হবস যে প্রকৃতির রাষ্ট্র বা ‘স্টেট অফ নেচারে’র কথা কন তাতে মানুষরে নিম্ন শ্রেনীর এবং দুর্বল জানোয়ার হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়। ‘স্টেট অফ নেচার’ সমাজ এবং রাষ্ট্র বিহীন একটা অবস্থা।
আমরা মানচিত্র আঁইকা যেমনে রাষ্ট্র বুঝি সেরকম এখানে নাই। প্রকৃতিরেই একটা রাষ্ট্র ধরে নেয়া যাইতে পারে, যেখানে আইন আর আইন মান্য করাইব আপনারে যেই শাসক দুই-এর কেউই নাই।
এই অবস্থায় আপনে যেমন লোকই হন না কেন, খুন এবং লুটপাটে অংশ নেয়া ছাড়া অন্য কোন পদ্ধতি থাকবে না আপনার, যদি বাঁইচা থাকতে চান। আপনে হয় মারবেন নাইলে মরবেন।
এখানে কোন সমাজ গঠন হবে না। মানুষরা মূলতঃ একাই জীবন যাপন করবে। হবসের স্মরণীয় ভাষ্যে সমাজ বিহীন এই জীবন হবে, “ একাকী, হতশ্রী, বিদঘুটে, নির্মম এবং সংক্ষিপ্ত”।
সংক্ষিপ্ত কারণ মারপিট কইরা বেশীদিন টিকতে পারবেন না। প্রতিদিনই যদি কেউ আপনারে মারার জন্য খুঁজে তাহলে দীর্ঘজীবনের সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
হবস ব্যাক্তি মানুষরে তেমন মহৎ বিবেচনা করেন নাই। তাই প্রকৃতির রাষ্ট্রের ধারণাতে ধইরাই নেয়া হইছে নিরন্তর মারামারি গ্যাঞ্জামেই লিপ্ত থাকবে মানব সমাজ।
কিছুদিন দাঙ্গা হাঙ্গামা করার পর সব মানুষরা কালেক্টিভলি এসব করার কুফল বুইঝা সবাই মিলে ভাল হইয়া গিয়া সুখে শান্তিতে বাস করতে লাগলেন - এমনটা ঘটবে না এখানে। কাটাকাটি করেই সব শেষ।
হবস কইছেন একারণে মানব সমাজের জন্য সমাধান একটাই। একজন অত্যান্ত শক্তিশালী শাসক যে জোর কইরা মানুষরে আইন মানাইব। ফলে যেরকম সমাজে আমরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারি তা সম্ভব হবে। সমাজ আর আইনরে টিকায় রাখার জন্য শাসকের প্রয়োজনে যে কাওরে কঠিন শাস্তি দিতে পারতে হবে।
হবস তার ‘লেভিয়াথান’ বইয়ে এইসব কথা বলসেন। লেভিয়াথান বাইবেলের একটা দৈত্য। সমুদ্রের ভেতর থাকে। বইয়ের প্রচ্ছদে আঁকা যে পাহাড়ের ধারে তরবারী আর রাজদন্ড হাতে একটা বিশাল লম্বা মানুষ খাড়ায় আছেন। সেই মানুষটার শরীর আরও অসংখ্য ছোট ছোট মানুষ দিয়া তৈরী। আর শরীরের মাথাটা হইলেন স্বাধীন সার্বভৌম শাসক।
হবস তার ‘লেভিয়াথান’ বইয়ে এইসব কথা বলসেন। লেভিয়াথান বাইবেলের একটা দৈত্য। সমুদ্রের ভেতর থাকে। বইয়ের প্রচ্ছদে আঁকা যে পাহাড়ের ধারে তরবারী আর রাজদন্ড হাতে একটা বিশাল লম্বা মানুষ খাড়ায় আছেন। সেই মানুষটার শরীর আরও অসংখ্য ছোট ছোট মানুষ দিয়া তৈরী। আর শরীরের মাথাটা হইলেন স্বাধীন সার্বভৌম শাসক।
হবস বইয়ের নাম বাইবেলের সমুদ্রদানবের নামে রাখছেন পাবলিকরে বার্তা দেওয়ার লাইগা যে শাসকের অধীন একটা রাষ্ট্রের ক্ষমতা অসামান্য। মানুষরে বর্বর এবং দুর্বল ভাবলেও হবস তাদেরকে মোটেও অবজ্ঞা বা ঘৃণা করেন নাই বলে মনে হয়।
হবসের লেভিয়াথান বাইরাইসিল ১৬৫১ সালে, তারও একশ বছরেরও বেশী আগে ১৫৩২ সালে প্রকাশিত হয় নিকোলো ম্যাকিয়াভেলিয়ার বই ‘সম্রাট’ (দি প্রিন্স)।
বইয়ে ম্যাকিয়াভেলিয়া বলসেন যে একজন সম্রাট বা প্রিন্সের জন্য সজ্জন ভাল লোক হওয়াটা অগুরুত্বপূ্র্ণ। তার মূল কাজ হল ক্ষমতা ধরে রাখা। সেজন্য মিথ্যা কথা লাগলে বলবে। কাওকে মারা লাগলে মারবে। প্রতিজ্ঞা ভাঙা লাগলে ভাঙবে। কিছুই যায় আসে না যতক্ষণ ক্ষমতা জায়গামত আছে।
ম্যাকিয়ভেলিয়াকে মুগ্ধ করা শাসকদের একজন ছিলেন ‘সিযার্যে বোর্হিয়া’। এই লোক ধোঁকাবাজি, খুন খারাবির মারফতে ইটালির বিশাল এক অংশে নিজের রাজত্ব কায়েম করেন। ‘সম্রাট’ বইয়ে এই রাজার উদাহরণ টানা হয়েছে কয়েকবার।
ম্যাকিয়ভেলিয়াকে মুগ্ধ করা শাসকদের একজন ছিলেন ‘সিযার্যে বোর্হিয়া’। এই লোক ধোঁকাবাজি, খুন খারাবির মারফতে ইটালির বিশাল এক অংশে নিজের রাজত্ব কায়েম করেন। ‘সম্রাট’ বইয়ে এই রাজার উদাহরণ টানা হয়েছে কয়েকবার।
বোর্হিয়া যখন রোমাগনা অঞ্চলের দখল নিলেন তখনকার কথা। তার অত্যান্ত নিষ্ঠুর হিংস্র কামান্ডার রেমিরো ডি অর্ক রে দ্বায়িত্ব দেয়া হল রোমাগনার লোকদের ঠান্ডা করার জন্য। অল্প দিনেই ডি অর্ক মেরে কেটে ত্রাসের হাট বসায়ে দিল রোমাগনায়।
রোমাগনা ঠান্ডা হওয়ার পরে বোর্হিয়া ভাবলেন , না এবার ডি অর্ক রে সরানো লাগে, ওর লগে আমার সম্পর্কটা মানুষের সামনে ভাল দেখায় না। তিনি ডি অর্করে মাইরা কাইটা দুই টুকরা কইরা নতুন দখল নেয়া শহরের মূলচত্বরে ফালায় রাখলেন।
লোকজন সবাই দেখল। তারা ভাবল এই হারামজাদা ডি অর্করে খোদ রাজা ছাড়া আর কার ক্ষমতা আছে এমনে মারার। আবার এটাও তাদের মাথায় খেলল যে যেই লোক নিজের বিশ্বস্ত কমান্ডারের এই অবস্থা করতে পারে তার লগে ঝামেলায় যাওয়া কোন কালেই ঠিক হবে না। ফলে, বোর্হিয়া তার উভয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই সফল হলেন।
রোমাগনার লোকসকল তারে মান্য করল, পক্ষে থাকল আবার ভয়ও পাইল প্রচুর। ম্যাকিয়াভেলিয়া এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বোর্হিয়াকে ‘শৌর্যবান’ বীরপুরুষ হিসেবে দেখেছেন। তিনি মনে করেন এসব শাসক হিসেবে বোর্হিয়ার যোগ্যতাকেই নির্দেশ করে।
থামস হবস ছিলেন তার সময়কার ইংল্যান্ডের একজন গুরত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। তখন মানুষের গড় আয়ু ছিল ৩৫ বছর। রোগব্যাধি বাদেও যুদ্ধ এর জন্য দায়ী। সেই আমলে হবস বাঁচছিলেন ৯১ বছর। তার সুশৃঙ্খল জীবন যাপন এবং ব্যাস্ত দার্শনিক মস্তিষ্ক এর কারণ হতে পারে।
থামস হবস ছিলেন তার সময়কার ইংল্যান্ডের একজন গুরত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। তখন মানুষের গড় আয়ু ছিল ৩৫ বছর। রোগব্যাধি বাদেও যুদ্ধ এর জন্য দায়ী। সেই আমলে হবস বাঁচছিলেন ৯১ বছর। তার সুশৃঙ্খল জীবন যাপন এবং ব্যাস্ত দার্শনিক মস্তিষ্ক এর কারণ হতে পারে।
আর, নিকোলো ম্যাকিয়াভেলিয়ার যুগও যুদ্ধ , হাঙ্গামা, আর ক্যাওসের যুগ। তিনি প্রথমে চাকরী করতেন রাজসভাতে, পরে নতুন পরিবার আসার পর রাজনৈতিক ঘুটিবাজির অভিযোগে তার চাকরী যায় এবং জেল হয়। তার অনেক ভাই বেরাদারকে মাইরা ফালানো হলেও, বেশ কিছুদিন নির্যাতন সহ্য করে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান।
মুক্তির কারণ কঠিন অত্যাচারের মুখেও তিনি কোন স্বীকারোক্তি দেন নাই।
লেখায় যে শৌর্য্য বা ম্যানলিনেসের কথা তিনি বলেন এখানে হয়তো সেরকম কোন ব্যাপার আছে।
তবে মুক্তির পর তার শহর ফ্লোরেন্স থেকে তারে বাইর কইরা দেয় ক্ষমাতাসীন মেডিকি পরিবার। উনি গ্রামে গেলনগা। বই লেখছেন এর পরেই।
মানে, নৃশংসতার যুগে জন্মানো দুইজন লোক, যারা নিজের সময় এবং সমাজের শিক্ষিত, চিন্তাশীল ভদ্রলোক, এবং পৃথীবির ইতিহাসের রাজনৈতিক দর্শনের দুটা গুরুতর বইয়ের লেখক, তারা মূলতঃ চরম স্বৈরাচারের এ্যাডভোকেট।
মানে, নৃশংসতার যুগে জন্মানো দুইজন লোক, যারা নিজের সময় এবং সমাজের শিক্ষিত, চিন্তাশীল ভদ্রলোক, এবং পৃথীবির ইতিহাসের রাজনৈতিক দর্শনের দুটা গুরুতর বইয়ের লেখক, তারা মূলতঃ চরম স্বৈরাচারের এ্যাডভোকেট।
ম্যাকিয়াভেলিয়া একদম সরাসরি এরকম নেতাকে গ্লোরিফাই করছেন। তিনি ঠিক এরকম প্রিন্স-ই চান। আর হবসের কথা হচ্ছে এরকম শাসক ছাড়া বর্বর মানব সমাজের গতি নাই। তিনি বইয়ে স্বীকার করেন এরকম একজন শাসক তার রাষ্ট্র এবং মানুষের বিষয়ে ভীষণ স্বাধীন। এবং এই বিষয়টি রাষ্ট্রের ব্যাক্তি মানুষের জন্য বিপদজনক।
তিনি সেজন্য একটি হাইপোথেটিকাল “ সামাজিক চুক্তির” প্রস্তাব করেছেন। এই চুক্তির ফলে শাসকের স্বাধীনতা কিছুটা হ্রাস পাবে। কিন্তু একজন ম্যাকিয়াভেলিয়ান প্রিন্স যেকোন চুক্তি ভঙ্গ করতে পারেন। সুতরাং লাভ কতটুকু হইতে পারে এসব চুক্তি টুক্তি কইরা?
হবস, ম্যাকিয়াভেলিয়া এসব চার সাড়ে চারশ বছর আগের কথা। চার পাঁচ শতাব্দিতে জন্তু হিসেবে কিছুটা পাল্টানো গেলেও খুব উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আর কতটুকু হয়। তাই দেখা যায় আজকের দিনেও কোন জায়গায় আইন আর আইন মানাইব যারা তারা দুর্বল হয়ে পড়লেই সেখানটা হবসের প্রকৃতির রাষ্ট্রে পাল্টায়া যাইতে সময় লাগে না।
হবস, ম্যাকিয়াভেলিয়া এসব চার সাড়ে চারশ বছর আগের কথা। চার পাঁচ শতাব্দিতে জন্তু হিসেবে কিছুটা পাল্টানো গেলেও খুব উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আর কতটুকু হয়। তাই দেখা যায় আজকের দিনেও কোন জায়গায় আইন আর আইন মানাইব যারা তারা দুর্বল হয়ে পড়লেই সেখানটা হবসের প্রকৃতির রাষ্ট্রে পাল্টায়া যাইতে সময় লাগে না।
তারপরও ‘ম্যাকিয়াভেলিয়ান’ শব্দটা আধুনিক যুগে ব্যাবহার হয় ‘লম্পট বদমাশ লোক’ অর্থে।
মানুষ স্বৈরাচাররে ভাল চোখে দেখে নাই কোনদিন, কিন্তু যথেষ্ট সভ্য হইতে পারে নাই বিধায় স্বৈরাচারই তাগো ক্লোজ ফ্রেন্ড।
১২.০৯.১৯
মানুষ স্বৈরাচাররে ভাল চোখে দেখে নাই কোনদিন, কিন্তু যথেষ্ট সভ্য হইতে পারে নাই বিধায় স্বৈরাচারই তাগো ক্লোজ ফ্রেন্ড।
১২.০৯.১৯
