুলসুম বাইয়ের আগ্রহের বিশেষ জায়গাটি ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ, সম্রাট মোহাম্মাদ শাহ রাংগিলার শাসনকাল। যিনি শারীরিক সুখ, সংগীত আর চিত্রকলার একজন কিংবদন্তী প্রেমিক ছিলেন। সবচেয়ে হাসিখুসি মুঘলটি ছিলেন তিনি। কুলসুম বাই তার সংগীদের জোর দিতেন ১৭৩৯ সালটির দিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়ার জন্যে। এই অংশটি বজ্রনাদের মত ঘোড়ার খুড়ের একটি শব্দের মধ্য দিয়ে শুরু হত। শব্দটি আসত দর্শকদের পেছন থেকে। তারপর ছুটতে থাকত দুর্গের মধ্য দিয়ে। প্রথমে অতি ক্ষীণ ধ্বনি। তারপর জোরে, আরো জোরে, আরো জোরে। ওটা ছিল নাদির শাহের সৈন্যবাহিনী। পারশিয়া থেকে আসছিলেন তারা সমস্ত পথ অশ্বযাত্রা করে। ঘাজনি , কাবুল, কান্দাহার, পেশোয়ার, লাহোর, আর সিরিন্দের মধ্য দিয়ে টগবগিয়ে, শহরের পর শহরে লুন্ঠন চালিয়ে তারা ছুটে আসছিলেন দিল্লীর দিকে। সম্রাট মোহাম্মাদ শাহর জেনারেলগণ আসন্ন আকস্মিক মহাযুদ্ধের ব্যাপারে তাকে সাবধান করে দিলেন। নির্বিকারচিত্তে, সম্রাট, গান বাজনা চালু রাখার নির্দেশ দেন। শো এর এই পর্যায়ে এসে দিওয়ান-এ-খাস, বিশেষ দর্শকদের মহাকক্ষের, বাতিগুলি ভীষণবর্ণ ধারণ করে। বেগুনী, লাল, সবুজ। জেননায় বাতি জ্বলে উঠবে গোলাপী রঙের(সংগত ভাবেই) এবং প্রতিধ্বনিত হবে মহিলাদের হাসি, রেশমী কাপড়ের খসখস, আর নুপুরের ঝিনিক-ঝিনিক-ঝিনিক শব্দ। তারপর, হঠাৎ করেই, ঐ কোমল, সুখী, নারী-শব্দগুলির মধ্যে থেকে একটা স্পষ্ট শ্রুত, গভীর, অদ্বীতিয়, ঘ্যাস ঘ্যাসে, প্রণয়কৌতুকপূর্ণ খিলখিল হাসি শোনা যাবে দরবারের একজন খোঁজার।

ঐ যে! বলে উঠবেন উস্তাদ কুলসুম বাই একজন উল্লসিত মথবিশেষজ্ঞের মত যিনি একটা বিরল প্রজাতির মথকে জালবদ্ধ করলেন এইমাত্র। শুনলা ঐটা? ঐটা আমরা। ঐটা আমাদের পূর্বসুরি, আমাদের ইতিহাস, আমাদের গল্প। আমরা কখনই সাধারণ লোকজন ছিলাম না, দেখলা তো, আমরা রাজপ্রাসাদের কর্মচারীদের অংশ ছিলাম।

একটি হৃৎস্পন্দনে পার হয়ে গেল মূ্হুর্তটি। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে মূহুর্তটির অস্তিত্ব ছিল। তেমন কিছুই নয় শুধু সামান্য একটি চাপা হাসি হিসেবে হলেও, ইতিহাসে উপস্থিত থাকার চেয়ে এক ব্রক্ষান্ড পরিমাণ দূরত্বে রয়েছে তাতে অনুপস্থিত থাকা, তাতে সামগ্রিক ভাবে অলিখিত থাকার মাঝে। একটা চাপা হাসি, সব কিছুর পরও, ভবিষ্যতের ঋজু খাড়া দেয়ালে পা রাখার একটা জায়গা হতে পারে।

তার এত চেষ্টা সত্ত্বেও এই চাপা হাসিটি শোনা থেকে কেউ বন্চিত হলে তার উপর খুব রেগে যেতেন উস্তাদ কুলসুম বাই। এতই রেগে যেতেন, যে, জনসম্মুখে একটা দর্শনীয় দৃশ্যের অবতারণা রোধ করার জন্য, নবাগতদের বয়োজেষ্ঠরা নির্দেশ দিতেন যে না শুনলেও শোনার ভান করতে।

একবার গুড়িয়া তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল যে হিজড়াদের জন্য ভালবাসা আর সম্মানের একটা বিশেষ জায়গা আছে হিন্দু পুরাকাহিনীতে। সে কুলসুম বাইকে গল্প বলেছিল যে, কিভাবে যখন প্রভু রাম আর তার স্ত্রী, সীতা, আর তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা লক্ষণকে চৌদ্দ বছরের জন্য তাদের রাজ্য থেকে নির্বাসিত করা হল, নাগরিকগণ, যারা ভালবাসতেন তাদের রাজাকে, তাদেরকে অনুসরণ করলেন, এই প্রতিজ্ঞায় যে যেখানেই যাবেন তাদের রাজা তারাও সেখানেই যাবেন। যখন তারা পৌছালেন অযোধ্যার শেষভাগে যেখান থেকে অরণ্যটির সূচনা ঘটেছে, রাম ফিরে তাকালেন তার লোকেদের দিকে এবং বললেন, আমি চাই আপনারা সব পুরুষ আর মহিলারা ঘরে ফিরে যান এবং আমার জন্য অপেক্ষা করুন যতদিন না ফিরে আসি। নিজেদের রাজাকে অমান্য করতে অক্ষম, পুরষ এবং মহিলাগণ ঘরে ফিরে গেলেন। শুধুমাত্র হিজড়াগণ, অরণ্যের কিনারে পুরো চৌদ্দটি বছর তার জন্য বিশ্বস্তভাবে অপেক্ষা করে রইলেন, কারণ প্রভু রাম তাদের উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছিলেন।
তাহলে আমাদের মনে রাখা হয়েছে ভুলে যাওয়ারা হিসেবে? উস্তাদ কুলসুম বাই বললেন। বাহ! বাহ!
নিজস্ব কিছু কারণে আনজুম লাল দুর্গে তার প্রথম ভ্রমণটি খুব ভালভাবে মনে রেখেছিলেন।ডাক্তার মুখতারের সার্জারী থেকে সেরে ওঠার পর এটা তার প্রথম বাইরে বেড়াতে যাওয়া ছিল। টিকিটের জন্যে লাইন ধরার সময় অধিকাংশ মানুষ বিদেশী পর্যটকদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকত, যাদের একটা পৃথক লাইন আর বেশী দামী টিকিট ছিল। বিদেশী পর্যটকগণ অন্যদিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতেন হিজড়াদের দিকে- বিশেষ করে আনজুমের দিকে। একজন কমবয়সী লোক, তীক্ষ চাউনী আর যীশুখ্রিস্টের মত গুড়ি গুড়ি দাড়িওয়ালা এক জিপসী, তার দিকে মুগ্ধতা নিয়ে তাকালেন। আনজুমও তাকালেন তার দিকে। তার কল্পনায় জিপসী লোকটি হয়ে গেলেন হযরত শারমাদ শহীদ। তিনি তাকে কল্পনা করলেন গর্বিত আর নগ্ন হয়ে দাড়িয়ে আছেন, একটা রোগা, সামান্য অবয়ব নিয়ে, তার সামনে পরশ্রীকাতর দাড়িওয়ালা কাজীদের জুরি। সামান্যতমও বিচলিত হলেন না তিনি যখন তারা তার মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিলেন। আনজুম সামান্য চমকে গেলেন যখন পর্যটক লোকটি হেঁটে তার কাছে আসল।
আপনি খুবই সুন্দর, তিনি বললেন। একটা ছবি? তোলা যাবে কি?
সেটা ছিল একদম প্রথমবার যে কেউ তার ছবি তুলতে চেয়েছিলেন। সামান্য শ্লাঘা অনুভব করে, তিনি তার লাল ফিতা করা বেণীটি কাধের উপর দিয়ে নিয়ে আসলেন লাজুকভাবে আর উস্তাদ কুলসুম বাইয়ের দিকে তাকালেন অনুমতির জন্যে। অনুমতি পাওয়া গেল। তাই তিনি ছবিটির জন্য পোজ দিলেন, বেলেপাথরের কেল্লাগুলোর গায়ে অদ্ভুতভাবে ঠেস দিয়ে, কাঁধগুলো পেছনের দিকে টেনে ধরে এবং থুতনীটা উঁচিয়ে, ঔদ্ধত্য আর ভীরুতা সবই একই সাথে।
স্যাঙকিউ. কমবয়সী লোকটা বলল।অনেক স্যাংকিউ আপনাকে।
তিনি কখনই বুঝতে পারেননি, কিন্তু এটা ছিল কিছু একটার শুরু, ঐ ছবিটা।
এখন কোথায় সেটা? ঈশ্বরই জানেন একমাত্র।

  ***
আনুজমের ঘুরে বেড়ানো মনটা ফেরত আসল উস্তাদ কুলসুম বাইয়ের কক্ষের সভায়।
সেটা ছিল আমাদের শাসকদের অবক্ষয় আর উশৃঙ্খলা যা মোঘল সাম্রাজ্যের ধ্বংস ডেকে আনল, উস্তাদ কুলসুম বাই বলছিলেন। শাহজাদারা প্রমোদ করে বেড়াচ্ছিলেন দাসী-বান্দীদের সাথে, সম্রাটগণ দৌড়া দৌড়ি করছিলেন নগ্ন হয়ে, যাপন করছিলেন প্রাচুর্যর জীবন যখন তাদের প্রজারা ছিল না খেয়ে - কিভাবে এমন একটা সাম্রাজ্য টিকে থাকার আশা করে? সেটাকে টিকে থাকতে হবে কেন?( তাকে মুঘল-এ-আজমের শাহজাদা সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করতে শুনেছে এমন যে কেউ ঘুনরাক্ষরেও ধারণা করতে পারবে না যে তিনি এত প্রবলভাবে শাহজাদার প্রতি বৈরী ছিলেন। সন্দেহও করতে পারবে না কেউ যে, খোয়াবগহের ঐতিহ্য আর রাজকীয়তার সাথে খোয়াবগহের নৈকট্য নিয়ে কুলসুম বাইয়ের অহংকার সত্ত্বেও , তিনি মুঘল শাসকদের লাম্পট্য আর তাদের প্রজাদের দারিদ্রের ব্যাপারে অন্তরে একটা সমাজতান্ত্রিক ক্ষোভকে লালন করতেন।) এরপর তিনি একটি আলোচনা দাড় করালেন নীতিবদ্ধ জীবন এবং লৌহ প্রমাণ শৃঙ্খলা নিয়ে, যেই দুটি জিনিষ তার মতে খোয়াবগহের প্রধান নিশানা- এর শক্তি এবং কারণ যে কেন কালের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে এটি টিকে থেকেছে, যে সময়ে অধিক শক্তিশালী, রাজকীয় জিনিষরা লুপ্ত হয়ে গেছে।

দুনিয়ার সাধারণ লোকেরা-  এই বিষয়ে তারা আর কিইবা জানে যে একজন হিজড়ার জীবনকে যাপন করতে হলে কি দরকার হয়? নিয়মগুলি, শৃঙ্খলগুলি আর ত্যাগ গুলি বিষয়ে তারা জানেটা কি? আজকের দিনে কেউ কি জানত যে এমন সময়ও গেছে, যখন তারা সকলে, যার মধ্যে তিনিও ছিলেন, উস্তাদ কুলসুম বাই নিজে, বাধ্য হয়েছিলেন ট্রাফিক সিগন্যালে গিয়ে ভিক্ষা করতে? যে একটু একটু করে, অপমানের পর অপমানে ,তারা নিজেদেরকে গড়ে তুলেছিলেন সেখান থেকে? খোয়াবগহটিকে খোয়াবগহ বলা হত, তিনি বললেন, কারণ এটা ছিল সেই জায়গা যেখানে বিশেষ লোকেরা, বরপ্রাপ্ত লোকেরা, তাদের স্বপ্ন গুলি নিয়ে আসতেন দুনিয়ায় যেগুলি বোঝা যেত না। খোয়াবগহে, ভুল শরীরে আটকা পড়া পবিত্র আত্নারা স্বাধীন হতেন। (এই প্রশ্নটি ওঠানো হত না যে এমন যদি হয় পবিত্র আত্নাটি একটি নারীর শরীরে আটকে পড়া পুরুষের তাহলে কি হবে)

যত যাই হোক, উস্তাদ কুলসুম বাই বললেন, যত যাই হোক- এবং যেই বিরতিটি আসল এরপর সেটা আধোআধো বোলের কবি-প্রধানমন্ত্রীটির যোগ্য ছিল- খোয়াবগহের কেন্দ্রীয় অধ্যাদেশটি হল মানযুরি । রাজি হওয়া। দুনিয়ার লোকেরা উল্টাপাল্টা গুজব ছড়াতো যে হিজড়ারা বলে ছোট ছোট ছেলেদের চুরি করে নিয়ে গিয়ে নুনু কেটে দেয়। তিনি জানেনও না এবং বলতেও পারেন না যে এই জিনিষগুলি আদৌ অন্য কোথাও হয় কিনা, কিন্তু খোয়াবগহে, সর্বশক্তিমান সাক্ষী, মানযুরি ব্যাতীত কিছুই ঘটত না।

তিনি এরপর সাম্প্রতিক সময়ের বিশেষ ঘটনাটিতে আসলেন। সর্বশক্তিমান আমাদের আনজুমকে আমাদেরকে কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন, তিনি বললেন। সে আমাদের বলবে না গুজরাটে তার আর জাকির মিয়ার সাথে কি ঘটেছিল এবং আমরা তাকে জোর করতেও পারি না। যা আমরা করতে পারি তা হল অনুমান করতে পারি। আর সমব্যাথিত হতে পারি। কিন্তু সমবেদনার কারণে আমরা আমাদের নীতিগুলোর সাথে কোন আপোষ হতে দিতে পারি না। জোর করে একটা ছোট মেয়েকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছেলে হিসেবে জীবনযাপন করানো, যদি সেটা হয় তার নিজের নিরাপত্তার জন্যেও, তাহলেও সেটা হল তাকে কারারুদ্ধ করা, তাকে মুক্তি দেয়া নয়। আমাদের খোয়াবগহে সেটা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। একদমই না।
সে আমার সন্তান, আনজুম বললেন। আমি সিদ্ধান্ত নিব। আমি এই জায়গা ছেড়ে তাকে নিয়ে চলে যেতে পারি যদি আমি চাই।
 এই ঘোষণাতে উত্তেজিত হওয়া দূরে থাক, সবাই আসলে এক প্রকার শান্তিই পেলেন এই লক্ষণটি দেখে যে আনজুমের ভেতরের পুরাতন সেই নাট্যপ্রিয় রাণীটি সুস্থ এবং চমৎকার রয়েছেন। তাদের দুশ্চিন্তা করার কিছুই নেই কারণ আনজুমের একেবারেই যাওয়ার মত কোন জায়গা ছিল না।
তোমার যা খুশি তাই করতে পার, কিন্তু বাচ্চাটি এখানে থেকে যাবে, উস্তাদ কুলসুম বাই বললেন।
এতক্ষণ ধরে আপনে মানযুরির কথা বললেন এখন নিজেই ওর হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে চান? আনজুম বললেন। আমরা ওকেই জিজ্ঞেস করব। জয়নাব আমার সাথেই আসতে চাবে।
তর্কের সুরে এরকম ভাবে উস্তাদ কুলসুম বাইয়ের সাথে কথা বলাটাকে মনে করা হত অগ্রহণযোগ্য। এমনকি তার জন্যেও যে একটা গণহত্যা থেকে বেঁচে ফিরেছে। সবাই অপেক্ষা করতে লাগল প্রতিক্রিয়াটির জন্য।
উস্তাদ কুলসুম বাই চোখ বন্ধ করলেন আর গোটানো রাজাইটা তার পিঠের নীচ থেকে সরিয়ে দিতে বললেন। হঠাৎ ক্লান্তিতে, তিনি দেয়ালের দিকে ফিরে শরীর কুকড়ে শুয়ে পড়লেন, নিজের হাতের বাঁকটিকে বানালেন বালিশ। চোখগুলো বন্ধ অবস্থাতেই এবং বহুদুর থেকে শব্দ আসছে এমন কন্ঠে , তিনি আনজুমকে নির্দেশ দিলেন ড. ভাগাতের সাথে দেখা করতে আর ওনার দেয়া ওষুধগুলো ঠিক মত খেতে।

মিটিংটি শেষ হল। সদস্যরা ছড়িয়ে পড়ল। একটা বিরক্ত বিড়ালের মত হিসহিস রত পেট্রোম্যাক্সের লন্ঠনটি রুম থেকে নিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হল।

  ***
যা বলেছিলেন আনজুম তা ঠিক বুঝে বলেননি, কিন্তু বলে ফেলার পর, চলে যাওয়ার ধারণাটি তাকে পেয়ে বসল এবং চারপাশ থেকে একটা অজগড়ের মত পেঁচিয়ে ধরল।
তিনি ডঃ ভাগাতের কাছে যেতে রাজি হলেন না, তাই সায়ীদার নেতৃত্বে একটি ক্ষুদ্র প্রতিনিধি দল তার পক্ষ থেকে গেল। ডঃ ভাগাত একজন ছোটখাট লোক ছিলেন। তার গোঁফটি মিলিটারীদের মত করে ছাঁটা। এবং ভদ্রলোকের কাছে গেলেই পনডস ড্রিলমফ্লাওয়ার ট্যালকাম পাউডারের সৌরভে আচ্ছন্ন হতে হয়। ডাক্তার সাহেবের আচরণটি ছিল কেমন জানি দ্রুত, পাখিসুলভ এবং তার একটা অভ্যাস ছিল কয়েক মিনিট পর পর নিজের রোগীদের আর সেই সাথে নিজের কথার মাঝখানে ব্যাঘাত ঘটানোর, সেজন্য তিনি প্রথমে নাক দিয়ে সশব্দে একটি শুকনো, অস্বস্তিজনিত নিঃশ্বাস নিতেন এবং সেই সাথে কলম দিয়ে টেবিলের উপরে পর পর একই রকম তিনটি টকটক শব্দ করতেন। তার কব্জিগুলো ঘন কাল লোমে ঢাকা ছিল তবে তার মাথাটি ছিল কমবেশী চুলশূন্য। তিনি তার বাম কব্জি থেকে একটা প্রশস্ত পরিমাণ লোম কামিয়ে ফেলেছিলেন, যার উপরে তিনি একজন টেনিস প্লেয়ারদের ঘাম মোছার সোয়েটব্যান্ড পড়তেন, যেটার উপরে তিনি পড়তেন একটা ভারী সোনালী ঘড়ি যাতে করে তিনি পরিষ্কার, স্পষ্ট ভাবে সময়কে দেখতে পান। ঐদিন সকালে তিনি সেভাবেই পোশাক পড়েছিলেন যেভাবে তিনি পড়ে থাকেন প্রতিদিন একটা দাগহীন সাদা টেরী কটনের সাফারি স্যুট আর চিকচিকে সাদা স্যান্ডেল। তার চেয়ারের ওপর পিছনে একটা পরিষ্কার সাদা তোয়ালে ঝুলত। তার ক্লিনিকটি অতি জঘন্য নোংরা একটি এলাকায় ছিল কিন্তু তিনি একজন অত্যান্ত পরিষ্কার লোক ছিলেন। এবং ভাল একজনও বটে।

প্রতিনিধি দলটি একসাথে ঢুকে পড়ল এবং যা চেয়ার পাওয়া গেল তাতেই বসে পড়ল, কয়েকজন অবস্থান নিল অন্যদের চেয়ারের হাতলে। ডঃ ভাগাত খোয়াবগহ থেকে আসা রোগীদের একসাথে দু জন তিন জন করে দেখে অভ্যাস্ত ছিলেন(তারা কোনদিন একা আসত না)। সেই সকালে তার সমানে সমাগত বিশাল জনতাকে দেখে তিনি চমকে গেলেন।
তোমাদের মধ্যে রোগী কে?
আমরা কেউই না, ডাক্তার সাহেব।
সায়ীদা, মুখপাত্র যিনি, মাঝে মাঝে অন্যদের ব্যাখ্যা আর বিশ্লেষণ সহকারে, বর্ণণা করল আনজুমের পরিবর্তিত আচার-ব্যাবহার যতটা নিখুঁত ভাবে করা সম্ভব- আনজুমের মনমরা ভাবটি, রূঢ়তাটি, বই পড়াটি, এবং , সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে অনধীনস্থতা। সে ডাক্তারকে জানাল জয়নাবের অসুস্থতা এবং আনজুমের দুঃশ্চিন্তার ব্যাপারে।(অবশ্য তার কোন উপায় ছিল না আনজুমের সিফলি জাদুর তত্ত্বটি সমন্ধে এবং এতে তার নিজের ভূমিকা বিষয়ে জানার।) প্রতিনিধি দলটি, নিজেদের ভিতর বিস্তারিত আলোচনা সাপেক্ষে, সিদ্ধান্তে এসেছিল গুজরাটের বিষয়টি বাদ দিয়ে যাওয়ার, কারণ :
 ক. তার জানত না কি ঘটেছিল, বা আদৌ কোনকিছু ঘটেছিল কিনা, সেখানে আনজুমের সাথে।
এবং,
 খ, কারণ ডক্টর ভগতের একটা বড় মত রুপার তৈরী(বা হয়তোবা ওটা খালি রুপার প্রলেপ দেয়া)গণেশ দেবতার মূর্তি ছিল নিজের টেবিলের উপরে এবং সারাক্ষণই সেখানে তার ট্রাঙ্কের উপরে কোকড়ানো একটি তাজা ধুপ কাঠি থেকে ধোয়া উড়ত।

~ বরাহশোদনে - বিস্ট্যালিটি ~

হে ছোট শূকর জেনো তোমায় খেতে মানা, মারতে মানা নেই সেই মহাজাগতিক মের্সেনারি তাই একশো বছর পথ হেটে এসেছে একেলা ডেসপারেট দুপুর রাত্রে পালিয়ে সে ভ...