মঙ্গলবার, ২৯ জুন, ২০২১

ছোটগল্প : ওটি

 "সার্জারীতে ওটিরে প্রধান ধরলে, এটা পরিবেশনমূলক এবং চিত্রনির্ভর আর্টআর্টিস্ট এখানে সার্জনপরিবেশনমূলক আর্ট বইলাই, ওটির ফুলফর্ম অপারেশান থিয়েটার

মেডিসিন এমনে ভাবলে আখ্যানমূলক আর্টভাষা নির্ভরফিজিশিয়ান এখানে কবি।"

- (ওয়ার্ডবয় তরিকুল)  


যজ্ঞ আজ। তিনি সজাগ। ঘুম পাড়ানো দরকার। লোকটা কই। ঘুম পাড়ায় যে। আসতেছে না।

 আরেকটা আছে। অয় কাটে। দেখি আসছে। ঘাঁটাঘাঁটি করে। নার্সরে ডাক দেয়। কাকে জানি বলে আবার। কি সব। কি সব। এখন চাইতেছে। সিরিঞ্জ নিছে। সাদা সাদাটা ঢুকাইল। দুধের মত। কাইল্লা লোকটা হাসছে। কয়, স্যার। স্যার। তখন চিল্লায়। ক্যা ক্যা কইরা কয়। কিসব কথা। আমিই দেব। আমিই দেব। কোন বেপার। এই মিয়া। এনাসতেশিয়া কি লাগে। সব বারা প্রপোফল। কি যে কয় ওগুলা। ব্লেড ঘাটতেছে। হুদাই। ব্লেড মারায়। কারে কারে কি জিগাইল। দেশের বাড়ি কই। আবার কইল কারে। এমনি। আবার ব্লেড নিল। কি করতাছে। এখন আবার নার্সের হাত ধরছে। পরে বলতেছে লাগা। স্যালাইন চায়। এখন একটা মাইয়া। কারে কইল আবার। জিগাইল দেশের বাড়ি কই। বলছে ও আচ্ছা। না, না থ্যাঙ্কিউ। তোমার আব্বুকে আমি চিনি। বসতেছে। কি জানি চিল্লাইল। পার্ট লইল। মাইয়াটারে দেখাইতাছে। লোকটা লম্বা আছে। আবার ঘাঁটতেছে। ট্রেতে আওয়াজ। টুং টুং ঝিং ঝং টুং ঝিং। ফোন ধরতাছে। বলল, দুটা পিজা আনাও। একটা চিকেন ক্যাষু নাট। আর ড্রিংক্স আনবা সব এরামের। পরে কে কি কয়। অয় চিল্লায়। বন্ধ! অয় চুতমারানি বন্দ ক্যা? ডেরগোন যা। হাউয়ার নাতি। অয় খালি চিল্লায়। কাইল্লা লোকটা হাসতেছে। ক্যাডা সজিব বাই নি। তখন যে লোকটা ঘুমাইব ও উইঠা বসতে যায়। কাইল্লায় গিয়ে ধরে। আবার শুইয়া যায়। মাইয়া হাসতেছে। অয়ও। ফোন ফালায় দেয়। টেবিলের উপর পড়ল। শব্দ হয় এমনে। চকচকা একটা ফোন। চারকোনা। এই তোমার আব্বুরে কইও না। মাইয়ায় কি কয়। কিচ কিচ কইরা। পরে জিগায়। অয়। কয় যে কোন ব্যাচ। কয় মা। মাইয়া কি জানি কয়। ইংলিশে। শিকশ। আর ঐদিকে কাইল্লায়ও। মাথা নাড়ে। বুচ্ছে কি জানি। হ হ কইরা একটু চিল্লান দিয়া কয় ইন্টার্ন ইন্টার্ন। পরে জানি আইল। গেলগা। ফোন বাজতেছে। ধরছি। কাইল্লায় চিল্লায়। অই বাইরে যা। আদব শেখো নাই তোমরা কিছু। ফোন পইড়া যায়। টোকাইতে লইছি। একবার দেখছি। নীচা থেইকা। পরে আবার তাকাইছি। আবার দেখছি। সবাই তাকাইতেছে। আহা এমন করো কেন। ফোন টোকাইছি। দাড়াইছি। এ্যাই এদিকে আসো। তোমার দেশের বাড়ি কই?

 “ স্যার আমার নাম সালেহ মুহাম্মাদ, আজকে জয়েন করলাম স্যার। দেশের বাড়ি নেই স্যার। আমি ঢাকাতেই। স্যার আয় এ্যাম আ বিগ ফ্যান ওয় ইয়োর ওয়ার্ক স্যার, অনেক দিন ধরেই আপনার ওটিতে আসার একটা ইচ্ছা ছিল স্যার ট্রুলি আপনি একজন আর্টিস্ট-- ”

মাইয়াই কি কয়। কিচ কিচ আওয়াজ। ইংলিশ। কে জানি আসে। দরজা গুলা বড় বড়। জাহাজের মত। জানি এমনই হয় দরজা। মানে জাহাজের। কি জানি কইল্। কি সব কথা। ফালতু ফালতু। অয় কয়, কি জিজেষ করল এই মেয়েটা তোমাকে। আবার কাইল্লায়ও কয়। হ্যা হ্যা কইরা। কয় নেশা মেশা। মদ গাঁজা। একটা বাতাস আছে। দরজা খুইলা বন্ধ হয়। এমন। জানি সমুদ্রের বাতাস। কাইল্লা কয় মাঠের পার। অয় হাসে। মাইয়াও। কয় কোন ব্যাচ।

স্যার আমি আপনাদের এখানকার ছাত্র না। আগের কলেজে ছিলাম পরে ওখান থেকে বের করে দিল। আমি আপনাদের দুই নম্বর ব্যাচ করেসপন্ডিং।

টুং টাং আওয়াজ হয়। মাস্তুলের লগে কি জানি বান্ধা। ছোট ছোট কাঁচের। পাথরের। লাল , সবুজ আর বেগুনী। আবার সুতা দিয়া বান্ধা। টু জিরো নাইলন। তাহে বাতাস লাগে। খালাসি ছিলাম। সমুদ্র অন্যরকম ছিল। কম বয়সে। সমুদ্রও বয়স কম। অনেক নীল। তখন দেখতাম। লবণের ঘ্রাণ। সাথে কাঁচামরিচ আর লেবু। বাতাসের ভিতরে ঝাঁঝ। মদের মত গন্ধ। স্পিরিট ঢালতেছে কাইল্লায়। টুং টাং। মাইয়াই নাড়তেছে। কি জানি সব। ছোট ছোট শিশি। ভিতরে পানি। শিশিগুলার রঙ সাদা। আবার লাল। কোনটা গাঢ় বাদামী। মাইয়ার হাতে চুরি। টুং টাং করতেছে।


বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল, ২০২১

অ্যান ওড টু এমডি মারুফ

  মোহাম্মাদ মারুফ জিগাইসে, সামনের ঈদে মানুষ কি খাবে। মানুষে ঢেন্ডি খাইব, সোনা মিয়া লেওড়া। তুমি বোঝ না? হালার টোকাই। কুত্তারবাচ্চা। আঙ্গে মাঙ্গে দিয়া জরিমানার টাকা উঠাইল ইউনিফর্ম লকডাউনে, এগুলা কারা খাইবরে টোকাইয়ের বাচ্চা, ঢেন্ডিখোর।

 


মানুষ খাইব রেমডিসিভির। টোসালিজুমাব খাইব। মন্টিলুকাস্ট মক্সিব্যাক খাইব। খাওনের অভাব ব্যাডা মানুষের। চুতমারানির পোলা। কইলিই তো, তর মায়ে বলে কার লগে গেছেগা। তর বউও যাইবগা। তর ঢেন্ডি খাওয়া সোনা দেইখাই যাইবগা।

 

মাইনষে কত ইফতারি বিলায় দেখোস না। শায়েরী বিলায়। সেহারী বিলায়। এই জাতি কত মহান। কত প্রগাঢ়, সুগভীর। প্রগাঢ় বুঝোস? সুগভীর বুঝোস? আবার থ্যাঙ্কিউ চোদাস? শুয়ার কা বাচ্চা। তেরেকো মার ডালনা চাহিয়ে থা। তেরেকো ক্রসফায়ার কারনে চাহিয়ে থা রে চুতিয়াকে বাচ্চে।

 

কিয়া বোলেঙ্গে ? কিতনে আচ্ছে হ্যায় ইয়াহা হাম। তরা খালি বাগড়া দেস। তরাই তো এই সমাজটারে ধ্বংস করলি। মাইনষের কোটি কোটি টাকা তগোরে পুনর্বাসবন করার লাইগা ব্যায় হয়া গেলগা, কিন্তু তরা চুতমারানির পোলারা, ঢেন্ডি ছাড়লি না, আর এজন্যেই এখন যত সমস্যা হইতাছে আমাদের।

 

মাইষের খাওনের অভাব বেডা। দেখোস না কত ওভারব্রিজ হইছে? ফ্লাইওভার কয়। ওভারব্রিজগুলা খা। থানায় মেশিনগান দিছে। মেশিনগান খা। শ্রমিক মারছে। পাঁচটা মুখ কমছে। ধর্ম লয়া রাজনীতি করে শুয়োরগুলা মরব। আরও কয়েক শ’ মুখ কমতেছে। তারপরও তরা খাওয়া পাইবি না। হালার অকৃতজ্ঞ। টোকাই ছ্যাচড়ার বাচ্চা।

 

ইয়ে কিয়া বোলেরে বাইয়া। খাওনের কিয়া আভাব পারা হ্য়ায়? ইতনে ফুটেজ খা-তে হে সাআরে বোঙ্গালি লোগ। তুম ভি খাও কুচ ফুটেজ। চুতিয়ে সাঃলে লোক। তুমি গারিব লোক ভিনা, এ্যায়সে বাচপান স্যা-ই ঢেন্ডিখোর হোতে হো। তুমকো লে-কে কিয়া কারেঙ্গে হাম ? এ্যাজ আ কনসার্ন সিটিজেন,হাম পোঁছে ?

 

স্টারে গেসোস হালা গরিব কোনদিন। ফাইভার খাওয়া লোকদের লম্বা লম্বা পায়খানার টুকরার মত শিক কাবাব বেচতেছে। মানুষ কত টাকা দিয়া কিন্যা খায়। ভ্যাট লইয়া কাইজ্জা করে ফকিন্নি মাগীর পোলারা। অগো লগে বসতে পারোস না। খাওনের পর অগো বাসার ছাদের উঠবি। একলগে জামাত করবি। জামাতের পরে ঢেন্ডি খাবি। কিতনা মাজাক ইস জিন্দেগি মে। তর মত লোকরা এসব আনন্দ নষ্ট করস।

 

এই যে কত সাজানো সুন্দর কইরা সব হইতেছে, এইটার ভিত্রে তুই হালা টোকাই আইসা এমনে একটা গেনজাম করলি কেনরে কুকুর? জানোয়ার। ফাক করি তোরে। তর মায়েরে।

 

পুঁজিবাদের পুটকি দিয়া পিজা বাইর হয়া আইতেছে একটা। টাইট জামা পরা আহ্লাদী একটা মেয়ে আইসা কইতেছে ‘বিফ দিশেন টো’। দেখোস না কত সুন্দর এই পৃথিবী। মানুষে বারের ছাদে, বাড়ির ছাদে লুকায়া মদ খাইতেছে হাজার হাজার টাকার। আহা মানবজীবন এত আনন্দময়। তরা তগো, ঢেন্ডির পলিথিন আর চোখের কালশিরা দিয়া সবটারে ব্যার্থ কইরা দিস। ব্যার্থ বুঝোস? ব্যার্থ খা শুয়োর সকল।  

 

আজকা আমরা কতজনের স্যার ডাকি। কত পড়ালেখা করসি। কত লেখা লেখি। এইটা ওইটা ইংরেজিতে পড়ি। কিন্তু তারপরও তর কাছে এখন ছোট হইয়া থাকতে হইব? তর মাইর খাওয়া মুখ দেখায়া আমগোরে লজ্জা দিবাস চাছ শালা শুয়োরের বাচ্চা ফকিন্নির পোলা।

 

এতরকম বিলা কইরা অহন একটা টোকাইয়ের বাচ্চার কাছো ছোট হইলাম। ইশ।

 

 

 

 

 

শুক্রবার, ২ এপ্রিল, ২০২১

কোভিড-১৯ নিয়ে চমস্কি : নব্য-উদারপন্থার ভরাডুবির কাহিনীতে নতুন অধ্যায়

 কোভিড-১৯ নিয়ে চমস্কি : নব্য-উদারপন্থার ভরাডুবির কাহিনীতে নতুন অধ্যায়

Dated: Apr 25, 2020 (updated:  May 7, 2020)

লিখেছেন : ক্রিসটিনা ম্যাগডেলানো

বঙ্গানুবাদ : সালেহ মুহাম্মাদ

করোনার মহামারিকালের সবচেয়ে গুরুতর শিক্ষাটি নোয়াম চমস্কি আমাদের জানিয়েছেন। তাঁর মতে,  “ পুঁজিবাদের নব্য-উদারপন্থী সংস্করণের আরেকটি ভীষণ ব্যার্থতাকেই উপস্থাপন করল এই সংকট। এবং, ওয়াশিংটনে বসে যেই জনসম্পর্কহীন উন্মাদ সঙ-গুলি সরকার  চালাচ্ছেনতারা আরও খারাপ করে তুলছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি।

ম্যাসাচুসেট ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির অধ্যাপক থাকাকালীন ভাষাতত্ত্বে বিপ্লব সাধন করেন নোয়াম চমস্কি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মনীষী-বুদ্ধিজীবি, ২০১৭ সালের শেষভাগে এ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টিতে যোগদান করেন। ইউর্যাকটিভ EURACTIV ” এর বন্ধু ইফে’-এর সাথে তিনি আলাপ করছেন তার টাসকোনের বাড়ি থেকে।

আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম কোভিড-১৯ এর দুর্যোগ থেকে কি শেখা যেতে পারে। উত্তরে চমস্কি আমাদের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যাবস্থার ব্যার্থতাগুলির দিকে নির্দেশ করলেন।

একটা শিক্ষা তো বোঝাই যাচ্ছে। আপনাদের পুঁজিবাদের নব্য-উদারপন্থী সংস্করণটা আবারও চরমভাবে ব্যার্থ হল। মারাত্নক ব্যার্থ। এর থেকেও যদি আমরা না শিখি তো পরেরবার আরও বাজে , নিকৃষ্ট ধরণের পুনরাবৃত্তি দেখতে পাবেন।

ঘটনায় কোন লুকোছাপা নাই। ২০০৩ সালে আপনার সার্স মহামারি হল। আমাদের বিজ্ঞানীরা ভাল করেই জানতেন এরকম আরও বহু মরামারি আসছে সামনে। সম্ভবতঃ এই করোনা ভাইরাস ঘরানারই বিপর্যয় সেগুলি। তখন কিন্তু প্রস্তুত হওয়ার একটা সুযোগ ছিল আমাদের। যেভাবে ফ্লুর ব্যাপারে করা হয়। প্রতি বছরই ফ্লুর একটা করে নতুন টীকা বাজারে আসে। কারণ সব বছরের ফ্লু একরকম না। কিন্তু আপনার প্রস্তুতি থাকে বিধায় দ্রুত টীকা বানিয়ে ফেলতে পারেন।

কিন্তু এরা দ্যাখেন, সেটা করল না। কারও একজনকে তো বল পায়ে দৌড়াতে হবে।



সম্ভাবনা দুটো। এক হল আপনার ওষুধ কোম্পানীরা। এদের সম্পদ আছে। ওদের বানানো যে মণিমানক্যের পেছনে আমরা এত এত টাকা খরচ করছি, সেগুলি দিয়ে ওরা অনেক ধনী হয়েছে। তারা কাজটা করবে না। ওরা বসে বসে মার্কেট পর্যবেক্ষণ করবে। মার্কেট পর্যবেক্ষণ করলে দেখবেন একটি সমাগত মহাবিপর্যয়ের জন্য মানবজাতিকে রণসজ্জিত করে আপনার কোন ব্যাবসায়িক মুনাফা নেই।

আর তার ওপর নেমে আসছে নব্য উদারপন্থার হাতুড়ী। যে, আপনার সরকারগুলির কিচ্ছু করার অনুমতি নাই। মানে সরকাগুলিই আপনার সমস্যা, এরা কোন সমাধান না।

ওয়াশিংটন চালাচ্ছে যেই মাস্তানের দলটা, ওদের কারণে পুরা যুক্তরাষ্ট্র এক ভয়ংকর বিভীষিকায় রূপ নিয়েছে। দুনিয়ার অন্য সবাইকে দোষারোপের বিদ্যা তাদের রপ্ত। সমস্যা হচ্ছে নিজেদের দোষ কিভাবে দেখতে হয় সেটি এরা একদমই জানেন না। এই মহাবিপর্যয়ের দায়ভার এদের। আপনার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রবিন্দু। একমাত্র রাষ্ট্র যেটি এতই অক্ষম এবং ত্রুটিপূর্ণ যে আক্রান্ত আর মৃত্যের সংখ্যার সাধারণ তথ্যটা পর্যন্ত ওয়ার্লড হেলথ অর্গানাইজেশানকে দিতে পারছে না।

সমস্যা অভিমুখে ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রগমনকে বর্ণণা করতে গিয়ে চমস্কি বলছেন বাস্তব বিবর্জিত

তো ফেব্রুয়ারিতে দ্যাখেন, আপনার মহামারি মহাক্রোশে ধেয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের প্রত্যেকে বিপদ বুঝতে পারছে--। সেই ফ্রেব্রুয়ারীর ঠিক মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প তার পরবর্তী বছরের বাজেট নিয়ে হাজির। এই বাজেটের দিকে লক্ষ্য করা বেশ জরুরী। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সম্পর্কিত খাতে বরাদ্দ আরও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। একটা মহামারির মাঝখানে তারা স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ কমিয়ে দিলেন! টাকা বাড়ালেন কোথায়? ফসিল ফুয়েল ইন্ডাস্ট্রিতে। সামনের দিনে যাতে মানুষের সুশৃঙ্খল জীবনের আরও বারোটা বাজানো যায়। ও আচ্ছা, আর টাকা পাচ্ছে হল সামরিক বাহিনী। যারা ইতিমধ্যেই পাতেরটা খেয়ে কুলাতে পারছে না। বিশৃঙ্খল , নিয়ন্ত্রণহীন এই বাহিনীকে ট্রাম্প আরও টাকা দিচ্ছেন। সেই সাথে ওর জগদ্বিখ্যাত দেয়ালের জন্য আরও বরাদ্দ তো হয়েছেই।”‌

এর থেকে আপনি একটা ধারণা পাচ্ছেন। যে, যেই সমাজ-বিদ্বেষী উন্মাদ ভাঁড়ের দল সরকার চালাচ্ছে তাদের স্বভাব চরিত্র কেমন এবং সেই কারণে এই দেশকে কতটা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

এখন তারা দিশেহারা হয়ে দোষ দেয়ার লোক খুঁজে বেড়াচ্ছেন। একবার চায়নাকে ধরেন, তো আরেকবার ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশানকে। আর তারা যা করছে সেটা মূলতঃ সন্ত্রাসী কার্যকলাপ। তো, আপনি ওয়ার্লড হেলথ অর্গানাইজেশানকে টাকা দেয়া বন্ধ করে দিবেন। এর মানে কি? ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশান গোটা দুনিয়া নিয়ে কাজ করে। মাতৃস্বাস্থ্য, ডায়রিয়ার মৃত্যু এগুলি তাদের মূল বিষয়। আপনার কথাটা তাহলে এমন হচ্ছে যে, ‘ ঠিক আছে, চল আমরা দক্ষিণে অনেকগুলি মানুষকে মেরে ফেলি, কারণ তাতে করে আমার ইলেকশনের জন্য সুবিধা হতে পারে।

ট্রাম্প প্রথমদিকে করোনা ভাইরাসের বিপদটিকে ক্ষুদ্রকরণের চেষ্টা করছিলেন। তবে পরবর্তীতে তাকে দুর্যোগ মোকাবেলাকারী একজন নেতার ভূমিকা গ্রহণ করতে দেখা যায়। যদিও ঘটনার ব্যাপারে নিজের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় ভুল করার বিষয়টি তিনি আর স্বীকার করেন নি।

ট্রাম্পকে আপনার কৃতিত্ব না দিয়ে উপায় নেই। ধোঁকাবাজির বিদ্যায় তিনি গুরুস্থানীয়। এত বড় প্রতারক এই মর্ত্যে আর কেউ বর্তমান হননি আগে কোনদিন। পিটি বার্নামকে ওর সামনে আনাড়ির মত দেখায়। তার পক্ষে খুবই সম্ভব যে তিনি একহাতে ব্যানার উঁচিয়ে রাখবেন ভালোবাসি আপনাকে। আমি রক্ষক আপনার। আস্থা রাখুন আমার ওপর। আমার দিবারাত্রির সমস্ত শ্রম শুধুমাত্র আপনারই জন্যআর অন্য হাতটি দিয়ে আপনাকে ছুড়ি মেরে দিলেন। এ ধরণের ঘটনায় তিনি বেশ সক্ষম। ওকে যেসব লোক ভোট দেয়, তাদের সাথে তো এ-ই করে আসছেন। ঐ লোকগুলিও আবেগে অন্ধ এবং পাগল। ওদের ভালবাসা কাজ , তারা ট্রাম্পকে ভালোবেসে যায়। ভোট দেয়া, সমর্থন করা প্রয়োজন মনে করে, তাই করে যায়। ট্রাম্প কি করে না করে তাদের কোন যায় আসে না। আর এই প্রতারণার কাজে ট্রাম্পকে সাহায্য করার জন্য মিডিয়াতে একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে। একটি সমন্বিত শক্তি আবির্ভুত হয়েছে। এরা হচ্ছে ফক্স নিউজ, ‘রাশ লিম্বাওএবং ব্রিটবার্ট সেগমেন্ট’ - মিডিয়ার যেই একটা মাত্র অংশের দিকে রিপাবলিকানরা চেয়ে থাকেন।

ও যা বলবে এরা তার প্রতিধ্বনি তুলবেন। আজকে যদি ট্রাম্প বলেন, ‘ ‌এটা সামান্য সর্দি জ্বর, ও নিয়ে ব্যাস্ত হবেন নাওরাও বলবে, ‘ ঠিক ঠিক, এটা সর্দি-জ্বর, একদম মাতবেন না।পরদিন যদি আবার সে বলে এটা ভয়ঙ্কর এক মহামারি। আমিই প্রথম একে শনাক্ত করি,’ তখন এরা সমস্বরে চিৎকার করবে : ‘ উনি ইতিহাসের সবচেয়ে মহৎ ব্যাক্তি। ওনার এই আবিষ্কারের চেয়ে মহান কিছু কেউ আবিষ্কার করেননি কোনদিন।

দিনের পর দিন এমনটাই তো চলছে। ওদিকে ট্রাম্প নিজেও সকালবেলা ফক্স নিউজ দেখেন। তারপর সিদ্ধান্ত নেন আজকের দিনে কি বলবেন। এখানে মুগ্ধ হয়ে দেখার মত একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটছে : রুপার্ট মাডরোখ, রাশ লিম্বাও আর হোয়াইট হাউজের এই পাগলটা পুরো দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

আমরা জানতে চাই মানুষ এখন যেভাবে প্রকৃতির সাথে আচরণ করে, করোনা মহামারির কারণে তার কোন পরিবর্তন হবে কি না। চমস্কি বলেন এই প্রশ্নের উত্তর দিবেন তরুণরা।

এখানে ভবিষ্যদ্বাণী করার কোন উপায় নেই। নির্ভর করে বিশ্বের আপামর জনসাধারণ থেকে কিরকম প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাবে, তার ওপর। একটি অত্যান্ত কঠোর কর্তৃত্ববাদের সূচনা হতে পারে। রাষ্ট্রগুলি দমনমূলক হয়ে উঠবে। নব্য-উদারপন্থার ব্যাধিকে আরও ছড়িয়ে দেয়া হবে। আসলে ঠিক করে বললে ওরা এই মূহুর্তে ঐ উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করছে। একটা কথা মনে রাখবেন, পুঁজিবাদী শ্রেণীটি অবিশ্রান্ত নির্মম। এদের সংগ্রাম কখনও শেষ হয় না। এই এত কিছুর মাঝখানে, তারা জ্বালানি তেলের জন্য আরও বরাদ্দ চাচ্ছে। যে নিয়মগুলি কিছু মাত্র সুরক্ষা দেয়, পাঁয়তারা চলছে সেগুলিও ধ্বংস করার।

মাত্র গতকালের কথাই ধরুন। জানেনই তো, ট্রাম্পের শাসনে মার্কিন পরিবেশ রক্ষাকারী সংস্থা ইতিমধ্যেই কয়লা ব্যাবসায়ীদের অধীনস্থ একটি সংগঠনে পরিণত হয়েছে। তো এই সংস্থা এমন কিছু আইনকে বাতিল করল যেগুলি, কয়লা কারখানার আশেপাশের মাটিতে শীশা এবং অন্যান্য দূষিত বর্জ্য ফেলাকে নিষিদ্ধ করে রেখেছিল এতদিন। মানেটা তাহলে দাড়াচ্ছে, ‘ চলুন আমরা আরো বেশী করে আমেরিকান শিশুদের হত্যা করি এবং পরিবেশ ধ্বংস করি - কারণ এভাবে কয়লা কোম্পানীগুলির মুনাফা তৈরী করতে সুবিধা হয়।যার ফলে, বলা বাহুল্য পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছেই। এদের কাজই তো তাই। প্রতিদিন তারা আমাদের পৃথিবীকে আরেকটু বসবাসের অযোগ্য করে তোলেন। কোন থামাথামি নাই। তাদেরকে প্রতিরোধ করার মত কোন শক্তি যদি না আসে, এই পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে।

কোভিড-১৯ এর ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্যগুলি নিয়ে তুলনা করতে গিয়ে, চমস্কি ইউরোপ ইউনিয়ানের  সংহতিমূলক মানসিকতার অভাবকে দোষ হিসেবে চিহ্নিত করলেন।

যদি লক্ষ্য করেন, আন্তর্জাতিক ভাবে যা ঘটছে সেটি বেশ চমকে যাওয়ার মতই।

জার্মানি এই সংকট বেশ ভালভাবেই মোকাবেলা করছে। তাদের উদ্বৃত্ত হাসপাতাল রয়েছে, উদ্বৃত্ত পরিমাণে রোগ নির্ণয়ের ব্যাবস্থা রয়েছে। কারণ তারা এই জায়গাগুলিতে নব্য উদারপন্থার অনুসরণ করতে যাননি।

ইটালির অবস্থা বেশ খারাপ। তাদের মহামারি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এরা কি জার্মানির কাছ থেকে সাহায্য পাচ্ছে? যাইহোক, সাহায্য তারা পাচ্ছে বটে। যেটা আনন্দের কথা। আর সেটি পাচ্ছেন আটলান্টিকের ওপারের মহাশক্তিকিউবার কাছ থেকে। কিউবা ডাক্তার পাঠাচ্ছে। চায়না পাঠাচ্ছে সরঞ্জাম। তাতে কিছু সাহায্য হলেও তো পাচ্ছেন মানুষগুলি। ইউরোপীয়ান ইউনিয়ানের বড়লোকদের কেউ তো কোন সাহায্য করল না। এখানে ভাববার বিষয় আছে।

সত্য বলতে, একমাত্র দেশ যেটি এখন অবধি প্রকৃত আন্তর্জাতিক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে - সে হল কিউবা। এবং সেটি কিউবার জন্য নতুনও নয়। এই ব্যাপারটা নিয়ে তো আমাদের ভাবা উচিত। ষাট বছর ধরে কিউবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের শিকার। তাদের অর্থনীতির গলা টিপে ধরা হয়েছে। বিশদ পরিসরে সেখানে ছড়িয়ে পড়েছিল আতংকবাদ। তারপরও দেখুন, কি এক ঐশ্বরিক কৃপায়, কিউবা ঠিকই টিকে গেল। শুধু টিকেই রইল না, বাকী দুনিয়াকে দেখিয়ে দিল এবং দেখিয়ে চলেছে আন্তর্জাতিক হওয়া কাকে বলে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে তো আপনি এসব কথা বলতে পারবেন না। মার্কিন রাষ্ট্রে আপনি যেটা করবেন হচ্ছে যে কিউবাকে দোষ দিবেন, গালিগালাজ করবেন। বলবেন যে কিউবায় মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়। আর তা সত্যও বটে। গোলার্ধের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মানবাধিকার লঙ্ঘন কিউবাতেই হয়ে থাকে। সেটি ঘটে হচ্ছে দক্ষিণপূর্ব কিউবায়। জায়গাটার নাম গুয়ান্তেনামো। সেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা। কিউবার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে তারা এটি দখল করে নিয়েছিল। এখন আর ফেরত দিতে চাচ্ছে না। কিন্তু এসব কথা তো আবার বলা যাবে না।

লক্ষী ভদ্র বাধ্যগত নাগরিকের কাছ থেকে আমেরিকা ভিন্ন কিছু শুনতে চায়। আপনার জন্য শোভন হবে চায়নাকে দোষ দেয়া। হলুদ আতংকের কথা টেনে আনবেন। এ বড় গহীন, প্রাচীন বিষয়। চায়নিজরা ঐ আসল বলে। আমাদের খেয়ে ফেলবে। ইতিহাসে সেই উনিশ শতক পর্যন্ত এই চায়নিজ ভীতি টের পাওয়া যায়। যখন খুশি টেনে আনতে পারেন এর কথা।

প্রগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনাল (বা প্রগতিশীল আন্তর্জাতিকতার) আহ্বান করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই আহ্বানটা বার্ণি স্যান্ডার্স করেছেন। ইউরোপে করেছেন ইয়ানিস ভ্যারুফাকিয। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, আর সার্বজনীন দক্ষিণ থেকে বিভিন্ন প্রগতিশীল উপাদানগুলিকে তারা একত্রিত করতে চাচ্ছেন। এর একটি প্রধান উদ্দেশ্যে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আপনার হোয়াইট হাউজে যে রিআকশনারী ইন্টারন্যাশনাল (বা প্রতিক্রিয়াশীল আন্তর্জাতিকতায়) শাণ দেয়া হচ্ছে, ওকে রুখে দিতে চাচ্ছেন এরা।

চমস্কির অনুসারে, ট্রাম্প প্রশাসন সমস্ত তীব্র প্রতিক্রিয়াশীল বর্বরতম রাষ্ট্রগুলিকেএকত্রিত করতে চাচ্ছেন। এর মধ্যে গালফ অঞ্চলের তেল সম্রাটগণ, আল-সিসির ইজিপ্ট, মোদীর ইন্ডিয়া, ডানপন্থী-চালিত ইসরায়েল এবং ভিক্টোর অর্বানের হাঙ্গেরী ছাড়াও এরকম অন্যান্যরা আছেন।

বাস্তবঘনিষ্ঠ আশা একটাই। বার্নির তৈরী করা প্রগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনাল। এই ছাড়া অদূর ভবিষ্যতের আর কোনকিছু আমাকে সেভাবে আশান্বিত করে না। লোকজন বলাবলি করছেন স্যান্ডার্স ক্যাম্পেইন ব্যার্থ হয়েছে। কথাটা খুবই ভুল। স্যান্ডার্স ক্যাম্পেইন খুব ভালোভাবেই সফল হয়েছে। অবিশ্বাস্য এই সফলতা। নীতি নির্ধারণী আলোচনার ক্ষেত্রটিতে স্যান্ডার্স একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। কয়েক বছর আগেও নীতি নির্ধারণী আলোচনাগুলিতে যেসব বিষয় অনুচ্চার্য ছিল সেগুলিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যেমন ধরুন দি গ্রীন নিউ ডিল, বেঁচে থাকলে চাইলে তো এটি আপনার লাগবেই।

( সম্পদানায় জোরান র্যাডোসাভল্যেভিক )

সূত্র: www.euractiv.com

 ----------------------------------------------------------------------------------

 সাক্ষাৎকারের বাকী অংশ এবং এরকম আরও অনেকগুলো লেখা পাওয়া যাবে ২০২১, মার্চ এপ্রিলের বইমেলায় চারদিক  প্রকাশিত জনাব মেসবাহউদ্দীন আহমেদ সম্পাদিত " একুশ শতকের অতিমারি আগ্রাসন" বইটিতে। 



 

 

"সবকিছু যেভাবে আগাচ্ছে তাতে একটা আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। আর না হলে এখন যা দেখছেন সেটি কিছুই না। পূর্বাভাস মাত্র। আরও খারাপ কিছু আসছে।"

 

চমস্কি এবং পলিন : কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠার জন্য ভিন্নতর পৃথিবীর কল্পনা করতে হবে আমাদের।

লিখেছেন  সি জে পলিখ্রনিয়ু - ১৪ এপ্রিল ২০২০

এই মহামারি থেকে কি শিখতে পারি আমরা? অনাগত দিনগুলির মোকাবেলায় আমাদের সমাজ কিভাবে সংগঠিত হবে? প্রশ্নগুলির একটি বিহিত করার চেষ্টা করেছেন নোয়াম চমস্কি এবং রবার্ট পলিন।  

বিশ্বের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছে কোভিড-১৯। প্রায় কোনই প্রস্তুতি ছিল না আমাদের। ধারণা করা হচ্ছে এই মহামারির অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিণতি হবে ঐতিহাসিক। যদিও সাম্প্রতিক কালে, গ্রুপ অফ টুয়েন্টি(জি টুয়েন্টি) প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলির নেতারা অঙ্গীকার করেছেন অর্থনীতিকে সুস্থ করার জন্য  বিশ্ব-অর্থনীতির শরীরে তারা পাঁচ ট্রিলিয়ান মার্কিন ডলার অন্তঃক্ষেপ করবেন।



 

কিন্তু এই মহামারি থেকে আমাদের শিক্ষা কি? করোনা ভাইরাস সংকটটি কি আমাদের সমাজ গঠনের নতুন কোন পথ দেখাবে? এমন সমাজ যার সামাজিক এবং রাজনৈতিক নিয়মগুলি মানুষের জন্য। ব্যাবসায়ীদের মুনাফার জন্য নয়।

 

এই সাক্ষাৎকারে মনীষী বুদ্ধিজীবি চমস্কি এবং অর্থনীতিবিদ রবার্ট পলিন আমাদের প্রশ্নগুলির কিছু উত্তর দেয়ার চেষ্টা করছেন।

 

সি জে পলিখ্রনিয়ু : নোয়াম, আপনার কাছে জানতে চাই এই করোনা ভাইরাস জনিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংকটের অন্তর্নিহিত কি কি শিক্ষাকে আমরা গ্রহণ করতে পারি?

 

নোয়াম চমস্কি : বিজ্ঞানীরা তো বহুদিন ধরেই মহামারির কথা বলে আসছেন। বিশেষ করে ২০০৩ সালের সার্সের সময় থেকেই। কোভিড-১৯ ধরণের একটা করোনা ভাইরাস দিয়েই কিন্তু ঐ ঝামেলাটা হয়েছিল। পরে যে আরও মহামারি আসবে, আরও ভয়ংকর সব দুর্যোগ, সেটিও বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বানী করেছেন। পরেরগুলি যদি আমরা ঠেকাতে চাই, তো বর্তমানেরটা কিভাবে ঘটল সেটি বুঝতেই হয়। এবারে ভুল যা হয়েছে সেসব তো শুধরাতে হবে। এই দুর্যোগের বিভিন্ন পর্যায় থেকেই শিক্ষা নেয়ার আছে। বিপর্যয়ের একদম উৎস মূল বোঝা দরকার। তারপর প্রত্যেকটি দেশই কিছু কিছু বিশেষ সমস্যায় পড়েছে, সেগুলিও নিয়েও চিন্তা করা প্রয়োজন। আমি মনযোগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই রাখছি। যদিও তাতে কিছু ভুল হয়। কারণ করোনা মোকাবেলায় এই দেশের যোগ্যতা একদম তলানিতে।

 

প্রাথমিক বিষয়গুলি যথেষ্ট পরিষ্কার। বাজার খুব বাজে ভাবে ব্যার্থ হয়েছিল। এই সমস্যার গোড়া ওখানেই। তার ওপর নব্য-উদারপন্থী যামানার পুঁজিবাদ একে আরও প্রকট করে তুলল। কিছু বিষয় আছে যেগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া। যেমন তাদের স্বাস্থ্য ব্যাবস্থার অবস্থা জঘন্য। সমাজের ভেতরে মনুষ্যত্ব প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। সোশ্যাল-জাস্টিসের দিক থেকে ও--সি-ডির তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান একদম শেষ দিকে। আর ফেডেরাল সরকারের দখল নিয়েছে যে উন্মাদ বুলডোজার তার কথাই তো বলাই বাহুল্য।

 

সার্সের জন্য যে ভাইরাস দায়ী ছিল সেটিকে দ্রুত শনাক্ত করা গিয়েছিল। টীকা তৈরী হল। কিন্তু পরীক্ষাধীন পর্যায়ের ভেতর প্রবেশ করানো হল না। ড্রাগ কোম্পানীগুলি তেমন কোন আগ্রহ দেখালেন না। কারণ তারা তো শুধু বাজারের ভাব বুঝে কাজ করেন। যে বিপর্যয় এখনও আসেই নি, তাকে প্রতিহত করতে গিয়ে সম্পদের খরচ করে তো আর ব্যাবসায়িক মুনাফা হয় না। সার্বজনীন ব্যার্থতাটির চিত্রায়ন ছিল নাটকীয়। সংকটের সূচনালগ্নেই একটি গুরুতর বিপদ দেখা দিল :  পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটার নেই। কি সাংঘাতিক ব্যার্থতা। ডাক্তার আর নার্সদের কোন উপায় ছিল না। প্রবল যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কাকে বাঁচাবেন, আর কাকে মারবেন।  

 

ওবামা প্রশাসন এই সম্ভাব্য সমস্যাকে চিনতে পেরেছিলেন। তারা একটা ছোট কোম্পানীকে নির্দেশ দিলেন কম দামে উচ্চ মানসম্পন্ন ভেন্টিলেটার সরবরাহ করার জন্য। তো এই ছোট কোম্পানীকে কোভিডিয়েননামের একটি বড় কোম্পানী কিনে ফেলল। তারপর তারা এই প্রকল্প থেকে সরে গেল। কারণটা স্পষ্ট। কোভিডিয়েন নিজেরা অতি দামী ভেন্টিলেটার বিক্রী করে। ছোট কোম্পানীর পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতাটি তারা চাচ্ছেন না। তারা সরকারকে গিয়ে বললেন , তারা চুক্তি বাতিল করতে চান কারণ এখানে যথেষ্ট ব্যাবসায়িক লাভ নেই।

 

এদ্দূর পর্যন্ত সব সাধারণ পুঁজিবাদী যুক্তি। কিন্তু এই পর্যায়ে নব্য-উদারপন্থার ব্যাধি আরেকটি মরণ আঘাত হানল। সরকার তো চাইলে এখানে নিয়ন্ত্রণ নিতে পারত। কিন্তু সেটি হতে পারল না কারণ  ইতিমধ্যেই আপনাদের মাথা খেয়ে ফেলেছে রোন্যাল্ড রিগ্যানের দিয়ে যাওয়া সেই মতবাদ : সরকারই সমস্যা, সমাধান নয়। সুতরাং কিছুই করার নেই।

 

এখানে একটু থামা দরকার। রিগ্যানের ফর্মূলার অর্থটা একটু বুঝতে হচ্ছে। ব্যাবহারিক ক্ষেত্রে যেমন দেখতে পাচ্ছি, জনগণের কল্যাণের প্রশ্ন আসলে তখন সরকার কোন সমাধান নয়। অথচ ব্যাক্তিগত সম্পত্তি আর বড় ব্যাবসায়িক শক্তির জন্য সরকার খুব ভালোই সমাধান। রিগ্যানের অধীনেই এরকম নজিরের অভাব নেই। সেসব আর দ্বীতিয়বার যাচাই করে দেখার প্রয়োজনও হয় না। এই যে মন্ত্র সরকার খারাপএটি  অতি প্রশংসিত মুক্ত বাজারেরমতই - চাইলেই এদের আপনি দিকভ্রষ্ট করে পুঁজির অতিরিক্ত দাবীগুলিকে তুষ্ট করতে পারেন।  

 

নব্য-উদারপন্থী চিন্তাগুলিও বেসরকারী খাতে প্রবেশ করল। ব্যাবসায়িক মডেলটির দরকার কার্যকারিতা”, মানে সর্বোচ্চ মুনাফা। পরিণতি যা মন চায় হোক। বেসরকারী স্বাস্থ্য খাতে এর অর্থ হচ্ছে, কোন বাড়তি ধারণক্ষমতা নেই : সাধারণ পরিস্থিতে চলার জন্য যা লাগে অতটুকুই। সেই তখনও একান্ত অপরিহার্যের চেয়ে কিচ্ছু বেশী দেয়া হবে না। রোগীর জন্য খরচের অংকটি গুরুতর। কিন্তু ব্যালেন্স-শীটে সবকিছু চমৎকার দেখাবে ( ম্যানেজমেন্টের জন্য যথাযথ পুরস্কার সহকারে)। পরিস্থিতি একটু ওদিক হলেই খবর আছে।

 

এসব ব্যাবসার সাধারণ নীতি। অর্থনীতির ওপর এদের ব্যাপক প্রভাব। সবচেয়ে মারাত্নকটি হচ্ছে জলবায়ু বিপর্যয়। বর্তমান করোনা ভাইরাস দুর্যোগকেও ছাপিয়ে এটি প্রধান হয়ে উঠতে চায়। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাবসা করে যে প্রতিষ্ঠানগুলি তারা সর্বোচ্চ মুনাফা করতে চায়। মানব সমাজকে টিকে থাকতে সাহায্য করা তাদের ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্যের মধ্যে পড়ে না। এখানে একপ্রকার ঔদাসীন্য, অবহেলার ব্যাপার আছে। ব্যাবসা করার জন্য তারা সারাক্ষণ নতুন নতুন তেলক্ষেত্র খুঁজছে। নবায়নযোগ্য শক্তির পেছনে তারা তাদের অর্থ অপচয় করেন না। নবায়নযোগ্য শক্তির লাভজনক প্রকল্পগুলিকে তার নষ্ট করে দিয়েছেন। যাতে, ধ্বংসযজ্ঞের গতিকে ত্বরাণ্বিত করে তারা আরও টাকা বানাতে পারেন।

 

অসামান্য এক গুন্ডাবাহিনীর কবলে পড়েছে হোয়াইট হাউজ। সে এই আগুনে ঘি ঢালছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাবহারকে আরও ব্যাপক বিস্তৃত রূপ দিতে সে নিবেদিতপ্রাণ। হোয়াইট হাউজের সগর্ব নেতৃত্বে এরা সবাই মিলে ছুটে চলেছে এক অতলান্ত অন্ধকার খাদের পানে। যেই আইন কানুনগুলি তাদের এই উন্মত্ত ছুটে চলার গতিরোধ করে সেগুলিকেও বিলুপ্ত করে দেয়া হচ্ছে।

 

 ডেভোসে যে লোকগুলি জড়ো হন  - যাদেরকে মাস্টার্স অফ দি ইউনিভার্স’ - ব্রক্ষান্ডের হর্তাকর্তা  বলা হয় -এদের প্রতিক্রিয়াটি বেশ শিক্ষাপ্রদ। তারা ট্রাম্পের ইতারামোগুলি অপছন্দ করেন। এক প্রকার সুসভ্য মানবতাবাদের ছবি তারা সবার সামনে তুলে ধরতে চান। ট্রাম্পের স্থূল আচরণ সেটিকে বিনষ্ট করে। কিন্তু ওদেরই প্রধান বক্তা হয়ে ট্রাম্প যখন প্রলাপ বকতে থাকেন, তারা তখন হাততালি সহকারে তাকে উৎসাহ দেন। বোঝা যায় কার পকেট ভরতে হবে সেটি ট্রাম্পের ভালোই জানা আছে।

 

আমাদের সময়টা এমনই। সবকিছু যেভাবে আগাচ্ছে তাতে একটা আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। আর না হলে এখন যা দেখছেন সেটি কিছুই না। পূর্বাভাস মাত্র। আরও খারাপ কিছু আসছে।

 

মহামারিতে ফেরত আসি। মহামারি যে সমাগত সেরকম প্রমাণের অভাব ছিল না। এই বিপদের সম্মুখেও ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ আচরণটিই করলেন। তার গোটা শাসনামলেই, সরকারের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত খাত গুলিতে বাজেট কর্তন করা হয়েছে। এবং তাও একদম মোক্ষম সময়ে, “ চীনের উহানে করোনা ভাইরাস তার ধ্বংসযজ্ঞ যেই সময় থেকে শুরু করল বলে ধারণা করা হয়, তার ঠিক দুই মাস আগে ট্রাম্প প্রশাসন একটি দুশ মিলিয়ান ডলারের মহামারি বিষয়ক সচেতনামূলক প্রকল্পকে বাতিল করে দিলেন। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল চায়না আর অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ দেয়া। যেন এধরণের হুমকিগুলি তারা শনাক্ত করতে পারেন এবং ব্যাবস্থা নিতে পারেন” - আসলে ঐ তখন থেকেই ট্রাম্প তার ইয়েলো পেরিল (হলুদ -আতঙ্ক) -এর আগুনে বাতাস করছিলেন। এই চীনভীতি ব্যাবহার করে তিনি দুর্যোগ মোকাবেলায় তার শোচনীয় ব্যার্থতাকে আড়াল করতে চেয়েছেন।

মহামারিতে ফেরত আসি। মহামারি যে সমাগত সেরকম প্রমাণের অভাব ছিল না। এই বিপদের সম্মুখেও ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ আচরণটিই করলেন। তার গোটা শাসনামলেইসরকারের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত খাত গুলিতে বাজেট কর্তন করা হয়েছে। এবং তাও একদম মোক্ষম সময়ে, “ চীনের উহানে করোনা ভাইরাস তার ধ্বংসযজ্ঞ যেই সময় থেকে শুরু করল বলে ধারণা করা হয়তার ঠিক দুই মাস আগে ট্রাম্প প্রশাসন একটি দুশ মিলিয়ান ডলারের মহামারি বিষয়ক সচেতনামূলক প্রকল্পকে বাতিল করে দিলেন। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল চায়না আর অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ দেয়া। যেন এধরণের হুমকিগুলি তারা শনাক্ত করতে পারেন এবং ব্যাবস্থা নিতে পারেন” - আসলে ঐ তখন থেকেই ট্রাম্প তার ইয়েলো পেরিল (হলুদ -আতঙ্ক) -এর আগুনে বাতাস করছিলেন। এই চীনভীতি ব্যাবহার করে তিনি দুর্যোগ মোকাবেলায় তার শোচনীয় ব্যার্থতাকে আড়াল করতে চেয়েছেন।


মহামারি সমস্ত শক্তি নিয়ে আঘাত করল। আশ্চর্যের কথা বরাদ্দ কর্তনের প্রক্রিয়াটি থামল না। ফেব্রুয়ারী মাসের দশ তারিখ হোয়াইট হাউজ নতুন বাজেট দেয়। তাতে অবরুদ্ধ স্বাস্থ্য ব্যাবস্থায় ( ঠিক করে বলতে যেসব খাতেই জনগণের কিছু উপকার আছে) অর্থের যোগান আরও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ বাজেটে জীবাশ্ম-জ্বালানির একটি এনার্জি বুমকে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অপরিশোধিত তেল উৎপাদন বৃদ্ধিও এর অন্তর্ভুক্ত।

 

মানবজাতির অমঙ্গল সাধনের এই প্রণালীবদ্ধ কার্যক্রমকে বর্ণণা করবে - এমন শব্দমালা আছে হয়তোবা। দুঃখিত, আমি তাদের খুঁজে পেলাম না।

 

ট্রাম্পের চিন্তাধারা আমেরিকান জনসাধারণেরও যথেষ্ট ক্ষতি করছে। কংগ্রেস এবং চিকিৎসা পেশার সাথে জড়িতরা বারবার আর্জি জানিয়েছেন। ট্রাম্প কানেই তুললেন না। তিনি ডিফেন্স প্রোডাকশান এ্যাক্টব্যাবহার করলেন না। জরুরী চিকিৎসা সরঞ্জাম খুবই অপ্রতুল। ট্রাম্প এই আইন ব্যাবহার করে কোম্পানীগুলিকে আদেশ করতে পারতেন সরঞ্জাম বানিয়ে দেয়ার জন্য। তিনি উল্টো সবাইকে বোঝালেন, এটি হচ্ছে সর্বশেষ পদ্ধতি। একেবারেই আর কেন উপায় না থাকলে এমনটি করা যেতে পারে। আরেকটি যে বাজে কথাটা বললেন যে মহামারিকালে ডিফেন্স প্রডাকশান এ্যাক্ট ব্যাবহার করলে দেশ বলে ভেনেজুয়েলা হয়ে যাবে। অথচ সত্য কথা হচ্ছে, দি নিউ ইয়র্কার পত্রিকা তথ্যপ্রমাণ সহ দেখিয়েছে ট্রাম্পের বছর গুলিতে হাজার হাজার বার ব্যাবহার করা হয়েছেডিফেন্স প্রডাকশান এ্যাক্ট। আর তা করা হয়েছে সামরিক বাহিনীর জন্য। ফ্রী এন্টারপ্রাইজ সিস্টেম” (ব্যাবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উদার নীতির চর্চা) এর ওপর এই আঘাত দেশ কিভাবে সামলে নিল বলা মুশকিল।

 

প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহের ব্যাবস্থা তারা করতে চাইল না। কিন্তু তাতে কি আর সুখ হয়। যা মজুদ আছে তাও যেন নিঃশেষিত হয় সেটি নিশ্চিৎ করল হোয়াইট হাউজ। সরকারের বাণিজ্যের তথ্য নিয়ে কংগ্রেসওম্যান কেটি পোর্টারের একটি গবেষণা আছে। সেখানে দেখবেন মার্কিন ভেনটিলেটার রপ্তানির মূল্য জানুয়ারী থেকে ফেব্রুয়ারীতে ২২ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর ২০২০ এর ফেব্রুয়ারীতে, “ চায়নায় মার্কিন মাস্কের রপ্তানি মূল্য ২০১৯ সালের মাসিক গড়ের তুলনায় ১০৯৪ (শতাংশ) বেশী ছিল।

গবেষণায় আরও পাওয়া যাচ্ছে :

    অতি সাম্প্রতিককালে , যেমন মার্চের ২ তারিখে, ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন ব্যাবসায়ীদের চিকিৎসা সরঞ্জাম রপ্তানির জন্য উৎসাহিত করছিলেন। বিশেষ করে চায়নায়। অথচ এই সময়কালে মার্কিন সরকার কোভিড-১৯ এর বিপর্যয়টি সমন্ধে বেশ ভালভাবেই অবগত ছিলেন। আরও বেশী মাস্ক এবং রেসপিরটোরের যে প্রয়োজন পড়বে সেটি তাদের অজানা ছিল না।

 

দি আমেরিকান প্রস্পপেক্ট-এর লেখায়, ডেভিড ডায়েন মন্তব্য করছেন : “ তো উৎপাদনকারী এবং দালালগণ বছরের প্রথম দুই মাস চিকিৎসা সরঞ্জাম দেশের বাইরে পাঠিয়ে টাকা বানালেন। এখন পরের দুই মাস তারা আবার সেসব আমেরিকাতেই ফেরত আনছেন; এবং সেখান থেকে আরও টাকা কামাচ্ছেন। এখানে ব্যাবসায়িক সাম্যাবস্থা বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। দেশের স্বয়ংপূর্ণতা এবং স্থিতিশীলতাকে কোন গুরুত্ব দেয়া হয় নি।

 

সমাগত দুর্যোগ নিয়ে কোন সংশয় ছিল না। অক্টোবারে, একটি উচ্চ-পর্যায়ের গবেষণা আমাদের জানিয়ে দেয় কেমন হতে পারে এই মহামারির বিপদ। ডিসেম্বরের একত্রিশ তারিখ, চায়না ওয়ার্লড হেলথ অর্গানাইজেশানকে জানায় যে দেশ জুড়ে ব্যাপক হারে নিউমোনিয়ার মত উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। সপ্তাহ কয়েক পরে জানাল, বিজ্ঞানীরা এর কারণ শনাক্ত করেছেন। উপসর্গগুলির জন্য দায়ী একটি করোনা ভাইরাস। তারা ভাইরাসের জীনের বিন্যাস ণির্ণয় করেছেন। এই সমস্ত তথ্যই তারা সাধারণ মানুষকে দিয়েছিলেন। এরপর কয়েক সপ্তাহ যাবত চায়না সংকটের ব্যাপ্তি কদ্দূর , কাওকে জানালেন না। পরে দাবী করলেন যে এটি স্থানীয় আমলাদের দোষ। তারা কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষকে তথ্য দিতে ব্যার্থ হয়েছিলেন। মার্কিন বিশ্লেষকরাই চায়নার এই দাবীর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

 

চায়নায় কি হচ্ছিল তা বেশ ভালভাবেই জানা যাচ্ছিল। বিশেষ করে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তো তথ্য ছিল। জানুয়ারী থেকে ফ্রেব্রুয়ারী অবধি গোয়েন্দা সংস্থাগুলি বারবার হোয়াইট হাউজের দরজায় করাঘাত করেছেন। প্রেসিডেন্টের সাথে আলাপ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছেন। কোনই লাভ হয় নি। প্রেসিডেন্ট ছিলেন ব্যাস্ত। তিনি হয়তো গল্ফ খেলছিলেন। আর নয়তো টিভিতে নিজের প্রশংসা করছিলেন যে এই হুমকি মোকাবেলায় বিশ্বে তিনিই অগ্রগণ্য।

 

হোয়াইট হাউজের নিদ্রা ভঙ্গের চেষ্টা শুধু গোয়েন্দারাই করেননি। নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে পাওয়া যাচ্ছে, “ একজন উচ্চ পর্যায়ের হোয়াইট হাউজ উপদেষ্টা [পিটার নেভারো] ট্রাম্প প্রশাসনকে কঠোর ভাবে সতর্ক করেন জানুয়ারীর শেষ দিকে। তিনি জানান যে, করোনা ভাইরাস সংকটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কয়েক ট্রিলিয়ান ডলারের ক্ষতির মুখে পড়বে এবং কয়েক মিলিয়ান আমেরিকানকে অসুস্থতা এবং মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেলবে বিপন্ন হবে লক্ষ লক্ষ আমেরিকানের জীবন  [যেমনটি পাওয়া গেছে] চায়না থেকে আসা তথ্যানুসারে।

 

লাভ কিচ্ছু হল না। মাসের পর মাস নষ্ট হয়েছে। আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা একেকবার একেক কাহিনী বলেন। খুবই অলক্ষুণে ব্যাপার। সাথে প্রত্যেক ধাপেই তার প্রতি স্নেহশীল রিপাবলিকান ভোটাররা উন্মত্ত উল্লাসে সমর্থন যুগিয়েছেন।

 

একসময় এসব তথ্য প্রমাণ অগ্রাহ্য করার কোন উপায় থাকল না। ট্রাম্প তখন বিশ্ববাসীকে আশ্বাস দিলেন। বললেন যে তিনিই প্রথম মহামারির বিপদটি শনাক্ত করেছিলেন। বর্তমানে তার দৃঢ় হস্ত সমস্ত কিছুকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। আর এই দাবীর পুরোটাই ট্রাম্পের চাটুকাররা তোতাপাখির মত চারদিকে আবৃত্তি করল। একদল হচ্ছে তাকে ঘিরে রাখা তেলবাজগুলি। আরেকটা হচ্ছে ফক্স নিউজ । এরা ট্রাম্পের ইকো-চেম্বার। ট্রাম্পের সব কথাকে এরা প্রতিধ্বনিত করেন। তারাই ট্রাম্পের সমস্ত তথ্য এবং ধ্যান ধারণার উৎস। এরা যা বলেছে তা থেকে বেশ মজার একটি সংলাপ তৈরী হয়।

 

এসবের কিছুই অনিবার্য ছিল না। দুর্যোগের প্রাক্কালে চায়নার দেয়া তথ্যগুলির মর্মার্থ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলি ছাড়া অন্যরাও বুঝতে পেরেছিল। চায়নার সীমানাঘেঁষা দেশগুলি তৎক্ষণাৎ ব্যাবস্থা নিয়েছিল। তাইওয়ান, সাউথ কোরিয়া, হঙকঙ আর সিংগাপুরে তারা খুব কার্যকর ব্যাবস্থা গ্রহণ করেছিল। নিউজিল্যান্ড লকডাউনে যেতে একটুও দেরী করে নি। ফলাফল, তারা এই মহামারিকে দৃশ্যতঃ খতম করে দিয়েছে।

 

ইউরোপের বেশীরভাগ অংশই ইতস্ততঃ করছিল। তবে অধিকতর সুশৃঙ্খল সমাজগুলি দেরী করে নি। বিশ্বের সবচেয়ে কম মৃত্যুহার জার্মানিতে। জার্মানি উদ্বৃত্ত সক্ষমতাকে সংরক্ষণ করেছিল। এর উপকার পেয়েছে তারা। নরওয়ে এবং অন্যান্য কিছু দেশের জন্যও এটি সত্য। ইউরোপীয়ান ইউনিয়ান দেখিয়ে দিয়েছে কত্ত সভ্য তারা। ওদের যে দেশগুলি অবস্থাপন্ন, তারা দুর্বল দেশগুলিকে সাহায্যের ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সৌভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে তারা কিউবাকে পাশে পেয়েছে। কিউবা তাদেরকে ডাক্তার পাঠাল। আর চায়না দিয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জাম।

 

এই সবটার থেকেই শেখার জিনিস অনেক। তার মাঝে লাগামহীন পুঁজিবাদের স্ববিধ্বংসী স্বভাবটি গুরুত্বপূর্ণ। সাথে নব্য উদারপন্থার উপদ্রব যে বাড়তি ক্ষতিটা করল। জবাবদিহিতা নেই, এমন ব্যাক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানদের কাছে সিদ্ধান্ত গঠনের দ্বায়িত্ব ছেড়ে দিলে কি বিপদ হয় সেটি এই দুর্যোগে বেশ স্পষ্ট হল। কারণ এধরণের প্রতিষ্ঠানগুলির সমস্ত নিবেদন তাদের লোভের প্রতি। তাদের একমাত্র দ্বায়িত্ব এবং কর্তব্য, যেমনটি মিলটন ফ্রিডম্যান এবং অন্যান্য মনীষীগণ বলেছেন, হচ্ছে অর্থশাস্ত্রের আইনগুলিকে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখা।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছু বিশেষ শিক্ষা রয়েছে। যেমনটি ইতিমধ্যে জানা গেল, দি অর্গানাইজেশান ফর ইকোনমিক কো-অপারেশান এন্ড ডেভেলপমেন্টের তালিকায় , যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান একদম নীচের দিকে। এখানকার বেসরকারী স্বাস্থ্যখাত একটি বিপর্যয়। তারা সম্পূর্ণই মুনাফা নির্ভর। এরা এমন একটি ব্যাবসায়িক মডেলকে অনুসরণ করে যেটি দিয়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ টাকা বানানো যায়। তুলনীয় দেশগুলির বিচারে এখানে মাথা পিছু ব্যায় প্রায় দ্বিগুণ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের পরিণতি আলোচ্য দেশগুলির মাঝে সবচেয়ে খারাপ। আমাদের এটা মেনে নেয়ার প্রয়োজন নেই। নিশ্চিত ভাবেই এখন সময় এসেছে অন্য দেশগুলির পর্যায়ে নিজেদের উন্নীত করার। একটি বিশ্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে যেটি মানবিক এবং কার্যকরী।

আরও কিছু সরল পদক্ষেপ রয়েছে। সেগুলিও এই মহুর্তে গ্রহণ করলে ভাল হয়। ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানগুলি আবারও তাদের বড়-ভাই রাষ্ট্র’-এর কাছে ছুটছে। এই বিপদের সময়ে ভাই যেন তাদের ব্যাবসাটা বাঁচান। রাষ্ট্র যদি এদের রক্ষা করেই , তাহলে কঠিন শর্ত আরোপ করে দিতে হবে। এক হচ্ছে এই দুর্যোগ যতদিন চলবে ততদিন কার্যনির্বাহী পদের কারও জন্য কোন বোনাস নেই, বেতনও নেই। নিজেরা নিজেদের শেয়ার কিনে নেয়া, সম্পদ বিদেশে পাচার করা এসব একদম বন্ধ। সাধারণ পাবলিকের ওপর এভাবে কত ট্রিলিয়ান ডলারের ডাকাতি করে নেয় কোম্পানীগুলি। সুতরাং বন্ধ করা গেলে সেটি কোন ছোট পরিবর্তন হবে না। এমন করা কি সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব। আগে তো এটাই আইন ছিল। এই আইনই তো সবাইকে মেনে চলতে হত। তারপর না একসময় রিগ্যান সব উন্মুক্ত করে দিলেন। তাছাড়াও ব্যাবস্থাপনা পর্যায়ে শ্রমিকদের একজন প্রতিনিধি রাখতে হবে। আর জীবনধারণের জন্য পর্যাপ্ত - এমন অংকের একটি মজুরী প্রদান করতে হবে, এবং সেটি মেনে চলতে হবে। চট করে এই কয়টা শর্তই মাথায় আসছে।  

 

ছোট খাট আরও কিছু পদক্ষেপ নেয়া যায়। সেগুলির কোনটাই অসম্ভব নয়। চাইলে বড় পরিসরেও তাদের কার্যকর করা যেতে পারে। তা বাদে, এই সংকট আমাদেরকে নতুন করে ভাবার সুযোগ দিল। পৃথিবী নিয়ে ভাবুন। চিন্তা করুন কিভাবে সেখানে পরিবর্তন আনা যায়। কর্তারা কিন্তু নিজেদের উদ্দেশ্যগুলি চরিতার্থ করার জন্য মনপ্রাণ সঁপে দিয়েছেন। জনপ্রিয় শক্তিগুলিকে এদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে হবে। কোনভাবেই জিততে দেয়া যাবে না। আর নাইলে আরও কুৎসিত একটি পৃথিবীর দেখা  পাব আমরা অচিরেই। এবং সেই পৃথিবী কিন্তু টিকবে না বেশীদিন।

 

কর্তারা রয়েছেন অস্বস্তিতে। কৃষকরা মাথা তুলে দাড়াচ্ছে। তাদের হাতের ত্রিশূল আসমানমুখী। বড় বড় ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানদের হেডকোয়ার্টারে সুর বইছে অন্যরকম। কার্যনির্বাহীর উচ্চ পদে থাকা কর্মকর্তারা যোগ দিচ্ছেন। সবাইকে দেখাতে চাচ্ছেন তারা লোক ভালো। ইঙ্গিতটি এমন যে, তাদের মমতাবান হাত দুটি নিয়ন্ত্রণে থাকলে সবারই সুন্দর জীবন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।  তারা ঘোষণা দেন যে, কর্পোরেট সংস্কৃতি এবং চর্চার আরও যত্নবান ( বেপরোয়া ভাব কাটিয়ে ওঠার) হয়ে ওঠার সময় এসেছে। শুধু শেয়ারের ভাগীদারদের  (যারা সবাই মূলতঃ ধনী) স্বার্থ দেখলে হবে না, ঝুঁকির ভাগ যারা নেন - শ্রমিক এবং সমাজ - তাদের নিয়েও চিন্তা করতে হবে। ডেভোসে শেষ যে সম্মেলনটি হল , জানুয়ারীতে , সেখানে এটিই ছিল মূল আলোচ্য।

 

এই গান আমরা আগেও শুনেছি। কেউই সেটি বলছেন না কেন জানি। ১৯৫০ এর কথা মনে করুন। পঞ্চাশ সালের দিকে এরকম একটি শব্দমালা ছিল আত্নার বন্ধনে গড়া প্রতিষ্ঠান। কিরকম আত্নার বন্ধন সে তো কদিনের ভেতরই টের পাওয়া গেছে।

 

সি জে পলিখ্রনিয়ু : বব, আপনি একটু আমাদের বুঝিয়ে বলুন করোনা ভাইরাসের অর্থনৈতিক ধাক্কাটি কিরকম? আর্থসামাজিক প্রভাবটি কতটা প্রকট হবে? এবং সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবেন কারা?

রবার্ট পলিন : কোভিড-১৯ এর দরুণ যে অর্থনৈতিক ধ্বস নামছে, তার গতি অতি বিপজ্জনক। ইতিহাসে এরকমটার নজির নেই।

 

এপ্রিলের ৪ তারিখ থেকে সপ্তাহটির দিকে দেখি। ৬৬ লক্ষ মানুষ কর্মহীন বীমার আবেদন করেছেন। তার আগের সপ্তাহে এই আবেদন করেছেন ৬৯ লাখ মানুষ। আর তারও আগের সপ্তাহে ৩৩ লাখ লোক। এই তিনটি সপ্তাহর পূর্বে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষ কর্মহীন বীমার আবেদন করেছিল ১৯৮২ সালের অক্টোবার মাসে। তখন রোন্যাল্ড রিগ্যান আমলের তীব্র ডবল-ডিপ রিসেশান চলছিল (অর্থনৈতিক মন্দা , ক্ষণকালীন বৃদ্ধি, আবার মন্দা - ডবল ডিপ রিসেশান)। সেই সময় এই আবেদনের সংখ্যা রেকর্ড গড়েছিল - ৬৫০, ০০০। ১৯৮২ সাল আর বর্তমান দিনের সংখ্যায় পার্থক্যটি আমাদের বিহ্বল করে। বুঝলাম যে, ১৯৮২ সালের তুলনায় আজকের মার্কিন শ্রম-শক্তি আকারে অনেক বড়। তারপরও এটা মানা যায় না। কারণ, ১৯৮২ সালে কর্মহীন বীমার ৬৫০,০০০ টি আবেদন ছিল তখনকার মোট মার্কিন শ্রমশক্তির শতকরা ০ দশমিক ৬ ভাগ। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের ৬৬ লাখ আর আগের সপ্তাহের ৬৯ লাখ মানুষকে একসাথে হিসেব করলে হয় আজকের মোট মার্কিন শ্রমশক্তির শতকরা ৪ ভাগ। তাহলে শ্রমশক্তির শতকরা হিসেবের দিক থেকে, কর্মহীন বীমার এই সাপ্তাহিক আবেদনগুলি ১৯৮২ সালের পূর্বোক্ত রেকর্ডের তুলনায় ৭ গুণ বেশী। গত তিন সপ্তাহের এই কর্মহীন-বীমার দাবীদারদের সংখ্যাটি যোগ করুন। ১ কোটি ৬৮ লক্ষ মানুষ। এই এক কোটি আটষট্টি লাখ মানুষ অতি সাম্প্রতিককালে তাদের জীবিকা নির্বাহের উপায়টি হারিয়েছেন। যেটি মোট মার্কিন শ্রমশক্তির শতকরা দশভাগের বেশী। আশঙ্কা করা যায় যে অনাগত সপ্তাহগুলিতে এই সংখ্যাটি বাড়তে থাকবে। এমন সম্ভাবনাই প্রবল যে কর্মহীনতার হার শতকরা ২০ ভাগে চলে যাবে। এরকম বিষয় শেষবার দেখা গিয়েছিল ১৯৩০ সালে। যখন গ্রেট ডিপ্রেশানের অন্ধ গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছিল আমেরিকা।

----------

 চমস্কি পলিনের সাক্ষাৎকারের বাকী অংশ এবং এরকম আরও অনেকগুলো লেখা পাওয়া যাবে ২০২১, মার্চ এপ্রিলের বইমেলায় চারদিক  প্রকাশিত জনাব মেসবাহউদ্দীন আহমেদ সম্পাদিত " একুশ শতকের অতিমারি আগ্রাসন" বইটিতে। 



~ বরাহশোদনে - বিস্ট্যালিটি ~

হে ছোট শূকর জেনো তোমায় খেতে মানা, মারতে মানা নেই সেই মহাজাগতিক মের্সেনারি তাই একশো বছর পথ হেটে এসেছে একেলা ডেসপারেট দুপুর রাত্রে পালিয়ে সে ভ...