ফ্ল্যাশ ফিকশন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ফ্ল্যাশ ফিকশন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২৩ মে, ২০২০

এ্যান্থন শেকভের ছোটগল্প : আনন্দ

                               এ্যান্থন শেকভ (১৮৬০- ১৯০৪)
রাত্রি বারোটা প্রায়।
মিতিয়া কুলডারোভ তাহার (বাবা-মার) ফ্ল্যাটের দরজা একপ্রকার ভাঙিয়া ফেলিয়া ভেতরে প্রবেশ করিলেন। তাহার মুখ উত্তেজনায় রক্তিম। চুল অবিন্যস্ত। মিতিয়া সমস্ত বাড়ি জুড়িয়া দৌড়ে বেড়াইতে লাগিলেন। বাপ-মা ঘুমাইতে গিয়াছিলেন ইতোমধ্যে। বোনটিও কি একটি উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠাকে চুকাইয়া দিয়া নিদ্রায় যায় যায় অবস্থা। স্কুলগামী শিশু ভাইদুটি তো কবেই অচেতন।
 “ এ্যাই তুমি কোত্থেকে আসলা?” বিস্ময়ে চিৎকার করে ওঠেন নিদ্রাহত পিতা মাতা। “ তোমার ঘটনাটা কি?”
“ আরে আর বইলেন না! আমি তো ভাবিও নাই এমন হইব; স্বপ্নেও ভাবি নাই কোনদিন! কি ঘটনা যে ঘটছে আপনেরা শুনলে …. যাকে বলে মারাত্নক সুসংবাদ ”
মিতিয়া হাসিতে থাকে। ঢলিয়া পড়েন আর্মচেয়ারের গায়ে। আনন্দ তাহারে এমন আত্নহারা করিয়াছে যে পদযুগল আর শরীরকে সামলাইতে পারে না।
“ আপনাদের পোলায় ঘটনা ঘটায় ফালাইল! চিন্তা করতে পারেন! এই দ্যাখেন মিয়া আপনেরা!”
তাহার বোন শয্যা ছাড়িয়া, গায়ে চাদর জড়াইয়া ছুটিয়া আসিল ভাইয়ের কাছে। স্কুলগামী শিশু দুই উঠিল জাগিয়া।
“ ঘটনা কি বাবা? তোমার চোখ মুখ এমন ক্যান!” 
“ কারণ আম্মা আমার খুশি রাখোনের জায়গা নাই! আপনে জানেন পুরা রাশিয়া এখন আপনার এই পোলার নাম জানে! পুরা রাশিয়া। এর আগে খালি আপনে জানতেন যে ডিমিত্রি কুলডারোভ নামের একজন রেজিষ্ট্রেশান ক্লার্ক আছে। আর অখন জানে পুরা রাশিয়া, আম্মা, পুরা রাশিয়া! ওহ রে খোদা রে!”
মিতিয়া লাফ দিয়া উঠিয়া দাড়াইলেন। বোধ হইল এই যেন উড়িয়া চলিয়া যান। সমস্ত বাড়ি জুড়িয়া আরও একবার তিনি দৌড়াইয়া ফিরিলেন। আর্মচেয়ারে বসিলেন যখন, প্রশ্ন আসিল,
“ ক্যান, হইসে টা কি? ঠান্ডা হইয়া ক আমগোরে!”
“ আরে আপনেরা তো থাকেন জংলীগো মত, পেপার পত্রিকাতো পড়েন না কিছু। কি ছাপতেছে না ছাপতেছে হ্যারা কিছু জানেন। কত কত ইন্টারেস্টিং জিনিস ছাপতেছে পত্রিকায়। কিছু হইলেই পাবলিকে একবারে জাইনা লায়। লুকানোর উপায়ই নাই। আমি যে কি খুশি আইজ! খোদা তোমার অনেক মেহেরবানি! এটুক তো জানেন যে একমাত্র বিখ্যাত লোকদের কথাই ছাপে পত্রিকায়। আইজকা অরা আমার নাম ছাপছে!
“ কি কস? কই?”
পিতাটির মুখ পাংশুবর্ণ ধারণ করিল। মাতা ভগবানের ছবিটির পানে চাহিয়া বুকে ক্রুশ আকিঁলেন। স্কুলগামী বালকদ্বয় নিদ্রা ত্যাগ করিয়া ছুটিয়া আসিল ভাইয়ের কাছে। পায়জামা পরিবর্তনের ফুরসৎটিও মিলে নি তাহাদের।
“ হ্যাঁ, ছাপাইছে তো আমার নাম! পুরা রাশিয়া এখন আমারে চিনে! এই পত্রিকা আম্মা রাইখা দিয়েন। এইটা একটা স্মৃতি! মাঝেমাঝে বাইর কইরা পড়বেন! এই যে এই জায়গায় দ্যাখেন আমার নাম!
মিতিয়া তাহার পকেট হইতে পত্রিকার কপিখানি বাহির করিলেন। হস্তান্তর করিলেন পিতার হাতে। এক জায়গায় একটি অনুচ্ছেদ নীল পেন্সিলে দাগানো। সেদিকে অঙুলি তুলিয়া কহিলেন,
“ দ্যাখেন পইড়া!”
পিতা চোখে চশমা দিলেন।
“ জোরে জোরে পইড়েন আব্বা!”
মাতা আবারও ভগবানের পানে চাহিয়া অদৃশ্য ক্রুশকে নির্দেশ করিলেন। পিতা কাশিয়া কন্ঠশোধন করিয়া পড়িতে আরম্ভ করিল : “ তারিখ ২৯ ডিসেম্বরের সন্ধ্যা এগারটার সময়, ডিমিত্রি কুলডারোভ নামধারী একজন রেজিস্ট্রেশান ক্লার্ক ….”
“  এই যে দেখলেন দেখলেন! পড়তে থাকেন!”
“ ডিমিত্রি কুলডারোভ নামধারী একজন রেজিস্ট্রেশান ক্লার্ক, লিটল ব্রোয়ান্নিয়ার কোযিহিন ভবনের একটি পানশালা থেকে নেশাগ্রস্থ অবস্থায় বেরিয়ে আসেন…”
“ এই যে আমি আর শেমিয়োন পেত্রোভিচ, আমরা দোনোজন আছিলাম, হুবহু আমাদের কথাই কইতেছে! পড়ে যান! বাকী সবাই মন দিয়া শুনবা!”
“ নেশাগ্রস্থ অবস্থায় বেরিয়ে আসেন এবং একটি টানা-গাড়ির ঘোড়ার নীচে পড়ে যান। গাড়ির মালিক ইভান ড্রোটোভ পেশায় কৃষক, জেলা ইয়ুভনোস্কি গ্রাম ডুরিকিনো। ভীত ঘোড়াটি কুলডারোভকে মাড়িয়ে গাড়ি সমেত তার ওপরে উঠে পড়ে এবং ছুটতে শুরু করে। এইসময় গাড়ির ভেতরে মস্কোর ব্যাবসায়ী পরিষদের দ্বীতিয় সারির সদস্য স্টিফান লুকোভ অবস্থান করছিলেন। তাকে সহই ঘোড়া-গাড়িটি ছুটে চলে। এসময় আশেপাশের বাড়ির কয়েকজন দারোয়ান এগিয়ে আসেন এবং ঘোড়াটিকে থামাতে সক্ষম হন। কুলডারোভকে, প্রাথমিকভাবে অজ্ঞান অবস্থায়, পুলিশ স্টেশানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে একজন ডাক্তার তাকে পর্যবেক্ষণ করেন। তার মাথার পেছন দিকের আঘাতটি ….”
“ ওটা গাড়ির শ্যাফট দিয়া লাগসিলো , আব্বা। পড়তে থাকেন! বাকীটা পড়েন!”
“ আঘাতটি তেমন গুরুতর নয়। ঘটনাটি নিয়ে তখনই থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়। আঘাতপ্রাপ্ত ব্যাক্তিকে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়েছে …”
“ ওরা বলসে কাপড় ঠান্ডা পানি দিয়া ভিজাইয়া মাথার পিছে চাপ দিতে। পড়লেন তো? হ্যাহ! দেখসেন। এখন পুরা রাশিয়া লোক আমার কথা জানে! দ্যান দেখি!”
মিতিয়া পত্রিকাটি কাড়িয়া লইলেন। ভাজ করিয়া রাখিয়া দিলেন নিজের পকেটে।
“ আমি অখন মারাকোভদের বাসায় যামু। অগোরে দেখামু, তারপর ইভানিটস্কিসদের তো দেখাইতেই হইব, নাতাশা ইভানোভনা আর আনিসিম ভ্যাসিলীইটচ … দৌড়ায়া দৌড়ায়া যামু সবার কাছে ! গুড বাই!”
ফিতার গিটওয়ালা টুপিখানি মাথায় চড়িয়ে, উল্লাসে আনন্দে নৃত্য করিতে করিতে মিতিয়া বাহিরে রাস্তায় চলিয়া গেলেন।

বঙ্গানুবাদ : সালেহ মুহাম্মাদ 
bengali translation © saleh muhammed 


মঙ্গলবার, ১ মার্চ, ২০১৬

ফাগুনের ছাদে কয়েকজন আত্নহত্যাবিমুখ লোক


এখন প্রফেসরকে দেখা যাচ্ছে। ছাদে।
 তিনি চেয়ারে বসছেন। চেয়ারটি প্লাস্টিকের এবং নীল। প্রফেসর না থাকলে চেয়ারটা দেখা যাইত না এই গল্পে। প্রফেসরকে চেয়ার অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা যায়। তিনি বললেন
-          ব্রক্ষান্ডের মাঝে একবিচারে হিউমেন লাইফের তেমন কোন গুরুত্ব নাই বুঝলা। যদি না আমরা নিজেরা এর উপর গুরুত্ব আরোপ করি। গুরুত্ব মাত্রই তাই আরোপিত।
তিনি তাকালেন ডানদিকে। সেদিকে একটা লেবুগাছ। লোহার বড় ড্রামে গাছটি বর্তমান রইছে। লেবুগাছের সামনে, ছাদে এখন আরেকজন লোককে দেখা গেল। লোকটি কোটপরা।

নতুন লোকটি বলল
-          তাহলে আপনে বলছেন যে সুসাইড করাটা খারাপ কিছু না?
-          একবিচারে না। তোমার ভাল্লাগতেছে না , আর সমাধান কিছু তো নাই।
নতুন লোকটির বয়স কম। তার চুলগুলো সব কাল আর কোটটির রং গাঢ় বাদামী। সে বলল যে,
-          খোরশেদ সাহেবও কি একই ভাবে চিন্তা করেন?

ছাদে, এখন খোরশেদ সাহেবকে দেখা যাচ্ছে। তিনি খুব লম্বা। গায়ে পান্জাবী। তিনি মনোযোগ দিয়ে ছাদের কার্নিশে বসা একটা কাক দেখছেন। ছাদে একটি কাক আছে। আরও কাক ছিল কিনা আমরা জানি না , কারণ খোরশেদ সাহেব তাদের প্রতি মনোযোগী হন নাই। তিনি প্রফেসরকে বললেন,
-          ব্রক্ষান্ডের গুরুত্ব আরোপিতই হইছে কারণ এতে হিউমেন লাইফ একসিস্ট করে। আপনার থিওরী বা লজিক যাই বলেন না কেন, ওতে ভুল আছে।
প্রফেসর দুরে বিল্ডিঙের সারি দেখতেসিলেন। ফাগুনের মধ্যবর্তী সময়েও কেন দূরে কুয়াশা কুয়াশা হয়ে আছে এই নিয়ে তার চিন্তা হচ্ছিল। এখন বিকাল। রোদে সোনালী ভাব প্রকাশিত হইছে। তাঁর মনে হল ফাগুনটা মন্দ নয় এবার। তাঁর কোন কিছুকেই ভাল মনে হয় না। সর্বোচ্চ মনে হয় মন্দ নয়। তিনি খোরশেদকে বললেন কথাটা। খোরশেদ বলল
-          মন্দ নয় আবার কি? আমার দেখা বেস্ট ফাগুন এইটা।

নতুন লোকটি বললেন
-          তাহলে কি খোরশেদ ভাই সুসাইড করবেন না?
-          আমি তো কখনই সুসাইডের কথা বলি নাই। সুসাইড ইজ ফর লুজারর্স।
-          সুসাইড করার জন্যে সাহস ও দর্শনের প্রয়োজন। আপনার সেটা নেই।
খোরশেদ সাহেব হাসলেন। বেশ জোরে। কাকটি উড়ে গেল।

প্রফেসর লেবুগাছের ব্যাপারে আগ্রহী হলেন। নতুন লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন যে লেবুগাছটি কার এবং ছাদে আরও লেবুগাছ আছে নাকী, আর বছরের কোন কোন সময় লেবু হয় আর ছাদের গাছটির লেবু সে কখনও খেয়ে দেখেছে কিনা। নতুন লোকটি বিরক্তি ঘটে। সে আত্নহত্যা বিষয়ে চিন্তা করে এমন লোক। তার চিন্তা জগতে লেবুগাছ সামন্জস্যপূর্ণ নয়। সে নিজেকে প্রকাশ করে এভাবে যে,
-          আমি লেবু খাই না।
কথাটি অসত্য। কাচ্চী বিরিয়ানী সে কখনও লেবু ছাড়া খায় না। প্রফেসর বললেন
  -  আত্নহত্যা নিয়ে তুমি যে একটু আগে বললা না দশর্ন আর সাহসের কথা এটা ঠিক বল নাই। মানুষের সব    দর্শনতত্ত্বগুলোর প্রবণতা হল তোমাকে জীবনের প্রতি আগ্রহী রাখা। নট ডেস্ট্রয়িং ইট। আর সাহস আর ইনসেনিটির ভিতর ডিফারেন্স আছে।
নতুন লোকটি দুরে তাকিয়ে বলল
-          স্টোয়িকদের দর্শনে সুসাইডের কথা আছে। জীবন একটা উৎসবের মত। যার ভাল্লাগব না, তার জন্যে দরজা খোলা আছে।
-          ব্যাড ইউজ অফ স্টোয়িসিজম। স্টোয়িকরা বলে যে, সব ধ্বংসাত্নক অনুভুতির জন্ম বিবেচনার ভুল থেকে। সুসাইড ধ্বংসাত্নক অনুভুতি। সুতরাং কোন জায়গায় তোমার বিচারের ভুল হচ্ছে।
খোরশেদ ছাদের কার্ণিশে পা ঝুলায় বসে বলল
-          আপনে আপনার প্রথম কথার কন্ট্রাডিকশনে গেলেন। অগুরুত্বপূর্ণ হিউমেন লাইফে দর্শন থাকনেরই তো কোন মানে হয় না।

বাকী দুজন নীরব। তারা আসলে এখন খোরশেদের প্রতি মনোযোগী। খোরশেদ যেকোন মূহুর্তে ছাদ থেকে পড়ে যাবে বলে তাদের মনে হয়। সুক্ষ উত্তেজনা বোধে তারা আক্রান্ত হন ফাগুনের বিকেলে। এই উত্তেজনা শুধু তাদেরই হয়। আশেপাশের বসন্ত আরোপিত ব্রক্ষান্ড অপরিবর্তিত থাকে।
  
  

~ বরাহশোদনে - বিস্ট্যালিটি ~

হে ছোট শূকর জেনো তোমায় খেতে মানা, মারতে মানা নেই সেই মহাজাগতিক মের্সেনারি তাই একশো বছর পথ হেটে এসেছে একেলা ডেসপারেট দুপুর রাত্রে পালিয়ে সে ভ...