গল্প নং এক
এখন থেকে গল্প লেখব একটা প্রতিদিন। একটার বেশীও লেখা যাবে, চাইলে।
এটা ফার্সট গল্প। এসব লেখা হয় না বহুদিন। অনুবাদের ঠেলায় নিজস্ব লেখালেখির বাজে অবস্তা।
ভুলেই গেসি কিভাবে লেখতাম গল্প।
এইটা অতটা গল্প না। গল্প লেখার আগের অবস্তা বলা যায়। আমি সিরিয়াসও না এই বিষয়ে।
মানে এগুলা প্রকাশের তাড়া নাই। কমপক্ষে তিনশ ওয়ার্ড হতে হবে একেকটা গল্প।
নিজের লেখালেখি প্রকাশের কোন তাড়াই আসলে নাই আমার এখন। অনুবাদ চলুক। যদি চাহিদা হয়
সমাজে, তখন প্রকাশ করা যাবে।
কিন্তু আমার ভাষা কই? এই যে লিখতেসি হুমায়ূন থেকে একটা বাক্য টাইনা, ব্রাত্য রাইসু থেইকা কৌশল ধার কইরা, আর পরে ফেসবুকে কত কত পোলাপানরে ফলো করি ওগো থেকেও ধার করতেসি, আমর অনুবাদগুলা থেকে নিতেসি।
আমার ভাষা কই? আমি কি বলব?
একটা অবভিয়াস পরিণতি ওয়ালা গল্প লিখে কি হবে। যেগুলি জানিই যে কোনদিকে যাচ্ছে। অবধারিত ভাষা আর কৌশল। একই চরিত্র। সাহিত্যগুলি সব কোন অটোমেশানের ভিত্রে পড়ে গেছে। একটি নির্দিষ্ট কোড নিজেকে পুনরাবৃত্তি করেই যায়, আর করেই যায়।
এইটা গল্প হইতেসে না। গল্প আগায় নেওয়ার জন্য চরিত্র দরকার ঘটনা দরকার। এখানে কি ঘটছে? ঘটনার সন্ধানে আমাকে নীচে নামতে হবে। মানে আমি এই গল্প লেখা অবস্থাতেই বাসা থেকে নীচে নামব এবং একই বিন্দুতে দুই ঘটনা সম্ভব নয় বলে যে কোন একটা গল্প হয়ে যাবে। এই গল্প লেখা চলমান, সুতরাং ঘরে বসা অবস্থাতেই যে নীচে নামলাম ,তাতে ঐ নীচে নামাটাই গল্প হইল।
এটা ফার্সট গল্প। এসব লেখা হয় না বহুদিন। অনুবাদের ঠেলায় নিজস্ব লেখালেখির বাজে অবস্তা।
ভুলেই গেসি কিভাবে লেখতাম গল্প।
এইটা অতটা গল্প না। গল্প লেখার আগের অবস্তা বলা যায়। আমি সিরিয়াসও না এই বিষয়ে।
মানে এগুলা প্রকাশের তাড়া নাই। কমপক্ষে তিনশ ওয়ার্ড হতে হবে একেকটা গল্প।
নিজের লেখালেখি প্রকাশের কোন তাড়াই আসলে নাই আমার এখন। অনুবাদ চলুক। যদি চাহিদা হয়
সমাজে, তখন প্রকাশ করা যাবে।
কিন্তু আমার ভাষা কই? এই যে লিখতেসি হুমায়ূন থেকে একটা বাক্য টাইনা, ব্রাত্য রাইসু থেইকা কৌশল ধার কইরা, আর পরে ফেসবুকে কত কত পোলাপানরে ফলো করি ওগো থেকেও ধার করতেসি, আমর অনুবাদগুলা থেকে নিতেসি।
আমার ভাষা কই? আমি কি বলব?
একটা অবভিয়াস পরিণতি ওয়ালা গল্প লিখে কি হবে। যেগুলি জানিই যে কোনদিকে যাচ্ছে। অবধারিত ভাষা আর কৌশল। একই চরিত্র। সাহিত্যগুলি সব কোন অটোমেশানের ভিত্রে পড়ে গেছে। একটি নির্দিষ্ট কোড নিজেকে পুনরাবৃত্তি করেই যায়, আর করেই যায়।
এইটা গল্প হইতেসে না। গল্প আগায় নেওয়ার জন্য চরিত্র দরকার ঘটনা দরকার। এখানে কি ঘটছে? ঘটনার সন্ধানে আমাকে নীচে নামতে হবে। মানে আমি এই গল্প লেখা অবস্থাতেই বাসা থেকে নীচে নামব এবং একই বিন্দুতে দুই ঘটনা সম্ভব নয় বলে যে কোন একটা গল্প হয়ে যাবে। এই গল্প লেখা চলমান, সুতরাং ঘরে বসা অবস্থাতেই যে নীচে নামলাম ,তাতে ঐ নীচে নামাটাই গল্প হইল।
নীচে রোদ। মিষ্টি বাতাস আছে। একটা ছেলে, আমি চিনি বলে মনে হচ্ছে, রাস্তার উল্টো দিকে দাড়িয়ে আমার দিকে চেয়ে বিড়ি টানতেসে। মিষ্টি বাতাস যে আসে, ওটা থেমে থেমে আসে। বাতাসের এই আসা যাওয়ার সাথে বিড়ি টানা, ধোঁয়া ছাড়া, ছাই ফেলাকে কেমন সিনক্রোনাইজ করছে ছেলেটা।
এখন আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে। আমি লেখতেসি যেখান থেকে তার একটা পাাশের জানালা দিয়ে নীচে তাকাই। বাসার উল্টো দিকের ফুটপাতের ওপর দাড়ানো সিগারেট হাতে ছেলেটাকে দেখতে পাচ্ছি। দেখছি রাস্তা পেরিয়ে তার দিকে এখনই আমি যাব। নিজেকে দেখার আগেই চট করে আমি জানালার কাছে থেকে সরে যাই।আমি রাস্তা পার হচ্ছি। বিড়ি টানা ছেলেটা মৃদু মৃদু হাসছে এদিকে চেয়ে। আবার সে কেমন একটা ইশারা করে ওপরে আমার বাড়ির দিকে একবার তাকাল। আমিও মাঝরাস্তায় দাড়িয়ে ওপরে দেখার চেষ্টা করছি এখন। অতি দ্রুত কেউ একজন সরে গেল জানালার কাছে থেকে।
করুণ আহত চোখে আমি তাকাই উল্টা পাশের ফুটপাতে বিড়ি খাওয়া ছেলেটার দিকে। সে সুন্দর আছে। আর এখন অয় হাসতেছে পুরা ঘটনা দেইখা।
যদিও মানব জীবনকে আমি তুচ্ছ বলেই জানি, তারপরো অনেক খারাপ লাগতেসে।
নাইট ডক্টর
অবসের ওয়াডে একটা বাচ্চা হইসে। পুরোপুরি হয়ে ওঠা তার হয় নাই আর। আমার ফ্রেন্ড সাইফুল্লাহ ডেলিভারীর টাইমে বাচ্চাটার মাথা ছিড়ে ফেলল।
আমাদের অবস আর গাইনীতে আলাদা কোন প্রফেসর নাই। একজনই দুই ডিপার্টমেন্ট চালান। এবং তিনি পুরুষ। রোগী বিশেষ একটা আসে না এখানে। প্রফেসর স্যার বিকেল পাঁচটার পরে তার বার্গারের দোকানের ক্যাশে গিয়ে বসেন৷ আমাদের স্যারের দুটি সিম কার্ড৷ হাসপাতালের আমাদের জন্য যে নাম্বার বিকেল পাঁচটার পর সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়। তাঁর অন্য নম্বরটায় ফোন দিলে তিনি পাখির মত কন্ঠে বলেন
- হ্যালো, রফিয কিচেনে আপনাকে স্বাগতম৷ হাউ মে আইবি অফ সার্ভিস ডিয়ার স্যার?
আমি বললাম,
- স্যার তিন নম্বর বেডের রোগীটার অবস্থা ভাল না। পার্টোগ্রাফ দেইখা মনে হয় অবস্ট্রাক্টেড লেবার হইব। আপনে কোঊ?
- সরি স্যার এটা একটা রেশছিউরেন্ট, আপনি কোন হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।
- স্যার আমি আর সাইফুল্লাহ ছাড়া তেমন কেউ নাই। ওই মাইয়াটা আছে, শাহীনূর, অয় তো একটা ভুদাই৷
- আমি দুঃখিত স্যার আমাকে ফোনটা রাখতে হচ্ছে। এই আওয়ারে আমাদের লাইনটা খুব বিজি থাকে।
- দ্যাখেন স্যার এখন সমস্যাটা হইল যে...
আমি বাক্যটির সমাপ্তি ঘটাতে পারি না। প্রফেসর ফোন রেখে দেন।
বর্তমানে আমাদের হাসপাতালে আর এম ও, সিএ, খ্যাপের ডাক্তার, এমনকি ডিপার্টমেন্ট হেডরাও কেউ নেই৷ গত ছয় মাস ধরে হাসপাতাল এদের কাউকে পেমেন্ট করে না। দু'দিন আগে তারা আন্দোলন শুরু করল। তারা একা না। হাসপাতালের নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয়, বেসিক সাবজেক্টের টিউটোরিয়াল পড়ায় যে পোলাপানগুলি এবং অতি আশ্চর্যজনক ভাবে ইন্টার্নির এরা পর্যন্ত সবাই ওদের সাথে যুক্ত হয়েছে। আমার ফ্রেন্ড সাইফুল্লাহ আজকে বিকেলে ছাত্রদের বলে দিয়েছে কালকে সকাল দশটা থেকে ওরাও যেন যোগ দেয়।
অবসের ওয়ার্ডে এখন আছি আমি, সাইফুল্লাহ, শাহীনূর, সার্জারী ওয়ার্ডে পাঁচদিন আগে কোলেসিস্টেকটোমি হওয়া শফিকুল বাহারের ছেলে ঢাকায় নটরডমে কলেজে ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে অধ্যয়নরত আশরাফ বাহার আর সাইফুল্লাহর একান্ত ছোটভাই এখানের মেডিকেল কলেজের ছাত্র মজিদ।
আশরাফ বাহার আর শাহীনূর পাশাপাশি বসা। আশরাফ বাহার হাস্যরত। পাশের শাহীনূর ক্রন্দনরতা। ওয়ার্ডে তেমন আলো নেই। ছয়টার মধ্যে তিনটা টিউব লাইট নষ্ট। ওয়ার্ডের উত্তর এবং দক্ষিণ মেরুতে পরস্পর বিপরীত দেয়ালে দুটি লাইটের প্রাণ এখনও যায় নি। মাঝখানের একটা লাইট সারাক্ষণ পিট পিট করে। তিন নম্বর বেড এই লাইটটার কাছাকাছি। অদ্ভুত অন্ধকারে পাশাপাশি বসা আশফাক শাহীনূরের বৈপরীত্য আমার কাছে মহান ঠেকল। পৃথিবী রহস্যময়৷
সাইফুল্লাহ গর্জন করে ওঠে
- এ্যাই কাঁদবি না। থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলায়ে দিব শালীর ঘরের শালী৷ গেট আপ এ্যান্ড হেলপ মি সেভ দা মাদার।
শাহীনূর নিরুত্তর রয়। আসলে মা-টাও মরে গেছে। আমি হিসেব করেছি দেড় মিনিট হয়েছে। সাইফুল্লাহ বিষয়টা বুঝতে পারে নি। টিউব লাইটের ধিকি ধিকি আলোর মাঝে মায় ফ্রেন্ড সাইফুল্লাহকে বিচিত্র দেখায়। তার দুই হাত আর সাদা এ্যাপ্রোনের হাতাগুলি কবজি পর্যন্ত রক্তে ভেজা। কিছু রক্ত ছিটে তার ঠোঁটে চেহারাতেও পড়েছে বলে মনে হয়৷ সে এই নিয়ে তিনবার সে এ্যাপ্রনের কাঁধে মুখ ঘষল।
রেইন-বো
আর তখন আমি ওনাকে বললাম
- নাহ্ তাইলে বাদ দেও।
- শিওর তুমি
- হুঁ
আমি দরজা মরজা তালা মাইরা নীচে নাইমা দেখি যে বসন্ত চলে গেছে। উনি হি হি কইরা কেমন হাইসা কইলেন যে
- দেকসো তোমার না হাঁ করতে করতে বসন্ত গেসেগা।
- যায়গা তো, এমনই তো হয় আরকি।
আমরা ক্লান্ত ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেলি একটা বসন্তগত দুপুরের গায়ে। রাস্তাঘাট শুকনা কিন্তু একটু আগে বৃষ্টি হইসে এমন মনে হইতে থাকে আমার। একটু বাতাস হয়। ডান পাশের একটা দোতলা বাড়ির বারান্দায় ঝুলানো উইন্ডচাইমটা রিম ঝিম শব্দ করে। আমি হাঁ কইরা বাড়িটা বাইয়া নাইমা আসা বুগানভেলিয়ার ফুল গুলারে দেখি। ভদ্রলোক আমার গালে একটা চটকানা মাইরা কন যে
- শালা মাগী।
আমরা খ্যা খ্যা করে হাসতে হাসতে একে অন্যের পিছে দৌড়া দৌড়ি শুরু করি আর রাস্তায় চলনরত লোকজন খুব বিরক্ত হয় আমগোরে লয়ে। একটা পুলিশ এসে লাত্থি মারতে শুরু করে। উনি একদিকে ছিটকায় পড়েন, আমি একদিকে।
আমি রাস্তায় যেখানে উষ্টায়া পড়সি ওখানে গাড়ির ডিজেল আর পানি মিশে জইমা আছে। ওইটার মধ্যে একটা তেল তেলা রেইনবো ভাসতেসে।
- নাহ্ তাইলে বাদ দেও।
- শিওর তুমি
- হুঁ
আমি দরজা মরজা তালা মাইরা নীচে নাইমা দেখি যে বসন্ত চলে গেছে। উনি হি হি কইরা কেমন হাইসা কইলেন যে
- দেকসো তোমার না হাঁ করতে করতে বসন্ত গেসেগা।
- যায়গা তো, এমনই তো হয় আরকি।
আমরা ক্লান্ত ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেলি একটা বসন্তগত দুপুরের গায়ে। রাস্তাঘাট শুকনা কিন্তু একটু আগে বৃষ্টি হইসে এমন মনে হইতে থাকে আমার। একটু বাতাস হয়। ডান পাশের একটা দোতলা বাড়ির বারান্দায় ঝুলানো উইন্ডচাইমটা রিম ঝিম শব্দ করে। আমি হাঁ কইরা বাড়িটা বাইয়া নাইমা আসা বুগানভেলিয়ার ফুল গুলারে দেখি। ভদ্রলোক আমার গালে একটা চটকানা মাইরা কন যে
- শালা মাগী।
আমরা খ্যা খ্যা করে হাসতে হাসতে একে অন্যের পিছে দৌড়া দৌড়ি শুরু করি আর রাস্তায় চলনরত লোকজন খুব বিরক্ত হয় আমগোরে লয়ে। একটা পুলিশ এসে লাত্থি মারতে শুরু করে। উনি একদিকে ছিটকায় পড়েন, আমি একদিকে।
আমি রাস্তায় যেখানে উষ্টায়া পড়সি ওখানে গাড়ির ডিজেল আর পানি মিশে জইমা আছে। ওইটার মধ্যে একটা তেল তেলা রেইনবো ভাসতেসে।
খোরশেদের বাসায়
আমরা যাচ্ছিলাম খোরশেদের বাসায়। পথে দাড়ালাম। একটা বাড়ি দেখিয়ে আমার ছোটভাই বলছিলেন,
- এই বাড়িটা অনেকটা খোরশেদ সাহেবের বাড়িটার মত। কিন্তু এটা খোরশেদ সাহেবের বাড়ি না।
আমাদের খুব চিন্তা হয়। এই বাড়ির তিনতলায় খোরশেদের মত একটা লোক আছে বলে আমাদের মনে হতে থাকে। আমরা রাস্তা পার হয়ে দারোয়ান পানে যাই। আমাদের দেখে দারোয়ান খুব খুশি হয়। বলে,
- তারপর কেমন আছেন আপনারা?
- আপনি অনেকটা খোরশেদ সাহেবের বাড়ির দারোয়ানের মত।
- হতে পারে। আপনারা কি উপরে যাবেন ?
আমরা উত্তর না দিয়ে সিগারেট ধরাই। আমার ছোটভাই সিগারেট খাননা বিধায় শুধু আমি আর দারোয়ান খাই। বাইরে খুব রোদ হতে থাকে। সিগারেট শেষ হয় বলে আমরা লিফটের দিকে যেতে থাকি। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম দারোয়ানকে। দারোয়ান আকাশ দেখছিলেন।
এবং আকাশ দেখলে লোকেরা যেমন উদাস হয় দারোয়ানকেও তেমন মনে হচ্ছিল।
তিনতলায় লিফট থেকে বেরোলাম। আমরা সামনে একটা দরজা দেখি। দরজার পাশের দেয়ালে ছবি। ছবিতে ঘনকালো মেঘে গ্রামবাঙলার আকাশ ছেয়ে গেছে। কলিংবেল টিপলে একসময় দরজাটি খোলে। যিনি খুললেন তিনি দেখতে খোরশেদের মত না। আমরা বললাম
- আপনি আমাদেরকে চিনবেন না। আমরা আসলে খোরশেদ সাহেবের কাছে যাব ভাবছিলাম। কিন্তু পরে চিন্তা করে দেখলাম ওনাকে আমাদের পছন্দ না। তিনি মন্দ লোক। কিন্তু তাকে আমাদের দরকারো বটে। হিসাবে দেখা যায় আপনি অনেকটা খোরশেদ সাহেবের মত। তাই আপনার কাছে আসা...
তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন,
- আপনারা ভেতরে আসুন।
ভেতরে আসি আমরা। আমাদের খেতে বলা হয়। তাই আমরা খেতে বসি। ভাত, মুরগির মাংস আর চিঙরি দিয়ে লাউ। খেতে খেতে আমার ছোটভাইয়ের কাশি হয়। অনেকটা খোরশেদের মত লোকটা অস্থির হয়ে ওঠেন। তিনি পানি নিয়ে আসেন। আমার ছোটভাইয়ের পিঠে বাড়ি দিতে থাকেন। ভেতরের ঘর থেকে লোকটির স্ত্রী বেরিয়ে আসেন। আমরা বলি, “ভাবী স্লামালিকুম।”
স্ত্রীটি বলে,
- তোমরা ভাই ঠিক মত খাওয়া দাওয়া করেছো তো?
- জ্বি , আপনি খেলেন না কেন আমাদের সাথে?
- আমাদের বাসার নিয়ম ভাই, আমরা মেয়েরা একটু পরে পাই।
আমরা বুঝলাম বাসায় আরো লোক আছেন। খাওয়া শেষ হলে ড্রয়িংরুমে বসে খোরশেদ সাহেবর মত লোকটি বলতে লাগলেন “ বিএনপি আমার মনে হয় না আর কোনদিন ক্ষমতায় আসতে পারবে” আর আমরা বললাম যে “ জীবনান্দ দাশের কবিতা সেই অর্থে বাংলা কবিতা হয় না” খোরশেদ সাহেব বললেন তিনি নিশ্চিত মঙ্গল গ্রহে আগে মানুষের মত একটা সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল তারপর বললেন
- আপনারা একটু বসুন আমার বড় মেয়ে আপনাদের গান শোনাবে।
বড় মেয়েটিকে মনে হল তার গান শোনানোর কোন ইচ্ছা নেই। হয়তো সে ঘুমাচ্ছিল। রাগী মুখে সে, হারমোনিয়াম চাপতে চাপতে রবীন্দ্রসংগীত শুরু করল।
“ আমি তোমারো বিরহে রহিব বিলীন, তোমাতে করিব বাস.. দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস......”
মেয়েটির গলা এবং সুরজ্ঞান চমৎকার। সে গান গেতে গেতে কাঁদতে লাগল। আমাদেরো খুব কান্না পাচ্ছিল। আমার ছোটভাই জড়িতকন্ঠে বললেন,
- আমাদের খুব কান্না পাচ্ছে, আমরা কি একটু কানতে পারি খোরশেদ সাহেব? ঐ খোরশেদ সাহেবের বাসায় গেলে ওনার মেয়ের গানের সময় তিনি আমাদের কাঁদতে দেননা। তিনি খুব রেগে যান আমরা কাঁদলে।
তখন খোরশেদও কাঁদতে শুরু করলেন। আর আমরাও কাঁদতে লাগলাম। কাঁদতে কাঁদতে আমাদের মাথা ধরে গেল। ভাবীকে বলা হল আমাদেরকে কড়া করে এককাপ চা দিতে। আর বড় মেয়েটি বলল যে সে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ পড়ে। তাই আমরা বললাম
- মা তুমি তো বড় সুন্দর গান গাও। তোমাকে গান শিখাল কে?
মেয়েটি জানাল যে সে ছায়ানটের ছাত্রী ছিল আর আমরা বললাম যে শংকরের ঐদিকটায় আজকাল আর যাওয়া হয় না, প্রাইভেট ভার্সিটির ছেলেপেলেতে গিজগিজ করে, প্রচুর জ্যাম আর ধানমন্ডির পরিবেশটাও কেমন সন্ত্রাসসংকুল এবং অশালীন হয়ে গেছে। আমাদের খুব দঃখ হয় ধানমন্ডির জন্যে, প্রাইভেট ভার্সিটিদের জন্যে, সন্ত্রাসের জন্যে, অশ্লীলতার জন্যে। যেন আমরা আবার কেঁদে ফেলব। কিন্তু ততক্ষণে চা চলে আসে। আমরা চুপ করে চা খাই।
তারপর কারেন্ট চলে যায় এবং বাইরে আকাশ কালো করে ঝড় শুরু হয়।
অন দিয রেইনি ডেয
তো হইল কি যে, রাতে আমি বাড়ির বাইরে বাইরাইসি আর বর্ষণ আরম্ভ হইসে। আমি দেখলাম বাসার সামনের স্ট্রিটলাইটের নীচে খাড়াইয়া এক লোক ভিজতেছে। আমি ভিজতে ভিজতে ভদ্রলোক পানে যাইয়া একটু নজর কইরা দেখলাম। দেখিলাম চিনি উহারে। উনি খোর্শেদ। আমাগো পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন। বাট ভদ্রলোক তো মারা গেছিলেন গত বছর। উনার কুলখানিতে মুরগীর বিরানী করা হইসিল কারণ কিছু কিছু হিন্দু লোকজনও আসছিলেন অনুষ্ঠানে।
আমি গিয়া কইলাম যে
- আপনে খোর্শেদ বাই না?
ভদ্রলোক উত্তর দিলেন
- হ। স্যালি কি অবস্থা?
- আমি তো আছি আরকী। কিন্তু আপনে এখানে কেমনে? আপনে না মারা গেছিলেন?
- তা তো গেছিই তবে মাঝে মধ্যে রেইনি ডে গুলিতে ভিজতে ইচ্ছা করে বড়।
মৃত মানুষ সামনে খাড়ায় আছে বইলা আমার একটু ভয় ভয় করল। ভদ্রলোকরে স্পষ্ট কইরা বোঝা যায় না। কেমন অন্ধকার অন্ধকার ঝাপসা একটা ব্যাপার। অবশ্য রাত্রকালে এমনি লোকজনরেই অস্পষ্ট বোধ হয় আর ইনি তো মইরাই গেছেন। আমরা বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে লাগলাম।
আমরা বইলাম গিয়া একটা চা’র দোকানে তাই দোকানদার আমগোরে সিগ্রেট খাইতে দিল। কইল যে চা-টা কিছু হইব না। চুলার ভিত্রে বলে পানি ঢুকছে। আমরা দোকানের ছাউনির নীচে খাড়ায়ে ধোঁয়া ছাড়তে লাগলাম। খোর্শেদ কইলেন যে
- আমার বউ কেমন আছে?
- ভাল আছে। ওনার শুনসি আরেকটা প্রণয় হইছে। যার লগে হইসে সেই পোলার ওয়াইফ মারা গেছিল বিয়ার এক বছরের মধ্যে এন্ড হি’জ গট আ সান।
- শুনছেন মানে কি? ঠিক কইরা কন।
- কাহিনী এইডাই রে ভাই। একটু ঘুরায়ে বললাম আরকী।
- তাইলে তো ভালোই। ওর বয়স কম ছিল আর আমগো তো পোলাপাইনও কিছু ছিল না। একটা সম্পর্কে জড়াইতেসে এটা ভাল।
তারপর এইসব ক্ষেত্রে লোকেরা যেমন বইলা থাকে আরকি, তেমন আমিও বললাম যে, “ জীবন তো আর থাইমা থাকে না”। খোর্শেদ সাহেব বা খোরশেদ সাহেবের মরণোত্তর সত্তা জবাব দিলেন না। তার তেমন কোন এক্সপ্রেশনও বুঝা গেল না। এমনে লোকজনেরই এক্সপ্রেশন বুঝা জটিল আছে আর ইনি তো মইরাই গেছেন।
রাতে ঘরে ফিইরা আমার খুব জ্বর আইল। একজন মৃত ব্যাক্তির লগে বইয়া সিগ্রেট খাইসি মনে কইরা শরীর কাঁপতে লাগল। আমার এমন লাগতেছিল যেন খোর্শেদ সাহেব ঘরের মধ্যে ঢুইকা পড়ছেন। জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করে দেখতেছেন। নানান কথা জিগাইতেছেন। কিন্তু আমি কোন কথাই পরিস্কার কইরা শুনতেছি না। আমি খালি শুনতেসি বর্ষনের অবিরাম অক্লান্ত শব্দ। আমার শীত করতেছিল। মনে হইল ঘরের মধ্যেই বৃষ্টি পড়তেছে। আমার জ্বর কমল পরদিন দুপুর নাগাদ। কমল মানে চইলাই গেল। আমি গোসল টোসল কইরা দেখলাম ঘরে খাওনের কোন ব্যাবস্থা নাই আর ক্ষিধাও লাগছে ভাই সেই। আমি নীচে নামতে গিয়া সিড়ির গোড়ায় খোর্শেদ সাহেবের ওয়াইফরে দেখলাম। লগে হ্যার নতুন প্রণয়। নতুন আর কওয়া যায় না অবশ্য। চার মাস তো হয়ে গেছে। মহিলা আমাকে দেখে আড়ষ্ঠ হলেন যেন আর বয়ফ্রেন্ড লোকটার মুখে বিরক্তির ভাব আসল। কেমন চোখ ছোট ছোট করে মুখ কুঁচকে আমাকে দেখতেছেন। মহিলার গায়ে লাল শাড়ি , কপালে টিপ, চোখে কাজল আর ঠোঁটে লিপস্টিক। শহুরে ললনা বৈধব্যের সাদা রং ধারণ করার মত বিষয়ের মধ্য দিয়ে কোনকালেই যান নাই কিন্তু খোর্শেদ সাহেব মারা যাওনের পরের কয়দিন মেকাপ টেকাপ কিছু দিতেন না। তাতে তারে খারাপ দেখাইত না, যদি আমারে জিগান।
ওনারা উঠতেছেন সিড়ি দিয়া। আর আমি নামব। আমগো বাড়ির সিড়িডি চিপা ও সরু বিধায় পরস্পর বিপরীতমুখী লোকেরা একই সময়ে সিড়ি ব্যবহার করতে পারেন না। আমি ভদ্রতা কইরা খাড়ায়া আছি। কিন্তু বয়ফ্রেন্ড লোকটি এমন মুখভংগি করতেছেন যেন আমার খাড়ায়া থাকাটা ইচ্ছাকৃত। আমি ওনারে বিশেষ পাত্তা দিলাম না। তারা আরেকটু নিকটবর্তী হইলে আমি বয়ফ্রেন্ডরে টপকাইয়া মহিলারে উদ্দেশ্য কইরা কইলাম যে
- ভাবী আছেন তো ভালই, না?
মহিলা কিছু না কয়ে মাথা নীচু কইরা কেমনে হাসলেন জানি। আমি বিভ্রান্ত হইলাম। এমনে লোকজনেই বিভ্রান্ত করে আর ইনি তো সুন্দরী মেয়েমানুষ।
বয়ফ্রেন্ড লোকটা ফোঁস ফোঁস শব্দ করতে লাগলেন।
নীচে নাইমা দেখলাম বৃষ্টি থামছে বটে বাট আবারও শুরু হইব হইব একটা ভাব আকাশে বাতাসে বিরাজমান। আমি গতরাতের স্ট্রীটলাইটের নীচে আইসা খাড়াইলাম। আমার মনে হইল আমি বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করতেসি।
ড্যাডি
১.
মধ্যরাতে আমার খুব অস্থির লাগছিল। মনে হচ্ছিল আমার তো কোন সন্তান নেই। একটা চন্চল ছোট্ট সন্তানের জন্যে আমি ঘামতে লাগলাম। আমি ফোন দিলাম ডাক্তারকে। ডাক্তার ফোন ধরে বললেন
- কি খবর , আছ কেমন?
- স্যার আমার সমস্যা হইতাছে।
- যেমন?
- আমার তো কোন সন্তান নাই। আমার খুব খারাপ লাগতেছে। আমার কি হইব?
আমি কাঁদছি দেখা যাচ্ছে। আর ডাক্তার বলল
- তুমি সকাল হলে নীল ক্ষেত যাবা। একটা বিড়ালের বাচ্চা কিনে আইনা কিছুদিন পালবা। আশা করি কিছুটা ঠিক হবে।
- সকালের আগ পর্যন্ত কি করব?
- বাসার ছাদে যাও। দেখো বৈশাখের আকাশ তারায় তারায় ভরা।
আমি ছাদে উঠে একটা মার্লবোরো ধরাই। আকাশ পরিষ্কার। অসংখ্য তারা ঝুলে আছে। কি ধরে ঝুলছে তারাগুলো আমি বোঝার চেষ্টা করি।
২.
যে বিড়ালের বাচ্চাটা কিনে আনলাম ওটার রং কুচকুচে কাল আর ওটা কথা বলতে পারে। তার গলার স্বর মানব শিশুদের মত। আমাকে দেখিয়ে দোকানদার বলল
- এটা তোমার বাবা ড্রাগন। দেখ বাবা।
দোকানদার মহিলা এবং খানিকটা বিড়ালের মত দেখতে। তাই আমার একটু লজ্জা লজ্জা করছিল। বাচ্চাটা কোন কথা বলছিল না। তার সবুজ সবুজ চোখ। আমাকে দেখছিল কিভাবে জানি।
রিক্সায় আসার সময় আমি বাচ্চাটাকে বললাম
- বাবা ড্রাগন তুমি কেমন আছো।
বাচ্চাটা বলল
- আমি মোটামুটি থাকি সবসময়। তুমি কেমন আছ?
- আমি এই মূহুর্তে খুব ভাল আছি। আমি আবার মোটামুটি থাকতে পারি না। হয় খুব ভালো বা খুব খারাপ থাকি সবসময়। এটাই আমার সমস্যা।
- অ
ড্রাগন আর কোন কথা বলল না। আমার মনে হল তার মন খারাপ। আমি বললাম
- তোমার কি মন খারাপ হইসে বাবা? মা-র কাছে যেতে চাও?
ড্রাগন সবুজ সবুজ চোখে আমার দিকে একবার তাকাল। কঠিন কন্ঠে বলল
- না।
রিক্সা চলছিল আর রাস্তায় বৈশাখের বাতাস বইছিল প্রচুর। আমার চোখ ভিজে যায়।
৩.
যখন রাত হয় তখন ডাক্তার আমার বাসার নীচে আসে। আমি বারান্দা থেকে নীচে দেখি ডাক্তার ; আর তিনি সাদা পান্জাবী পরে মার্লবোরো টানছেন। আমি ফোন দিয়ে বললাম
- স্যার উপরে আসেন। আপনার কথামতো বাচ্চা কিনসি। কাল বিড়ালের বাচ্চা। দেখে যান।
- উপরে আসতে পারব না। আমি কখনও রুগীদের বাসায় যাই না। তুমি কষ্ট করে নীচে আইতে পারলে আসো।
- ছোট বাচ্চা বাসায় একা রেখে যাই কেমনে?
- টিভি ছাইড়ে দাও , বসে বসে টিভি দেখুক।
আমার বেশ রাগ হল। আমি শ্লেষজড়িত কন্ঠে বললাম
- সন্তান প্রতিপালন বিষয়ে আপনার উপদেশ চাচ্ছিলাম না স্যার। আমি যদ্দুর জানি আপনার নিজের ছেলে তো ড্রাগ এডিক্ট।
- অ........তাইলে নামবা না তুমি?
- না। গো টু হেল। আপনার চিকিৎসার আমার প্রয়োজন নাই।
আমি ফোন রেখে দিলাম। বললাম “হারামজাদা”। ড্রাগন দুধ খাচ্ছিল। সে দুথের বাটি থেকে মুখ তুলে বলল
- হোয়াট হ্যাপেন্ড ড্যাডি?
- দ্যাট ব্লাডি ডক্টর। শালার কথা শুনলে আমার গা জ্বলে।
- ঐ ডাক্তারের সাথে তুমি আর দেখা কইরো না। ও তোমাকে আরও অসুস্থ করে দিচ্ছে।
- ঠিকই বলস বাবা।
ড্রাগন লাফ দিয়ে আমার কোলে উঠল। নরম নরম একটা বাচ্চা। উষ্ণ আর জীবন্ত। আমার নিজেকে সুখী সুখী লাগে।
তারপর আরো রাত হয়। সারাদিন যেই শব্দগুলা শুনতে পাই না সেই শব্দগুলো একটা একটা করে শুনতে থাকি। ঘড়ির শব্দ, ফ্রিজের র্যা র্যা শব্দ, ঘুমন্ত ড্রাগনের নিশ্বাসের শব্দ, আমার হার্টবিটের মৃদু ধিক ধিক শব্দ। আমার একটা সন্দেহ হতে থাকে। আমি চুপি চুপি বারান্দায় এসে নীচে উঁকি দেই। যা ভাবসিলাম তাই। ঐ ডাক্তার লোকটা এখনও নীচে আছে। তার গায়ে সাদা পান্জাবী। সে মার্লবোরো টানছে। ডাক্তারটা উপরে তাকিয়ে আমাকে দেখে ফেলল। সে এখন দাঁত বের করে হাসছে।
৪.
ড্রাগন এখন একটু বড় হইসে। তার গায়ের কালো লোম চিক চিক করে সারাক্ষণ। সে কথা কম বলে। নিজে নিজে কই কই জানি ঘুরতে চলে যায় মাঝেমধ্যে। আমার ধারণা সে প্রেমটেম করছে। আমার দুটো বাসা পড়ে একটা দোতলা বাড়ি আছে। ওখানের লোকগুলো একটা সাদা মেয়ে বিড়াল পালে। আমার ধারণা ড্রাগন তার সাথেই প্রেম করতেসে। আমি সেভাবে জিজ্ঞেস করিনি। ইদানীং কিছু জিজ্ঞেস করলেই ড্রাগন বিরক্ত হয়।
ড্রাগন বড় হওয়ায় আমার সুবিধা হইসে যে আমি এখন তাকে একা রেখে বাইরে যেতে পারি। একদিন গেলাম নীলক্ষেতের ঐ দোকানটাতে। বিড়ালের মত মহিলাটা ছিল। তাকে সুন্দর লাগছিল দেখতে বা আমার তাকে সুন্দরবোধ হচ্ছিল। আমাকে দেখে মহিলাটি খুব হাসলেন। কহিলেন যে,
- আরে ড্রাগনের বাপ। তুমি তো সেই যে গেলা আর তো আইলা না মিয়া।
- বাচ্চাটাকে নিয়ে ব্যাস্ত থাকি। এখন একটু বড় হইসে দেখে একা একা ছেড়ে দেই।
- ভাল করস ড্রাগনের বাপ। পোলাপান বড় হইলে তাগোরে স্বাধীনতা দেয়া দরকার আছে।
তারপর মহিলাটি কথা বন্ধ করলেন। আর কথা বন্ধ হয় আমারো। আমাদের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। পশুপাখির দোকানটিতে খাচায় খাচায় পশু আর পাখিরা চিৎকার করতে থাকে। মহিলাটিকে আমার নিশ্চিৎভাবে ড্রাগনের মা বলে বোধ হয়। আবার ঠিক শিওরও হইতে পারি না। আমি ধরা গলায় বললাম
- ড্রাগনের মা, আজকে তাইলে আমি আসি।
মহিলাটির চোখে জল। সে ব্যাকুল কন্ঠে বলল
- তুমি আর আইসো না কোনদিন। তোমার ছেলে নিয়ে সুখে থাইকো। তোমারে দেখলেই আমার কষ্ট হয়।
আমার মনে হল ছুটে গিয়ে ড্রাগনের মাকে জড়িয়ে ধরি। বলি যে, “ বেইবে, মায় বেইবেহ ইটস গনা বি অল রাইট”। কিন্তু এমনটা করতে আমার খুব লজ্জা হচ্ছিল। আমি নীলক্ষেত থেকে বেরিয়ে একটি মার্লবোরো ধরালাম।
৫.
ডাক্তারের চেম্বার রোগী শুন্য। কম্পাউন্ডার লোকটিও অনুপস্থিত। আমি রুমের দরজার কাছে এসে শুনলাম ভেতরে উচ্চনাদে গান বাজছে। ফকির আলমগীরের গলা
“ ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে, আমি এখন রিস্কা ছালাই ডাহা শোহরে....”
আমি দরজার টোকা দিলাম। স্যারের কন্ঠ শোনা গেল। বললেন যে,
- কে? দরজা খোলা ভিত্রে ঢুকে পড়ুন।
রুমের ভেতরের সাধারণ বাতিটি নিভিয়ে ভৌতিক লালাভ একটা আলো জ্বালানো হয়েছে। রুম ভর্তি ধোঁয়া। গাঁজার উগ্র গন্ধ। স্যারের হাতে মাটির কাল একটা কলকে। এগুলাকে বাঁশি বলে। তিনি বললেন
- অ তুমি আইছো। ভাল ভাল। দরজাটা ভিড়ায়ে দাও। গন্ধ বাইরে গেলে লোকজন মাইন্ড করে।
আমি দরজা বন্ধ করলাম। স্যার বাঁশিতে টান দিলেন। বাঁশির মাথায় মুগ্ধ আগুন লাল থেকে উজ্জ্বল কমলা আর আবারো লাল তারপর উজ্জ্বল কমলা হতে থাকে। আমার মাথা ঘুরায়। আমি বললাম
- স্যার আছেন কেমন?
- আয় এম ফাকিং হাই। হাই ব্যাক্তিরা ভাল খারাপ থাকে না। তারা হাই থাকে।
- রোগীরা সব কই আপনার?
- অল গন। আমি মেডিসিন ত্যাগ করসি। নট আ ডক্টর এনিমোর। তবে তোমার কোন সমস্যা থাকলে বলতে পার। ফ্রিতে চিকিৎসা করব। অবশ্য তুমি তো বলস আমার চিকিৎসার দরকার নাই তোমার।
- আমার কোন সমস্যা নাই স্যার। আমি এখন ভাল আছি।
- বাচ্চাটা কেমন আছে?
- মোটামুটি আছে। সে অবশ্য এখন যুবক। বাচ্চা নাই আর।
- তোমারে বলসিলাম কয়দিন বাচ্চাটাকে পালতে। এতদিন ধরে রাইখা দিলা কেন? কাজটা ঠিক কর নাই।
- কি বলতেসেন আপনে বুঝলাম না। আমি কি আমার সন্তানকে রাস্তায় ফেলে দিব? সে জন্তু জানোয়ার হোক যাই হোক, হি’জ মাই সান। মায় ফাকিং সান।
- তুমি পিতৃত্ববোধে অন্ধ হইস। তুমি বাস্তবতা দেখতেস না।
- স্যার বাদ দেন। আপনাকে দেখতে আসছি, ঝগড়া করতে চাই না। অন্যবিষয়ে আলাপ করি।
- অন্যবিষয়ে কি আর আলাপ করবা, আলাপ করার মত বিষয়ই তো এইটা।
আমি চুপ করে গেলাম। লালচে অন্ধকার, গাঁজার ধোঁয়া আর ফকির আলমগীরের কন্ঠ মিলেমিশে যায়। আমি বিমূঢ় হয়ে বসে থাকি এই অদ্ভুত চেম্বারে। স্যার আমার দিকে কলকে বাড়িয়ে দেন। আমি চিন্তিত বোধ করি।
৬.
ড্রাগন এখন আর আমার বাসায় থাকে না। তার বলে সাদা বিড়ালটার সাথে বাচ্চা হইসে। আমি খুব অবাক হইসিলাম। আমাকে কিছুই জানায় নি সে। আমার কান্না আসছিল। তারপরো স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম। বললাম যে
- ওদের সবাইকে নিয়ে তুমি এখানে চলে আসো বাবা।
- এটা সম্ভব না। নার্শিদ তোমাকে পছন্দ করে না ড্যাডি।
নার্শিদ ঐ সাদা বিড়ালটার নাম। আমি বিস্মিতকন্ঠে বললাম
- আমাকে পছন্দ করে না কেন? আমি কি করসি?
- ও বলসে তুমি অনেক পসেসিভ। এটা ওর কথা , আমার না। এন্ড আই কান্ট চেন্জ হার ওয়ে অফ থিংকিং। তুমি মন খারাপ কোরো না। আমি আসব মাঝেমাঝেই।
রাত হয়। তারপর আরো রাত হয়। আমি ফ্রিজের শব্দ শুনি, ঘড়ির শব্দ শুনি। রাত যত বাড়ে তত আমার কেমন সব সন্দেহ হতে থাকে। আমি বারন্দা থেকে নীচে উঁকি দিয়ে দেখি ডাক্তার সাদা পান্জাবী পড়ে রাস্তায় বসে আছে। তার পাশে ড্রাগনের মাও আছে এবং ড্রাগনের মাকে আমার সুন্দরবোধ হয়। তারা গল্প করছিল। বারান্দায় দাড়াতেই আমাকে দেখে ফেলল। হাত নেড়ে ডাকতে লাগল। আমি দ্রুত ঘরে ঢুকে যাই। একবার মনে হয় ডাক্তারের সাথে নীচে গিয়ে একটা মার্লবোরো টেনে আসি। অথবা ড্রাগনের মায়ের হাত ধরে ঘুরতে চলে যাই কোথাও। কিন্তু তারপরেই মনে হয় ধুউর। হয়তো এই গভীর রাতে ড্রাগন আমাকে খুঁজতে আসবে। রাতের কমলা আলোতে তার কালো লোম চিকচিক করে উঠবে। সবুজ সবুজ চোখে তাকিয়ে সে বলবে
- ড্যাডি , কি অবস্থা? ক্যায়সা চালতা হ্যায়।
আমি অপেক্ষা করি আমার বাচ্চাটার জন্যে।
নধর জলের ধারে
যেসব লোক মারা যাবেন তারা জল দেখছিলেন। তখন বিকাল। রাস্তায় সোনালী সোনালী রোদ। মারা যাবেন এমন লোকেরা সংখ্যায় তিনজন। লেকের পারে পাথরের গোল টেবিল। ঠান্ডা পাথরের চেয়ার। তিনটি চেয়ারে বসে তিনজন লেকের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। লেকটির জল সবুজ এবং শ্যাওলাসংকুল। বিকেলের রোদ জল থেকে ফেরত এসে তাদের মুখে পড়ছিল। যদিও তারা জানতেন না সেটা। তারা ভাবছিলেন যে রোদ জলে ভিজে, সেই রোদ জলেই থেকে যায়। থেকে থেকে এককালে মরে যায়। আর রাস্তায়, গাছের পাতায়, মানুষের চেহারায় পড়ে থাকা রোদেরা ভিন্ন। রোদ বা সেই অর্থে জাগতিক সকল বিষয়ের চলাফেরা সমন্ধে তাদের এজাতীয় ভ্রান্তি ছিল। এবং মৃত্যুর সন্নিকটে এসেও সেই ভ্রান্তি দূর হয় না। তখন একজন বললেন যে,
- আমার একটা ইচ্ছা ছিল বুঝলেন, মানে মনে হইত আরকী যে এই লেকের পানিতে একটা ডুব দিয়ে একদম নীচে চলে যাই। অনেক দিন বিরিজের উপ্রে দাড়ায়ে দাড়ায়ে ভাবসি সেই কথা। কিন্তু করা হল না।
চুল রুপালী হয়ে গেছে একজনের এদের মধ্যে, তিনি বললেন,
- আপনার ইচ্ছাটা অনেকটা বিনয়বাবুর মত।
- কে?
- কবি বিনয় মজুমদার। আপনার তো কবিতায় আগ্রহ ছিল না একারণে জানেন না। উনি বলেছিলেন " সাধ জাগে বড় সাধ জাগে, ডুব দিয়ে দেখে আসি নধর জলের নীচে আকাশের অভিমুখী কোন উন্মুখ কুড়ি আছে কি না।
অবশিষ্ট যিনি চশমা পড়েন তিনি বললেন,
- লেকের জলটা ইজন্ট নধর। ময়লা। পোলাপান পস্রাব করে করে ভরায় ফেলসে। এটাতে ডুব দেয়ার রুচি হয় কী করে কারও আমি ত বুঝি না।
প্রথমজন বেশ বিরক্ত হলেন। চোখ কুচকে চশমাওয়ালাকে বললেন,
- আপ্নে তো বাল হয় বেশী বোঝেন নাইলে বোঝেনি না। এই ত করলেন সারাজীবন।
- আরে রাগ করেন কেন বাই। উই আর ডাইং মেন। রাগ আমাদের জন্যে অর্থহীন।
নিকটবর্তী মৃত্যুর স্মরণে আবারো তাদের মন খারাপ হয়। তারা নীরবে জল দেখতে লাগলেন। তারপর বিকাল শেষ হতে না হতেই সন্ধ্যাও শেষ হয়ে যায়। তারপর রাত। খুব জ্যোৎস্না হল চারপাশে। আকাশের নিখুঁত গোল একটা চাঁদ লেকের জলে টলমল টলমল করতে লাগল। এমন জ্যোৎস্নাতেও তারা নির্বিকার থাকেন। তাদের মনে হয় না এই টলমলে জ্যোৎস্না অথবা সকাল সাতটায় লেকের পাশে জগিংরত লোকেরা অথবা সন্ধ্যাকালীন ঝলমলে তরুনীদের মাঝে তেমন কোন ভিন্নতা বিশেষ আছে। মৃত্যুবর্তী লোকেরা এমন হয়ে যায় অথবা তাদের এমন হয়েছিল।
একজন একটা সিগারেট ধরালেন। তিনি বেশ স্বাস্থ্যসচেতন লোক ছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে তিনি প্রচুর সিগারেট খান। সেদিন বৃহস্পতিবার রাতে প্রচুর মদও খেয়েছিলেন। পরে রাস্তায় মাতলামি করছিলেন এমন সময় পুলিশ ধরে নিয়ে গেল। তখন তিনি জানি কাকে ফোন দিলেন আর তাকে ছেড়ে দিল পুলিশরা।
তিনি ব্যাগ থেকে একটা বোতল বের করলেন। দেশী মদের ঝাঁঝাঁল গন্ধে জ্যোৎস্না ভারী হয়ে গেল। আশেপাশে লোকজন ঘুরছে, পুলিশরা হাঁটছে। এই অবস্থায় মদ্যপান কতটা শালীন অথবা নিরাপদ তা নিয়ে বাকি দুজন কিছু বলল না। মৃত্যুবর্তী লোকেরা পুলিশ বা পাব্লিকের বিষয়ে হয়ত অবিচলিত থাকে। তিনি কয়েক চুমুক দিয়ে পাথরের টেবিলে বোতলটি নামিয়ে রাখলে বাকীরাও একটু একটু খেল।
তাদের মধ্যে যার বয়স একটু বেশী তিনি হঠাত খেয়াল করার ভংগিতে বললেন,
- আজকে অনেক জ্যোৎস্না হল, দেখেছেন।
যিনি নতুন সিগারেট মদ খান তার একটু মাথা ঘুরাচ্ছিল, তিনি জড়িত কন্ঠে বললেন
- ফাক জ্যোৎস্না। ফাক ইট অল
বয়স্ক জন বলল,
- আপনার তো ধরে গেল মনে হয়
- অত ধরে নাই। বেশী ধরলে আপনার এই নধর জলের নীচ থেকে একটা ডুব দিয়ে আসব।
অন্য আরেকজন যে ছিলেন, তিনি বললেন,
- এই জ্যোৎস্নাটা কেমন জানি মন-খারাপ মন-খারাপ।
বয়স্ক জন বললেন
- মদ ত খাচ্ছেন, মন ভাল হয়ে যাবে।
- সব মন খারাপ মদে ভাল হয় না।
যিনি নতুন খান তিনি প্রশ্ন করার মত করে বললেন
- এলকোহল হ্যাজ ইটস লিমিটেশন, এইটা বলতে চান তো?
- হুম
- ফাক ইউ ব্রো, ব্লাডি ফাক ইউ
- ভাল
তখন তিনি, যিনি নতুন খান, গান গেতে শুরু করলেন
- " চান্নি রাইতে ফুল বাগানে
ফুল ফুটাইল কে
ও মনয়া ফুল ফুটাইল কে"
বাকী দুজন গানে অংশ নিলেন না। আশপাশ দিয়ে চলমান লোকেরা এই তিন জনকে ঘুরে ঘুরে দেখে। যেন এরকম তিন জন লোক কে আগে কোন দিন দেখা যায় নি। অথচ তারা ছিলেন শুধুই মারা যাবেন এমন তিন জন লোক। এরকম লোকজন সবাই আগেও দেখেছে।
রাত গভীর হতে হতে এক সময় চাঁদ ডুবে যায়। তারা ভাবলেন চাঁদটি হয়তো মরে গেল। চারপাশে গূঢ় অন্ধকার। নীরব। তাদের সামনে টল টলে আঁধারের মত কাল জল।
তিন জন মৃত্যুবর্তী লোক অন্ধকার দেখতে লাগলেন।
কুমির ও ব্রেকিং ব্যাড
আমরা নৌকায় উঠলাম তিনজন। একজন নৌকাটি চালাতে থাকেন বইলা আমরা বাকী দু’জন চুপচাপ বসে চালিত হই। আমার মনে হয় ব্রেকিং ব্যডের ঐ সিনটার কথা, যে ওয়াল্টার গুলি করল মাইকরে তারপর কেমন অবাক হয়ে গেল। আমার মনে হইতে থাকে এক্ষন এরকম একটা কিছু ঘটব। তখন একজন বললেন যে,
- এই পানিতে বুঝলেন কুমির আছে।
আমি কুমির দেখার জন্যে, জল পানে তাকাই, নৌকা থেইকা ঝুঁকে। টলটলে ঘন সবুজ জল। পাতাপুতা চিপসের প্যাকেট বোতল ভাইসা ভাইসা ঘুরে। এসবের ভিতরে কই কই কুমির লুকায় আছে কে জানে। আমার মনে হইতে থাকে ব্রেকিং ব্যাডে ওয়াল্টার গুলি করছে মাইকরে। তারপর খুব অবাক হইছে। ধানমন্ডি লেকের এই পানি আমি আগেও কত দেখছি। লেকের পাড়ে বসে বসে তাকায় থাকছি পানির দিকে। কিন্তু নৌকায় বইসা মনে হইতাছে এই জল খুব জংলি ধরণের। পাড়ে বসে দেখা শান্ত পোষ্য জল না। জলের গভীরে গভীরে নানান কান্ড ঘইটা যাইতাছে। আমি কইলাম যে,
- ফাউল কথা কেন যে বলেন না ভাই। আপনাকে কে বলসে কুমির আছে।
- কুমির আছে। আমি নিজে একদিন দেখেছি। আপনাদেরকে নৌকা ওঠার আগে কই নাই যে আপনারা আবার ভয় পাবেন।
যিনি নৌকাটা চালাইতেছিলেন তিনি দেখলাম প্যাডেল করা বন্ধ রাখছেন। আমি খেয়াল কইরা দেখলাম যে আমরা লেকের একদম মাঝখানে। চালক একটা সিগারেট ধরালেন। আমার মনে হইল এখন কিছু হইব। আমার নিজেরে লাগল ব্রেকিং ব্যাডের ওয়াল্টারের মত। যে অদ্ভুত আগ্রহ নিয়ে ওয়েইট করতেসে ভয়ংকর কিছুর জন্য। অন্যজন চিৎকার কইরা উঠলেন,
- ঐ যে দেখলেন দেখলেন।
আমার বিরক্তি ঘটল। বললাম যে
- আপনে নেশাটেশা করে আসছেন নাকী?
- আদ্ধুউর মিয়া। কুমির একটা ভেসে উঠে চলে গেল। দেখলেন না আপনারা।
চালক বললেন যে,
- এই পানিতে আপনার, কুমির থাকাটা সম্ভব না। তাছাড়া কুমির তো ডলফিন না যে ভেসে উঠেই ডুব দিবে। কুমিরের কায়দা ভিন্ন।
অপরজন বললেন যে
- আপনেও তাইলে কুমিরের বিষয়ে আমাকে অপোজ করছেন?
আমি সুবিধাজনক একটা জায়গায় থাকার জন্যে তাড়াতাড়ি কইলাম যে
- আমি কিন্তু অপোজ করতেসি না। কিন্তু আপনে আমাকে কুমির দেখাতে না পারলে ঠিক সাপোর্টও দিতে পারতেছি না।
আমরা তিনজন চুপ কইরা আছি। জলমধ্যে সুর্য প্রখর হয়। আমরা ঘামতে থাকি। চালক সিগারেট শেষ করে বলেন যে
- ফিরে যাবেন? নাকী আরেকটু ঘুরবেন আপনারা।
অপরজন বললেন যে
- আরেকটু থাকি। বাতাস আসতেসে কেমন একটা আমার খুব ভাল্লাগতেসে।
আমাদের আশেপাশে আরো লোকেরা নৌকা নিয়ে ঘুরছে। আমার তাদেরকে সুখী-সুখী লোকজন মনে হইল। আমি চিন্তা কইরা দেখলাম, চালকের ভিত্রে কোথায় জানি ব্রেকিং ব্যাডের মাইকের মত একটা মিল আছে। অপরজন যে ছিলেন ওনার সাথে কারও তেমন মিল পাইলাম না। অপরজনের উপর আমার বিরক্তি ঘটল। ওনাকে একদম ফালতু একটা লোক মনে হইতে লাগল।
অন্য নৌকার লোকেরা আমাদের ডেকে ডেকে নানান কথা জিগেশ করে। আমাদের মধ্যে একজন, তাদেরকে জানায় যে, এই জলে কুমির আছে, তাই একটু সাবধানে থাকতে। অপরজন বললেন, ধানমন্ডি লেকের পানিতে কুমির কি কারণে বংশরক্ষা করতে পারবে না।
আমার খুব অস্থিরতা হয়। মনে হয় ব্রেকিং ব্যাডের ঐ সিনটা ছিল যে ওয়াল্টার গুলি করছে মাইকরে আর তারপরে অরা বইসা আছে আর ওয়াল্টার বলতেছে , “ আই এম সো সরি মাইক...”। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করি যে এখন একটা মহান সময়, একটা কিছু ঘটব এই এক্ষণ।
ধানমন্ডি লেকের জলে ভুশ করে একটা কুমির ভেসে উঠল। ওটা আগাচ্ছে আমাদের নৌকার দিকে।
ফাগুনের ছাদে কয়েকজন আত্নহত্যাবিমুখ লোক
এখন প্রফেসরকে দেখা যাচ্ছে। ছাদে। তিনি চেয়ারে বসছেন। চেয়ারটি প্লাস্টিকের এবং নীল। প্রফেসর না থাকলে চেয়ারটা দেখা যাইত না এই গল্পে। প্রফেসরকে চেয়ার অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা যায়। তিনি বললেন
- ব্রক্ষান্ডের মাঝে একবিচারে হিউমেন লাইফের তেমন কোন গুরুত্ব নাই বুঝলা। যদি না আমরা নিজেরা এর উপর গুরুত্ব আরোপ করি। গুরুত্ব মাত্রই তাই আরোপিত।
তিনি তাকালেন ডানদিকে। সেদিকে একটা লেবুগাছ। লোহার বড় ড্রামে গাছটি বর্তমান রইছে। লেবুগাছের সামনে, ছাদে এখন আরেকজন লোককে দেখা গেল। লোকটি কোটপরা।
নতুন লোকটি বলল
- তাহলে আপনে বলছেন যে সুসাইড করাটা খারাপ কিছু না?
- একবিচারে না। তোমার ভাল্লাগতেছে না , আর সমাধান কিছু তো নাই।
নতুন লোকটির বয়স কম। তার চুলগুলো সব কাল আর কোটটির রং গাঢ় বাদামী। সে বলল যে,
- খোরশেদ সাহেবও কি একই ভাবে চিন্তা করেন?
ছাদে, এখন খোরশেদ সাহেবকে দেখা যাচ্ছে। তিনি খুব লম্বা। গায়ে পান্জাবী। তিনি মনোযোগ দিয়ে ছাদের কার্নিশে বসা একটা কাক দেখছেন। ছাদে একটি কাক আছে। আরও কাক ছিল কিনা আমরা জানি না , কারণ খোরশেদ সাহেব তাদের প্রতি মনোযোগী হন নাই। তিনি প্রফেসরকে বললেন,
- ব্রক্ষান্ডের গুরুত্ব আরোপিতই হইছে কারণ এতে হিউমেন লাইফ একসিস্ট করে। আপনার থিওরী বা লজিক যাই বলেন না কেন, ওতে ভুল আছে।
প্রফেসর দুরে বিল্ডিঙের সারি দেখতেসিলেন। ফাগুনের মধ্যবর্তী সময়েও কেন দূরে কুয়াশা কুয়াশা হয়ে আছে এই নিয়ে তার চিন্তা হচ্ছিল। এখন বিকাল। রোদে সোনালী ভাব প্রকাশিত হইছে। তাঁর মনে হল ফাগুনটা মন্দ নয় এবার। তাঁর কোন কিছুকেই ভাল মনে হয় না। সর্বোচ্চ মনে হয় মন্দ নয়। তিনি খোরশেদকে বললেন কথাটা। খোরশেদ বলল
- মন্দ নয় আবার কি? আমার দেখা বেস্ট ফাগুন এইটা।
নতুন লোকটি বললেন
- তাহলে কি খোরশেদ ভাই সুসাইড করবেন না?
- আমি তো কখনই সুসাইডের কথা বলি নাই। সুসাইড ইজ ফর লুজারর্স।
- সুসাইড করার জন্যে সাহস ও দর্শনের প্রয়োজন। আপনার সেটা নেই।
খোরশেদ সাহেব হাসলেন। বেশ জোরে। কাকটি উড়ে গেল।
প্রফেসর লেবুগাছের ব্যাপারে আগ্রহী হলেন। নতুন লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন যে লেবুগাছটি কার এবং ছাদে আরও লেবুগাছ আছে নাকী, আর বছরের কোন কোন সময় লেবু হয় আর ছাদের গাছটির লেবু সে কখনও খেয়ে দেখেছে কিনা। নতুন লোকটি বিরক্তি ঘটে। সে আত্নহত্যা বিষয়ে চিন্তা করে এমন লোক। তার চিন্তা জগতে লেবুগাছ সামন্জস্যপূর্ণ নয়। সে নিজেকে প্রকাশ করে এভাবে যে,
- আমি লেবু খাই না।
কথাটি অসত্য। কাচ্চী বিরিয়ানী সে কখনও লেবু ছাড়া খায় না। প্রফেসর বললেন
- আত্নহত্যা নিয়ে তুমি যে একটু আগে বললা না দশর্ন আর সাহসের কথা এটা ঠিক বল নাই। মানুষের সব দর্শনতত্ত্বগুলোর প্রবণতা হল তোমাকে জীবনের প্রতি আগ্রহী রাখা। নট ডেস্ট্রয়িং ইট। আর সাহস আর ইনসেনিটির ভিতর ডিফারেন্স আছে।
নতুন লোকটি দুরে তাকিয়ে বলল
- স্টোয়িকদের দর্শনে সুসাইডের কথা আছে। জীবন একটা উৎসবের মত। যার ভাল্লাগব না, তার জন্যে দরজা খোলা আছে।
- ব্যাড ইউজ অফ স্টোয়িসিজম। স্টোয়িকরা বলে যে, সব ধ্বংসাত্নক অনুভুতির জন্ম বিবেচনার ভুল থেকে। সুসাইড ধ্বংসাত্নক অনুভুতি। সুতরাং কোন জায়গায় তোমার বিচারের ভুল হচ্ছে।
খোরশেদ ছাদের কার্ণিশে পা ঝুলায় বসে বলল
- আপনে আপনার প্রথম কথার কন্ট্রাডিকশনে গেলেন। অগুরুত্বপূর্ণ হিউমেন লাইফে দর্শন থাকনেরই তো কোন মানে হয় না।
বাকী দুজন নীরব। তারা আসলে এখন খোরশেদের প্রতি মনোযোগী। খোরশেদ যেকোন মূহুর্তে ছাদ থেকে পড়ে যাবে বলে তাদের মনে হয়। সুক্ষ উত্তেজনা বোধে তারা আক্রান্ত হন ফাগুনের বিকেলে। এই উত্তেজনা শুধু তাদেরই হয়। আশেপাশের বসন্ত আরোপিত ব্রক্ষান্ড অপরিবর্তিত থাকে।
আঁধার
তিনি বললেন যে তিনি একজন অন্ধকার প্রিয় মানুষ। তার অন্ধকার প্রীতি অনেকটা আসক্তির পর্যায়ে চলে গেছে। আমার মনে হইল উনার কথা ঠিক আছে। উনার ফ্ল্যাটের বারান্দায় উনি বসছেন চেয়ারে , আর আমি কিছু না পাইয়া বসছি মাটিতে। দৃশ্যগত অবস্থান থেকে উনাকে আমার চেয়ে সুপিরিয়র লাগতে পারে। কিন্তু আর কেউ আমাদেরকে দেখতেছিল না বলে আমি এইসব নিয়ে মাথা ঘামাইলাম না । তাছাড়া বারান্দায় অন্ধকার ছিল। উনি সেই অন্ধকার দেখায়ে আমাকে বললেন
- বুঝলেন স্যালি, আমি আসলে একজন অন্ধকার প্রিয় মানুষ।
আমি মাথা নাড়লাম । অন্ধকারে তিনি সেটা দেখতে পাইলেন বলে মনে হয় না। অথবা যেহেতু আমি উনার চেয়ারের পাশে মাটিতে বসছি, উনি হয়তো ধরেই নিলেন উনার যেকোন কথাতেই আমি মাথা নাড়ব। আমি বললাম
- অন্ধকার জিনিসটা খারাপ না , একটা রেস্টের ব্যাপার আছে ।
- আমি সেইটা বলি নাই , আমি বলতেসি এডিকশনের কথা। একধরণের তৃষ্ণা বোধ।
উনি কথা থামায়ে দিলেন। উনার বারান্দাটা ছোট্ট আর চমৎকার। এক কোনায় টবে কি জানি ফুল লাগাইসেন , রাত হলেই মিষ্টি গন্ধ আসে। বারান্দাটা গানিতিক বিচারে পুরোপুরি অন্ধকার বলা যায় না । উনার ফ্ল্যাটের সামনেই রাস্তা। রাস্তার ওইপারে আরও ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটের পাঁচতলায় কে জানি টিভি দেখতেসে । সেই টিভির থেকে নীল আর সাদা মিশানো একটা আলো উনার বারান্দা পর্যন্ত আসে। সেটা এমন অপর্যাপ্ত যে , সেটারে ঠিক আলো বলা যায় না । কিন্তু তারপরেও উনার বারান্দার টবে লাগানো সাদা ফুলগুলা প্রায় স্পষ্ট বুঝা যায় । উনার হাতের সোনালী ঘড়িটা ঝিলিক দেয়। দূর থেকে কেউ তাকালে এইটাও বুঝবে যে এই বারান্দায় চেয়ারে বসা আর মাটিতে বসা দুটা লোক আছে। আমি পায়ের আংগুল দিয়ে বারান্দার ঠান্ডা গ্রীল ঘষতে ঘষতে বললাম
- এডিকশনের কথা যে বলতেসেন, আপনে কি অন্ধকার খায়া দেখসেন
- দেখসি তো ।
- কেমন খাইতে ?
- আপনে নিজে না খায়া থাকলে বুঝানো যাইব না ।
- অন্ধকার কেমনে খায় একটু শিখায়ে দ্যান তো ।
- হাতে নিয়ে চাইটা খায়ে ফ্যালেন।
আমি বারান্দা থেইকা ডান হাতের তালুতে একটু করে অন্ধকার নিয়ে খায়া দেখলাম। অন্ধকারের স্বাদ মিষ্টি মিষ্টি , অনেকটা চকলেটের মত। কিন্তু আবার ঠিক মিষ্টিও না। পানশা পানশা একটা ব্যাপার আছে। আমি দুইহাত ভর্তি করে আরও একটু নিলাম। শুনলাম উনি হাসতেসেন। বললাম
- হাসতেসেন যে ...
- আপনে যেমনে খাইতেসেন... বেশী খায়েন না । ঝামেলায় পড়বেন ।
- কি ঝামেলা ?
উনি আমার কথার উত্তর না দিয়া কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর বললেন
- এডিকশন হয়ে যাবে। আমার মতো অবস্থা হইব আরকি ।
- আপনার অবস্থা কি খারাপ ?
- বেশ খারাপ। আজকাল মনে করেন যে আলোতে দমবন্ধ লাগে। সাফোকেশন হয় ।
- ডাক্তার দেখান না ক্যান ?
- আরে ধুউর। এইখানে ডাক্তারে কি করব ... আপনের কাসে আগুন আসে ?
আমি উনারে লাইটার দিলাম। উনি বিড়ি ধরায়ে একটা গভীর টান দিলেন। আমি বললাম
- এইখানে এত সুন্দর ফুলের গন্ধ , এরমধ্যে আপনে মিয়া সিগ্রেট ধরাইলেন।
উনি বিরক্ত হয়ে বললেন
- ফালতু কথা কন ক্যান। ফুলের গন্ধ আর তামুকের গন্ধ আলাদা । আপনের যেইটা ভাল লাগে সেইটা ন্যান , চাইলে দুইটাই নিতে পারেন।
আমি আলাদা আলাদা করে গন্ধ নেয়ার কোন উপায় দেখলাম না। এরকম করাটা সম্ভব বলেও আমি মনে করি না। কিন্তু ওনাকে এসব বলার প্রয়োজন নাই। অন্ধকারে আসক্ত একজন মানুষের সাথে তর্ক করার কোন মানে হয় না।
ফুল
ভদ্রলোক গল্প লেখেন জানার পরে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে নিয়ে একটা গল্প লেখা যায় কিনা। তিনি বললেন,
- আপনার এরকম ইচ্ছা হওয়ার কারণ কী?
- আপনার এরকম ইচ্ছা হওয়ার কারণ কী?
- না, আমার বুঝলেন মাঝে মধ্যে মনে হয় যে, আমি বাস্তবের থেকে গল্পের ক্যারেকটার হিসাবে বেটার।
- আচ্ছা দেখি। একদিন আসেন আমার বাসায়।
- আচ্ছা দেখি। একদিন আসেন আমার বাসায়।
তার বাসাটা ছোট। রাস্তার ওপারে। বাইরের দেয়ালে ফাটা ফাটা। ফাটার ভিতর ছোট গাছপালা জন্মেছে। বাসাটার চারপাশে খুব রোদ হয় দেখলাম। দরজা ধাক্কালে যে মহিলা খুলল তাকে আমি ধরে নিলাম তার স্ত্রী। মহিলাটি হেসে হেসে বললেন,
- আপনে কে আমি বুচ্ছি। আপনাকে নিয়ে একটা গল্প লেখার কথা। ভিত্রে আসেন।
ভেতরটা শীতল। বাইরের মতো রোদ নেই। একটা ছোট টেবিলে লাল লাল ফুল রাখা ফুলদানিতে। ফুলগুলি বোঝা যায় প্লাস্টিকের। মহিলা সোফায় বসছেন দেখে আমিও ভাবলাম তার পাশে সোফায় বসব নাকি। পরে উল্টো দিকের চেয়ারে বসলাম। তিনি বললেন,
- আপনার বিষয়ে জানা দরকার।
- কী জানবেন?
- যা যা জানা যায় সব। গল্প লিখতে হলে এসব লাগে।
- গল্প তো আপনার হাজব্যান্ড লিখবে। আপনার সঙ্গে এসব কথার কী দরকার?
তিনি বিরক্ত হলেন। চোখ কুঁচকে বললেন,
- আপনে কি ভাবসেন গল্প ও একা একা লিখবে! গল্প কখনও একা লেখা যায় নাকি?
- যায় না? আমি আসলে গল্প লেখার বিষয়ে কম জানি।
তিনি কী জানি চিন্তা করে বললেন,
- কমপক্ষে দু’জন বুচ্ছেন। গল্প লিখতে আপনার কমপক্ষে দু’জন লোক লাগে।
তিনি সোফা থেকে উঠে একদম আমার কাছে এসে দাঁড়ালেন। আমার খুব কেমন জানি করতে লাগল। মহিলা সুন্দরী না সেই অর্থে। কিন্তু আচ্ছন্নকারী। আমার মাথা ঘুরিয়ে গলার কাছে শুকনা শুকনা মনে হলো। আবার বুকেও কেমন সব আটকে আছে। তিনি খুব হাসতে লাগল। তার কিরকম ধারালো শব্দের হাসি। বললেন,
- আপনার ব্যাপার আমি সব বুচ্ছি। আপনাকে নিয়ে গল্প লিখতে মজা লাগবে। একটু বসেন আপনে।
তিনি কোথায় জানি গেলেন। আমি বসে থাকতে থাকতে কাতর হয়ে উঠলাম।
তখন আমার ফোন বাজল। দেখলাম ওই লেখক ভদ্রলোকটিই করেছেন। ধরে বললাম যে,
- আপনি কই? আপনার বাসায় তো আমি বসে আছি।
- আমি তো ভাই একটু বাইরে।
- কী করছেন?
- আমি হাঁটছি। আমি সারাদিন বাইরে হাঁটি। আর রাতে এসে গল্প লিখি।
- আমি কী করব এখন তাহলে?
- আপনে কী করবেন মানে। আমার ওয়াইফের সঙ্গে দেখা হয়নি?
- হয়েছে তো।
- ওর কাছে সব ইনফরমেশন দিয়ে চলে যাবেন। আমার জন্যে ওয়েইট করবেন না।
ফোন নামিয়ে আমার কেমন রাগ হলো। লেখকের স্ত্রীটি এমন আমাকে ফেলে রেখে চলে গেলেন দেখে দুঃখও হলো খুব। আমি ভাবলাম এমন হতে পারে যে, তার সঙ্গে আমার কোনোদিন দেখা হয়নি বা এই বাসাতে আমি কোনোদিন আসিনি অথবা লেখক লোকটা আমাকে নিয়ে কোনদিন লিখবেন না। একটু নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটা প্লাস্টিকের ফুল পকেটে ভরে আমি বেরিয়ে গেলাম।
বেরোনোর পর চিন্তা করে দেখলাম, আমার মন খারাপ। ভাবলাম, বাইরে ঘুরি কিছুক্ষণ। বাইরে খালি রাস্তার পর রাস্তা। কোনো রাস্তার শেষে আরেক রাস্তা। কোনো কোনো রাস্তার শেষে দেয়াল।
এভাবে সন্ধ্যা, রাত তারপরে মধ্যরাত হয়। একটা চায়ের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে আমি সিগারেট টানতে থাকি। তখন মোবাইল বাজে। ধরলে লেখক লোকটির গলা শুনি। তিনি বলেন,
- আপনাকে নিয়ে গল্পটা লিখছি। মজা লাগছে লিখতে।
- ইনফরমেশন তো কিছুই দেইনি। কী লিখবেন আপনি?
- ওই যা দিয়েছেন তাতেই হবে। আচ্ছা এখন রাখি ভাই, পরে কথা বলবো আপনার সঙ্গে।
- আপনে কে আমি বুচ্ছি। আপনাকে নিয়ে একটা গল্প লেখার কথা। ভিত্রে আসেন।
ভেতরটা শীতল। বাইরের মতো রোদ নেই। একটা ছোট টেবিলে লাল লাল ফুল রাখা ফুলদানিতে। ফুলগুলি বোঝা যায় প্লাস্টিকের। মহিলা সোফায় বসছেন দেখে আমিও ভাবলাম তার পাশে সোফায় বসব নাকি। পরে উল্টো দিকের চেয়ারে বসলাম। তিনি বললেন,
- আপনার বিষয়ে জানা দরকার।
- কী জানবেন?
- যা যা জানা যায় সব। গল্প লিখতে হলে এসব লাগে।
- গল্প তো আপনার হাজব্যান্ড লিখবে। আপনার সঙ্গে এসব কথার কী দরকার?
তিনি বিরক্ত হলেন। চোখ কুঁচকে বললেন,
- আপনে কি ভাবসেন গল্প ও একা একা লিখবে! গল্প কখনও একা লেখা যায় নাকি?
- যায় না? আমি আসলে গল্প লেখার বিষয়ে কম জানি।
তিনি কী জানি চিন্তা করে বললেন,
- কমপক্ষে দু’জন বুচ্ছেন। গল্প লিখতে আপনার কমপক্ষে দু’জন লোক লাগে।
তিনি সোফা থেকে উঠে একদম আমার কাছে এসে দাঁড়ালেন। আমার খুব কেমন জানি করতে লাগল। মহিলা সুন্দরী না সেই অর্থে। কিন্তু আচ্ছন্নকারী। আমার মাথা ঘুরিয়ে গলার কাছে শুকনা শুকনা মনে হলো। আবার বুকেও কেমন সব আটকে আছে। তিনি খুব হাসতে লাগল। তার কিরকম ধারালো শব্দের হাসি। বললেন,
- আপনার ব্যাপার আমি সব বুচ্ছি। আপনাকে নিয়ে গল্প লিখতে মজা লাগবে। একটু বসেন আপনে।
তিনি কোথায় জানি গেলেন। আমি বসে থাকতে থাকতে কাতর হয়ে উঠলাম।
তখন আমার ফোন বাজল। দেখলাম ওই লেখক ভদ্রলোকটিই করেছেন। ধরে বললাম যে,
- আপনি কই? আপনার বাসায় তো আমি বসে আছি।
- আমি তো ভাই একটু বাইরে।
- কী করছেন?
- আমি হাঁটছি। আমি সারাদিন বাইরে হাঁটি। আর রাতে এসে গল্প লিখি।
- আমি কী করব এখন তাহলে?
- আপনে কী করবেন মানে। আমার ওয়াইফের সঙ্গে দেখা হয়নি?
- হয়েছে তো।
- ওর কাছে সব ইনফরমেশন দিয়ে চলে যাবেন। আমার জন্যে ওয়েইট করবেন না।
ফোন নামিয়ে আমার কেমন রাগ হলো। লেখকের স্ত্রীটি এমন আমাকে ফেলে রেখে চলে গেলেন দেখে দুঃখও হলো খুব। আমি ভাবলাম এমন হতে পারে যে, তার সঙ্গে আমার কোনোদিন দেখা হয়নি বা এই বাসাতে আমি কোনোদিন আসিনি অথবা লেখক লোকটা আমাকে নিয়ে কোনদিন লিখবেন না। একটু নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটা প্লাস্টিকের ফুল পকেটে ভরে আমি বেরিয়ে গেলাম।
বেরোনোর পর চিন্তা করে দেখলাম, আমার মন খারাপ। ভাবলাম, বাইরে ঘুরি কিছুক্ষণ। বাইরে খালি রাস্তার পর রাস্তা। কোনো রাস্তার শেষে আরেক রাস্তা। কোনো কোনো রাস্তার শেষে দেয়াল।
এভাবে সন্ধ্যা, রাত তারপরে মধ্যরাত হয়। একটা চায়ের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে আমি সিগারেট টানতে থাকি। তখন মোবাইল বাজে। ধরলে লেখক লোকটির গলা শুনি। তিনি বলেন,
- আপনাকে নিয়ে গল্পটা লিখছি। মজা লাগছে লিখতে।
- ইনফরমেশন তো কিছুই দেইনি। কী লিখবেন আপনি?
- ওই যা দিয়েছেন তাতেই হবে। আচ্ছা এখন রাখি ভাই, পরে কথা বলবো আপনার সঙ্গে।
আমি পকেট থেকে ফুলটা বের করলাম। দেখলাম ওটাকে প্লাস্টিকের ফুল ভাবাটা ঠিক হয়নি, ওটা কুড়ি থেকে যে ফোটে ওই ধরনের ফুল। সারাদিন পকেটে থেকে থেকে মরে কালচে হয়ে গেছে।




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন