শনিবার, ৫ মার্চ, ২০১৬

ব্রেকিঙ ব্যাড


আমি ছাদ থেকে দেকতেসিলাম নীচে আর নীচে অনেক ফুল ছিল। অতটা সকাল হয় নাই। যেন ভোর এখনও। ফুলে থেকে গন্ধ আসে বুঝার জন্যে আমি শুকব ভাবসিলাম। কিন্তু শুকলে আমার এলার্জি হয়। তাই চায়ের দোকানে গিয়ে সিগারেট ধরালে দেখি রিক্সায় করে আংকেল যাচ্ছে একটা। উনি দেখলেন কিন্তু দেখলেন না যেন এমন একটা ভাব নিয়ে থাকলেন।

আমি মনে করলাম আজকে কুয়াশা। তাইলে হাটব প্রচুর। ভার্শিটির দিকে যামু নাকি। কিন্তু ভার্সিটিতে ফুল ফোটে না। নিউমার্কেট থেকে একটা মুরগী এনে দুপুরে রাঁধব ভাবলাম। তিনমাস আগে চিংড়ি রানসিলাম। চায়ের দোকানে সিগারেটটা শেষ হয়। 

ইশতিয়াকের ফোন আসে যে আমি কই। আমি যামু না ভাবি। কিন্তু পরে যাই। ইশতিয়াক নিউমার্কেটে যাবে না। ওদিকে কে মারতে পারে বলে ওকে। আমি বললাম তাইলে ভার্সিটি যাই। ভার্সিটিতে রিক্সাওয়ালা যাওয়ার জন্য চায় না। ব্রেকিং ব্যাডের ঐ সিনটা ভাল ছিল। ঐ যে মাইকরে গুলি করল ওয়াল্টার। তারপরে কেমন যে অবাক হল।

সিগারেট খামু কি আরেকটা। সেদিন ফকরুলের বড় ভাই মারা গেল মাত্র চল্লিশে। ফুসফুসে কি গ্যানজাম। সিগারেট উনি খাইত। ওনার বউটা একা হয়ে গেছে। বউটার বয়স বলে পঁচিশ। তাই ইশতিয়াক একটা খারাপ কথা বলসে।

ইশতিয়াকের কাছে আমি একশ টাকা পাই। জিগাইলে রাগবে। ইশতিয়াকের বাপ গরীব। ফেমিলি চালায় ইশতিয়াক নিজেই। টিউশানী। ধান্দাবাজিও করে। কিছুদিন ছিনতাই করছে। আমি গেসিলাম দেখতে একদিন কেমনে করে ছিনতাই। আমি কলেজে পড়তাম। লম্বা আরো দুইটা ছেলে ছিল। একজন দেখতে উলভেরিনের লোকটার মত। কি নাম জানি। ওরকম লম্বা। কিন্তু ব্রেকিং ব্যাড দেখে আর ভাল্লাগে নাই অন্য মুভি দেখতে। আমার মনে হয় ঐ সিনটার কথা। ঐ যে মাইককে গুলি করল ওয়াল্টার। তারপর কেমনে তাকাল।

আমরা রিক্সায় বসে হাসছিলাম আর ইশতিয়াক বলতেসিল যে ফকরুল ভাইয়ের বউ বলে আরেক ছেলের সাথে ঘুরতে সেদিন বসুন্ধরা সিটি গেছে। ফুডকোর্টে বসে খাইতেসিল ইশতিয়াকে আর ওর গার্লফ্রেন্ড। পরে ওরা দেকসে। ওর গার্লফ্রেন্ড বলে চিনে ফকরুল ভাইয়ের ওয়াইফকে কি এক রিলেশনে। ডাক দিসিল বলে। কিন্তু মহিলা তাকায় নাই।

আরেকটা সিগারেট খামু। গলায় সিগারেট ঝোলানো লোকরা বেচেতেসে। দুটা কিনলাম। নইলে ইশতিয়াক খুব জ্বালাবে। আরাম করে খেতে দিবে না। উপরের তারে একটা কাক। একা একা বসে আছে। কেমন উদাস মনে হইল। ব্রেকিঙ ব্যাডে মাইকের মধ্যে একটা উদাস ভাব এরকম আছে।

আমি দেখসিলাম ফকরুল ভাইয়ের ওয়াইফকে। সেই-ই দেখতে। কুলখানিতে গেছিলাম। গরুর বিরানী করছিল। ইশতিয়াক চুরি করে তিন প্যাকেট নিছিল। শালা লো লাইফ একটা।

লাল শার্ট পড়া লোক রিক্সার সামনে দিয়ে গেল। বেঁটে। ছিনতাই করছিল ইশতিয়াকরা এরকম লোকরে। লোকটা কি কানছিল। আমার খারাপ লাগসিল। কিছু বলি নাই। লম্বা লম্বা উলভেরিনের মত ছেলেগুলা ছিল। ওদের খুব রাগ। লোকটার কি কি জানি নিছিল। শার্ট প্যান্ট খুলে রাইখা দিসিল। আর লম্বা ছেলেদের একটা হাসছিল হ্যাহ হ্যাহ হ্যাহ। হাত দিয়ে গা ঢেকে দাড়ায় ছিল লোকটা। পালায় নাই। আমরাই পরে চলে আসছি।

ব্রেকিং ব্যাডের ঐ সিনটার কথা আমার মনে হয়। ঐ যে জেসির বেজমেন্টে ওয়াল্টার ফার্স্ট খুনটা করল। পিছন থেকে টাইনা ধরে রাখসে। ঘটনার আগে ওয়াল্টার প্লেটের ভাঙা টুকরাগুলো দেখতেসিল। জোস ছিল সিনটা।

সাদা গাড়ি দেইখা মনে পড়ল আমাদের পুরান গাড়িটার কথা। মা বলসিন স্কুল থেকে আসার পর যে
-        বাবা একটা মজার জিনিষ দেখবা?
আমি ভাবসি চকলেট। পরে দেখি গাড়ি। আমি অত খুশি হই নাই। ভাব করসিলাম যে হইসি। গাড়ির ভিতর আমার গরম লাগে। কিন্তু মা যে কি খুশি হইসিল। মার কথা খুব মনে পড়ে। একমাস হইসে মা মারা গেসে। আমি প্রতিদিন স্বপ্নে দেখি। দেখি মা। আর আমি ছোট অনেক। আব্বকেও দেখি। দেখি যে সব চুল কাল। স্বপ্নে মনেই আসে না যে আম্মা মারা গেছে। স্বপ্ন ভাঙার পর বুঝা যায়। তখন অনেক কষ্ট হয়। আমার মনে হয় আমি অনেকটা জেসি ছিল যে ব্রেকিং ব্যাডে ওর মত। আবার মনে হয় আসলে ওয়াল্টারের মত আমি। আমার টেবিলের ড্রয়ারে কেরুর ভদকা ভরা আছে মাম পানির হাফ লিটার বোতলে। সেদিন কিনসি। আমারে প্রমিজ করায়ে গেসে মা মারা যাওয়ার দিন যে এসব আর খাব না। যে মারা গেছে তার প্রমিজ রাইখা কি হয়? আমি দু তিন ঢোক খাই ঘুম ভাঙলে। ইট বার্ণস। আরেকটু খাই। কেরু আরেকটু কিনে রাখতে হবে। টাকা পয়সার যে গোয়ামারা কি যে করুম। আগে আম্মা টাকা পয়সা দিত হাতে। এখন কেউ দেয় না। টাকার কথা কইলে আব্বা জিগায় যে কেন , কিজন্যে।

আর খুব রোদ বাইরে। কিন্তু সকালে ঠান্ডা ছিল বলে ভাবতেসিলাম সারাদিন হাঁটব। ইশতিয়াক মনে হয় না হাঁটবে। ও রিক্সা নিছে ধানমনডি নয়ের দিকে। সাবরিনার ফ্ল্যাটে যাইব। সাবরিনার লগে অয় রিলেশন করসে চারমাস। দুটা মিলে সারাদিন উইড খায়। বাবা খায়।

একটা বাড়ি তিনতলা। ছাদ থেকে বোগানভেলিয়ার ঝাড়। ব্রেকিং ব্যাডে ছিল না ওয়াল্টার একটা চুরুট খাইতেসে। সিগারেটটা ধরালে আমার কাশি হয়। গত সাতদিনে খুব কাশি। সিগারেটটা কমায়সিলাম। সেদিন চায়ের দোকানে সিগারেট খাইতেসিলাম তখন ইউনুস ভাইরে দেখলাম। কয় যে
-        তুমার বাবা আছে কেমন?
-        আছে ভাল। আপনের কি অবস্থা।
-        আছি ভালই তো। তো তুমি বেদ্দপের মত বিড়ি টানতেস সিনিয়র মিনিয়র দেখ না।
-        ফালতু কথা শোনার টাইম নাই বাই, যানগা।
ইউনুস ভাই দেখসে আমাকে অনেক্ষণ। উনার ছোট ছোট চোখ আর আমিও সিগারেট টানতে টানতে ওনারে দেখতেসিলাম। আমার মনে হইতেসিল আমি অনেকটা ওয়াল্টারের মত।  

ইশতিয়াক কইল যে,
-        মামা রাখ.... ঐ নাম।
আমি বললাম
-        এখানে আইলি ক্যান?
-        সাবরিনার বাসায় দুপুরে খাইস।
-        আগে কইলেও তো পারতি।
-        তোর মা মারা গেশে এরপর থেকে সাবরিনার লগে তো তোর দেখা হয় নাই। ও তোরে নিয়ে আসতে বলশে। গত উইকে ওর বার্থডে ছিল। খাওয়াইব।
সাবরিনার বাসায় গেলে ও ইশতিয়াকরে কিস করে। পাঁচ মিনিট ধরে। ছয় মিনিট ধরে। তারপর জিগায় যে আমরা উইড খামু কিনা। আমি উদাস হই। ইশতিয়াক কয় খাইব। সাবরিনা কয় ও গতকাল আনাইসে আখারুলরে দিয়ে। সাবরিনার রুমে বসে আমরা বঙে উইড ভরি। ও আগে থেকেই বাইছা বুইছা সব কাইটা রাখছিল । সাবরিনার বাপ বড়লোক। ওর রুমটা সুন্দর। বড় আর গোলাপী। বিশাল জানালা। জানালার কাছে ছাদ থেইকা নাইমা আসা বোগানভেলিয়ার ঝাড়ের মধ্যে দিয়ে রোদ এসে এসে গোলাপী ঘরটা আরো গোলাপী হয়ে যায়গা। আমি গাঁজা টানতে টানতে মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ পাই। ইশতিয়াক আর সবারিনা আলুমিনিয়ামের ফয়েলের নীচে আগুন দিছে। বাবা খাইতেছে। ওরা এখন হাসতেছে। কিস করতেছে। একটু পর আমারেও আইসা সাবরিনা খামচাখামচি শুরু করল। ইশতিয়াক বিরক্ত হইল। আমি কইলাম যে
-        আজকে যাইগা। পরে আরেকদিন খামুনে।

  বাইরে কুয়াশা কুয়াশা হইছে। কিন্তু এটা ফাগুন মাস। পহেলা ফাগুনের বাইর হইসিলাম আমি। এঁকা এঁকা হাঁটতে হাঁটতে  রাস্তায় দেখা হইছিল সাবরিনার লগে। আমারে দেইখা ডাক দিছিল। বাসায় যাওনের পর সবারিনা কাঁদল। বলল যে
-        তোমার মা মারা গেছে, বেইবি আমি এত্তো সরি...
সে আমাকে জড়ায়ে ধরল। আমরা সারাবিকাল জড়াজড়ি করে ছিলাম। আমার কাছে মনে হইসিল ফাগুন মাস রহস্যময়। আমি ভাবসিলাম এসব কথা আমি ইশতিয়াকরে জানায় দিই। কিন্তু তখন আমার মনে হচ্ছিল ঐ সিনটা যে ব্রেকিং ব্যাডে ওয়াল্টার গুলি করছে মাইকরে। তারপর অবাক হইছে খুব। 

মঙ্গলবার, ১ মার্চ, ২০১৬

ফাগুনের ছাদে কয়েকজন আত্নহত্যাবিমুখ লোক


এখন প্রফেসরকে দেখা যাচ্ছে। ছাদে।
 তিনি চেয়ারে বসছেন। চেয়ারটি প্লাস্টিকের এবং নীল। প্রফেসর না থাকলে চেয়ারটা দেখা যাইত না এই গল্পে। প্রফেসরকে চেয়ার অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা যায়। তিনি বললেন
-          ব্রক্ষান্ডের মাঝে একবিচারে হিউমেন লাইফের তেমন কোন গুরুত্ব নাই বুঝলা। যদি না আমরা নিজেরা এর উপর গুরুত্ব আরোপ করি। গুরুত্ব মাত্রই তাই আরোপিত।
তিনি তাকালেন ডানদিকে। সেদিকে একটা লেবুগাছ। লোহার বড় ড্রামে গাছটি বর্তমান রইছে। লেবুগাছের সামনে, ছাদে এখন আরেকজন লোককে দেখা গেল। লোকটি কোটপরা।

নতুন লোকটি বলল
-          তাহলে আপনে বলছেন যে সুসাইড করাটা খারাপ কিছু না?
-          একবিচারে না। তোমার ভাল্লাগতেছে না , আর সমাধান কিছু তো নাই।
নতুন লোকটির বয়স কম। তার চুলগুলো সব কাল আর কোটটির রং গাঢ় বাদামী। সে বলল যে,
-          খোরশেদ সাহেবও কি একই ভাবে চিন্তা করেন?

ছাদে, এখন খোরশেদ সাহেবকে দেখা যাচ্ছে। তিনি খুব লম্বা। গায়ে পান্জাবী। তিনি মনোযোগ দিয়ে ছাদের কার্নিশে বসা একটা কাক দেখছেন। ছাদে একটি কাক আছে। আরও কাক ছিল কিনা আমরা জানি না , কারণ খোরশেদ সাহেব তাদের প্রতি মনোযোগী হন নাই। তিনি প্রফেসরকে বললেন,
-          ব্রক্ষান্ডের গুরুত্ব আরোপিতই হইছে কারণ এতে হিউমেন লাইফ একসিস্ট করে। আপনার থিওরী বা লজিক যাই বলেন না কেন, ওতে ভুল আছে।
প্রফেসর দুরে বিল্ডিঙের সারি দেখতেসিলেন। ফাগুনের মধ্যবর্তী সময়েও কেন দূরে কুয়াশা কুয়াশা হয়ে আছে এই নিয়ে তার চিন্তা হচ্ছিল। এখন বিকাল। রোদে সোনালী ভাব প্রকাশিত হইছে। তাঁর মনে হল ফাগুনটা মন্দ নয় এবার। তাঁর কোন কিছুকেই ভাল মনে হয় না। সর্বোচ্চ মনে হয় মন্দ নয়। তিনি খোরশেদকে বললেন কথাটা। খোরশেদ বলল
-          মন্দ নয় আবার কি? আমার দেখা বেস্ট ফাগুন এইটা।

নতুন লোকটি বললেন
-          তাহলে কি খোরশেদ ভাই সুসাইড করবেন না?
-          আমি তো কখনই সুসাইডের কথা বলি নাই। সুসাইড ইজ ফর লুজারর্স।
-          সুসাইড করার জন্যে সাহস ও দর্শনের প্রয়োজন। আপনার সেটা নেই।
খোরশেদ সাহেব হাসলেন। বেশ জোরে। কাকটি উড়ে গেল।

প্রফেসর লেবুগাছের ব্যাপারে আগ্রহী হলেন। নতুন লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন যে লেবুগাছটি কার এবং ছাদে আরও লেবুগাছ আছে নাকী, আর বছরের কোন কোন সময় লেবু হয় আর ছাদের গাছটির লেবু সে কখনও খেয়ে দেখেছে কিনা। নতুন লোকটি বিরক্তি ঘটে। সে আত্নহত্যা বিষয়ে চিন্তা করে এমন লোক। তার চিন্তা জগতে লেবুগাছ সামন্জস্যপূর্ণ নয়। সে নিজেকে প্রকাশ করে এভাবে যে,
-          আমি লেবু খাই না।
কথাটি অসত্য। কাচ্চী বিরিয়ানী সে কখনও লেবু ছাড়া খায় না। প্রফেসর বললেন
  -  আত্নহত্যা নিয়ে তুমি যে একটু আগে বললা না দশর্ন আর সাহসের কথা এটা ঠিক বল নাই। মানুষের সব    দর্শনতত্ত্বগুলোর প্রবণতা হল তোমাকে জীবনের প্রতি আগ্রহী রাখা। নট ডেস্ট্রয়িং ইট। আর সাহস আর ইনসেনিটির ভিতর ডিফারেন্স আছে।
নতুন লোকটি দুরে তাকিয়ে বলল
-          স্টোয়িকদের দর্শনে সুসাইডের কথা আছে। জীবন একটা উৎসবের মত। যার ভাল্লাগব না, তার জন্যে দরজা খোলা আছে।
-          ব্যাড ইউজ অফ স্টোয়িসিজম। স্টোয়িকরা বলে যে, সব ধ্বংসাত্নক অনুভুতির জন্ম বিবেচনার ভুল থেকে। সুসাইড ধ্বংসাত্নক অনুভুতি। সুতরাং কোন জায়গায় তোমার বিচারের ভুল হচ্ছে।
খোরশেদ ছাদের কার্ণিশে পা ঝুলায় বসে বলল
-          আপনে আপনার প্রথম কথার কন্ট্রাডিকশনে গেলেন। অগুরুত্বপূর্ণ হিউমেন লাইফে দর্শন থাকনেরই তো কোন মানে হয় না।

বাকী দুজন নীরব। তারা আসলে এখন খোরশেদের প্রতি মনোযোগী। খোরশেদ যেকোন মূহুর্তে ছাদ থেকে পড়ে যাবে বলে তাদের মনে হয়। সুক্ষ উত্তেজনা বোধে তারা আক্রান্ত হন ফাগুনের বিকেলে। এই উত্তেজনা শুধু তাদেরই হয়। আশেপাশের বসন্ত আরোপিত ব্রক্ষান্ড অপরিবর্তিত থাকে।
  
  

~ বরাহশোদনে - বিস্ট্যালিটি ~

হে ছোট শূকর জেনো তোমায় খেতে মানা, মারতে মানা নেই সেই মহাজাগতিক মের্সেনারি তাই একশো বছর পথ হেটে এসেছে একেলা ডেসপারেট দুপুর রাত্রে পালিয়ে সে ভ...