রবিবার, ২৮ মার্চ, ২০২১

পার্মানেন্ট রেকর্ড : এডওয়ার্ড স্নোডেন - গণনজরদারি ও নাগরিক স্বাধীনতা

 


“গণ-নজরদারি” কথাটিই আমার কাছে অধিক স্পষ্ট। আর আমার মনে হয় অধিকাংশ মানুষই, সরকারের পছন্দসই “গণ- আহরণ” শব্দটির তুলনায় গণ নজরাদারি কথাটিই ভাল বুঝতে পারবেন। “গণ-আহরণ” কথাটায় একটি ধোঁকাবাজির ব্যাপার আছে। শুনলে মনে হয় কোন ব্যস্ত পোস্ট-অফিস বা পয়ঃনিষ্কাশন বিভাগ। এখানে যে বিদ্যমান সমস্ত ডিজিটাল যোগাযোগের দখল নেওয়ার একটি অতি গোপন ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা চলছে সেটি আর বোঝা যায় না। 

 তবে সকলের বোধগম্য একটি শব্দমালা প্রতিষ্ঠা করা গেলেও ভুল বোঝাবুঝি তো রয়েই যায়। আজকের দিনেও অধিকাংশ মানুষ গণ-নজরদারির ব্যাপারটিকে ‘কন্টেন্ট’ দিয়ে বুঝতে চান- অর্থাৎ ফোনকলে বা ইমেইলে তারা আক্ষরিকই যে কথাগুলো বললেন বা লিখলেন তার প্রেক্ষিতে তারা গণনজরদারিকে বিবেচনা করেন। মানুষ যখন জানতে পারে সরকার এই কন্টেন্ট নিয়ে অতটা মাথা ঘামায় না, তারাও তখন গণনজরদারিকে আর অতটা পরোয়া করেন না। এর একটা কারণ নিশ্চই আছে। মানুষ ভাবেন এসব কন্টেন্টই তো আমাদের যোগাযোগের স্বতন্ত্রতা, এই কন্টেন্টই আমাদের প্রকাশ করে: আমাদের কন্ঠস্বর, সেটি তো আঙুলের ছাপের মতই নিজস্ব; অথবা কোন টেকস্টের সাথে পাঠানো সেলফিতে আমাদের যে মুখভঙ্গি সেটির অনুকরণ করতে পারে এমন দ্বিতীয় আর কে আছেন এই সংসারে। অথচ দুর্ভাগ্যজনক সত্যটি হচ্ছে আমাদের কন্টেন্ট আমাদের সমন্ধে প্রায় তেমন কিছুই জানাতে পারে না। আমরা প্রকাশ পাই অন্যান্য বিষয় দিয়ে- অলিখিত, অব্যাক্ত সেই তথ্য যেটি আপনার আচার- আচরণের বিন্যাসকে প্রকাশ করে দেয়, যেটি অবতারণা ঘটায় আরও বিশদ প্রসঙ্গের। 

 এই তথ্যকে এন-এস-এ নাম দিয়েছে ‘মেটাডেটা’। ‘মেটা’ উপসর্গটির সাধারণ তর্জমা হলো “ওপর’ “ঊর্ধ্বে” বা “ছাড়িয়ে”। কিন্তু এখানে মেটা অর্থ “বিষয়ে”: মেটাডেটা হচ্ছে ডেটা বিষয়ক ডেটা। আরও নির্ভুলভাবে বলতে চাইলে মেটাডেটা হচ্ছে তথ্যের পরিণতিতে সৃষ্ট তথ্য- একগাদা ‘ট্যাগ’ এবং ‘মার্কার’ বা নানান প্রকারের চিহ্ন যেগুলোর বদৌলতে তথ্যের ব্যবহার-যোগ্যতা আরও বেড়ে যায়। মেটডেটা-কে একদম সরাসরি এভাবে বর্ণণা করা যায় যে এগুলো হচ্ছে “অ্যাকটিভিটি ডেটা” বা আপনার কর্মকা- বিষয়ক তথ্য। আপনার ডিভাইসে (ফোন, কম্পিউটার ইত্যাদি) আপনি যা যা কাজ করেন, এবং আপনার ডিভাইসগুলো নিজেরা যা যা করে সেই সমস্ত কাজকর্মের একটি রেকর্ড। একটি ফোনকলের কথাই ধরুন: এর মেটাডেটা-য় থাকবে কল করার সময় এবং তারিখ, কলটির ব্যাপ্তিকাল, যেই নম্বর থেকে কল করা হল, যে নম্বরে কল করা হলো এবং ফোনকলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদ্বয় কোথায় কোথায় অবস্থান করছিলেন। একটি ইমেইলের মেটাডেটায় তথ্য থাকবে যে কোন ধরনের কম্পিউটারে এই ইমেইলটি তৈরি হল, কোথায় হল, এবং কখন হল, কম্পিউটারটির মালিক কে ছিল, কে পাঠাল ইমেইলটি, কে গ্রহণ করল, কখন পাঠানো হলো এবং গ্রহণ করা হল, এবং প্রাপক ও প্রেরক ব্যাতীত অন্য কেউ এই ইমেইলে প্রবেশ করতে পেরেছে কি না, আর যদি করে থাকেন তবে কখন এবং কোথায় সেই কাজটি করলেন। আপনার ওপর নজরদারি করছেন এমন কাউকে মেটাডেটা জানিয়ে দিবে গত রাতে আপনি কোথায় ঘুমিয়েছেন এবং আজকে সকালে ঘুম থেকে উঠেছেন কখন। সারাদিনে আপনি কোথায় কোথায় গেলেন, জায়গাগুলোতে কতক্ষণ কাটালেন তার সবই মেটাডেটা থেকে জানা যায়। সে জানিয়ে দেয়, কার সাথে আপনার যোগাযোগ হয় এবং আপনার সাথেও যোগাযোগ হয় কার। 

 সুতরাং কোন সরকার যদি দাবি করে যে মেটাডেটা জনসাধারণের যোগাযোগগুলোর ওপর অযাচিত হস্তক্ষপের কোন উপায় নয়-তবে সেটি নিতান্তই বাজে কথা। বর্তমান পৃথিবীতে যে পরিমাণ ফোনকল করা হয়, যে পরিমাণ ইমেইল পাঠানো তার হিসেব করতে গেলে উন্মাদ হয়ে যাবেন যে কেউই। প্রতিটি ফোনকল কেউ শুনবেন, প্রতিটি ইমেইল কেউ পড়ে দেখবেন-এটি একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। যদি কেও সেই কাজটি পারতেন, তাতেও খুব বেশি লাভ হত না। এবং মেটাডেটার কল্যাণে তার দরকারও পড়ছে না; সংগৃহীত তথ্যের অপ্রোয়জনীয় অংশটুকু ঝেড়ে মুছে বাদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রথমেই। যে কারণে মেটাডেটা- জিনিসটাকে বিমূর্ত এবং তেমন-মারাতœক-কিছু-নয় ভাবাটা ঠিক হবে না। বরং আপনার সৃষ্ট কন্টেন্টের নির্যাসটাই এই মেটাডেটা: আপনার ওপর নজরদারিরত লোকগুলো ঠিক এই তথ্যটুকুই কামনা করে। 

 এখানে আরেকটি ব্যাপার আছে: কন্টেন্ট হলো এমন কিছু যেটি আপনি সজ্ঞানে তৈরি করেন। একটা ফোনকলের সময় কি কথা বলছেন আপনি জানেন। অথবা ইমেইলে কি লিখছেন সেটিও আপনার জানা। কিন্তু মেটাডেটার ওপরে আপনার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। কারণ তার সৃষ্টি হয় নিজে থেকেই। মেশিন যেমন একে সংগ্রহ করে, জমা করে রাখে এবং বিশ্লেষন করে, তেমনি একে তৈরিও করে ঐ মেশিনই। আপনার কোন অংশগ্রহণ বা সম্মতি ব্যাতীতই তা ঘটে থাকে। আপনি চান বা না চান আপনার যন্ত্রগুলো সবসময়ই পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করছে। এবং আমরা যেভাবে অন্য মানুষদের সাথে আলাপ করি, যন্ত্ররা তেমন নয়। তাদের কাছে ব্যক্তিগত কথা বা তথ্য বলে কিছু নেই। তারা পরস্পরের কাছ থেকে কোনকিছু লুকোয় না। গোপনীয়তা রক্ষার জন্য কোন সাংকেতিক নাম ব্যবহার করে না। তারা একটি অভ্রান্ত সিগনাল পাঠিয়ে সবচেয়ে নিকটস্থ সেল ফোন টাওয়ারে জানিয়ে দেয় সব।

 আরেকটি বিড়ম্বনা হলো রাষ্ট্রের আইন। এই আইন যেন বরাবরই সমসাময়িক প্রযুক্তি থেকে পুরো একটি প্রজন্ম পিছিয়ে থাকে। আমাদের আইন কোন যোগাযোগের ‘কন্টেন্ট” কে তার মেটাডেটার থেকে অনেক বেশি সুরক্ষা প্রদান করে। অথচ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমস্ত আগ্রহ তো এই মেটাডেটা-র প্রতিই। কারও মেটাডেটা বা কর্মকান্ডের রেকর্ড থেকেই তারা একটি “বিশদ চিত্র” পেয়ে যায় অর্থাৎ সংগৃহীত তথ্যকে বড় পরিসরে বিশ্লেষণ করতে পারে। অন্যদিকে আবার ঐ একই ব্যক্তি বিষয়ে একটি “ক্ষুদ্র চিত্র”-ও পাওয়া যায়। ফলে সেই মানুষটির জীবন নিয়ে একটি নিখুঁত মানচিত্র তারা তৈরি করে ফেলতে পারে। টার্গেট ব্যক্তিটির জীবনের সমস্ত ঘটনাবলীকে কালানুক্রনিক ভাবে সাজিয়ে এবং প্রাসঙ্গিক অন্য বিষয়গুলোর একটি সারাংশ রচনা করে তারা এই ব্যক্তি ভবিষ্যতে কি ধরনের আচরণ করবে তার একটি অনুমান করার চেষ্টা করেন। মোটকথা, আপনার ওপর নজরদারিরত ব্যক্তিরা আপনার ব্যাপারে সম্ভাব্য যা যা জানতে চাইতে পারেন তার সমস্ত কিছুই তাদের জানিয়ে দেয় মেটাডেটা। তাদের শুধু জানা বাকী থাকে যে আপনার মাথার ভেতরে কি ঘটছে। 

  এই ক্লাসিফায়েড রিপোর্টটি পাঠ পূর্বক আমি তব্দা খেয়ে যাই। পরবর্তী কয়েকটি সপ্তাহ, মাস আমার কেটে যায় একপ্রকার ঘোরের মাঝে। আমি দুঃখিত, বিষন্ন। যা চিন্তা করছি, অনুভব করছি তার সমস্ত কিছুকে অস্বীকার করতে চাই। জাপানে থাকাকালীন শেষ দিনগুলোতে আমার মনের অবস্থা এরকমই ছিল। 

 আমার মনে হলো আমি বাড়ি থেকে বহুদূরে, তারপরও কঠোর নজরদারির অধীনে। মনে হলো এত বয়স্ক বড় একজন মানুষ আগে কোনদিন ছিলাম না আমি। আর তারপরও আমি এই জ্ঞানে অভিশপ্ত যে সবাই আমরা পর্যবসিত হয়েছি একদল অসহায় শিশুতে- বাকীটা জীবন যাদেরকে একজন নিয়ন্ত্রণবাদী সর্বোজ্ঞ অভিভাবকের তত্ত্বাবাধানে পার করে দিতে হবে। আমার বিষন্নতাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিন্ডসেকে কীসব উল্টাপল্টা বোঝাচ্ছিলাম ; নিজেকে তাই কেমন একজন প্রতারকও বোধ হচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গর্দভ। কারণ কিছু না বুঝেই আমি আমার গুরুতর প্রযুক্তিগত দক্ষতায় এই সমস্ত নজরদারি-ব্যবস্থার একটি অতি প্রয়েজনীয় অংশ নির্মাণে সাহায্য করে ফেলেছি। আমার মনে হলো আমাকে ব্যবহার করা হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা-সমাজের আমি এমন একজন কর্মী যে মাত্রই উপলব্ধি করছি যে এতদিন নিজের দেশকে নয়, আমি রক্ষা করেছি একটি রাষ্ট্রকে। সবচেয়ে বড় কথা, আমার নিজেকে বোধ হলো ধর্ষিত। প্রেমের নামে আমার সাথে অতি নিচু ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। আর জাপানে যতই থাকছিলাম এই আঘাতের অনুভূতি ততই প্রবল হচ্ছিল। 

  আমি ব্যাখ্যা করছি। 

কমিউনিটি কলেজে পড়াশোনার করার কারণে এবং এনিমে আর মাঙ্গা নিয়ে কৌতুহল থাকায় কিছুটা জাপানীজ আমি পারতাম। সেটি মুখে বলা আর ছোটখাট আলাপ চালানোর জন্য যথেষ্ট। কিন্তু জাপানীজ পড়া খুবই ভিন্ন ব্যাপার। জাপনীজে, প্রতিটি শব্দকে একটি মাত্র স্বতন্ত্র অক্ষর দিয়ে প্রকাশ করা যায়, অথবা অনেক ক্ষেত্রে একাধিক অক্ষরের সমন্বয়ে, একে বলা হয় ‘কানযি’, সুতরাং এদের সংখ্যাও প্রায় হাজার দশেকের বেশি- যার সবটা মুখস্থ করা আমার কর্ম নয়। অনেক সময় বিশেষ কিছু কানযির অর্থোদ্ধার করা আমার পক্ষে সম্ভব হত যদি সেগুলো তাদের ধ্বনিগত টীকার সাথে লেখা থাকত, যাকে বলে ‘ফুরিগানা’। তবে ফুরিগানা মূলতঃ ভিনদেশি এবং ছোটবাচ্চাদের জন্য। সুতরাং রাস্তা ঘাটের সাইনবোর্ডের লেখায় ফুরিগানা থাকত না। এসবের পরিণতিতে যেটা ঘটত যে আমি জাপানের রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াতাম একজন অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষ হয়ে। প্রায়ই আমি বিভ্রান্ত হতাম, ভুল করতাম। বাম দিকে যাওয়ার কথা, আমি চলে গেলাম ডানে অথবা ডানের বদলে বাঁয়ে। ভুলভাল রাস্তায় আমি ঘুরে বেড়াতাম, মেন্যু থেকে অর্ডার করতাম সব উল্টোপাল্টা। আমি বলতে চাচ্ছি, আমি ছিলাম একজন ভিনদেশী-অপরিচিতজন এবং বহু প্রকারেই একজন হারানো মানুষ। অনেক সময় এমন হয়েছে যে লিন্ডসেকে নিয়ে গ্রামের দিকে গিয়েছি ওর ফটোগ্রাফির জন্য; কোন একটি গ্রাম বা জংগলের মাঝে থেমে গিয়ে হঠাৎই আবিষ্কার করতাম যে আমার চতুর্পাশের এই জগতটি সমন্ধে আমি কিচ্ছু জানি না। আমার কোন ধারণাই নেই আমি কোথায়, কি ঘটছে। 

  আর তারপরও: আমার সমন্ধে সবই জানা। আমি এখন বুঝতে পারছি আমার সরকারের কাছে আমি সম্পূর্ণরূপে স্বচ্ছ। এই যে আমার একান্ত আপন মোবাইল ফোনটা, আমি রাস্তা ভুল করলে যে আমাকে শুধরে দেয়, দিক নির্দেশনা দেয় এবং ট্রাফিক সিগনালগুলোর তর্জমা করে দেয় আমার জন্য, আমাকে জানায় বাস আর ট্রেনদের সময়, এই আত্মীয়বৎ যন্ত্রটিই আমার নিয়োগকর্তাদের কাছে আমার সমস্ত কর্মকান্ডের ইতিবৃত্ত উপস্থাপন করছে। আমি হয়তো ফোনটা স্পর্শও করছি না, পকেটে রেখে দিয়েছি মাত্র, তারপরও সে ঠিকই আমার কর্তাদেরে জানিয়ে দিবে আমি কোথায় ছিলাম এবং কখন ছিলাম সেখানে।

  আমার মনে আছে আমি আর লিন্ডসে একবার এরকম অভিযানে বেরিয়ে পথ হারিয়ে ফেললাম। লিন্ডসেকে তো আর আমি এসব ব্যাপার কিছুই জানাই নি, তারপরও ও নিজে নিজেই বলল- “তুমি এক কাজ কর, ফোর্ট মীডে টেক্সট পাঠিয়ে ওদেরকে বল আমাদের খুঁজে বের করতে।” কথাটা শুনে আমি জোর করে হাসলাম। লিন্ডসে ঠাট্টা করতেই থাকে। আমিও চেষ্টা করি বিষয়টাকে উপভোগ করতে। কিন্তু পারি না। “হ্যালো ফোর্ট মীড,” ও আমাকে ভেঙায়, “রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি, আপনারা কি আমাদের একটু সাহায্য করতে পারেন?” 

  পরে একসময় আমি হাওয়াই-এ থাকব। পার্ল হার্বারের কাছাকাছি। এই পার্ল হার্বারেই তো আমেরিকার ওপর আক্রমণ হলো এবং তার পরিক্রমায় যেই যুদ্ধে আমাদের জোরপূর্বক জড়িয়ে পড়তে হলো সেটিই মার্কিন ইতিহাসের সর্বশেষ ন্যায্য যুদ্ধ। এখানে, এই জাপানে, আমি হিরোশিমা আর নাগাসাকির অনেক কাছে। পার্ল হার্বারে সূত্রপাত হওয়া যুদ্ধটির একটি অতি কলঙ্কজনক পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এখানেই। লিন্ডসে আর আমি সবসময় ভাবতাম এই শহর দুটিতে আমাদের যেতে হবে। কিন্তু যতবারই পরিকল্পনা করি ততবারই কিছু না কিছু একটা ছূতোয় তা বাতিল হয়ে যায়। আমার প্রথম ছুটির দিনটায়, আমরা সব ঠিকঠাক করে রেখেছি যে হিরোশিমার হনশু-তে যাব। কিন্তু মাঝপথে অফিস থেকে ফোন দিয়ে আমাকে একটা কাজ দেওয়া হলো। বলা হলো- মিসাওয়া বিমান ঘাঁটিতে যেতে হবে। মিসাওয়া বিমান ঘাঁটি সম্পূর্ণই উল্টো পথে, সেই বরফাচ্ছন্ন উত্তরে। এরপর যেদিন যাওয়া ঠিক করলাম সেদিন প্রথমে লিন্ডসে অসুস্থ হয়ে পড়ল, আর পরে আমিও অসুস্থ হয়ে গেলাম। আর শেষ পর্যন্ত যেদিন আমাদের নাগাসাকি যাওয়ার কথা, তার আগের রাতে জীবনের প্রথম কোন বড় রকমের জাপানি-ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা হলো। ফুটোন (জাপানি তোষক) থেকে লাফিয়ে নেমে, সাততলা সিড়ি ভেঙে দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা নিচে চলে আসি। বাকী রাতটা প্রতিবেশীদের সাথে রাস্তাায় দাঁড়িয়ে পায়জামা পড়া অবস্থায় শীতে কাঁপতে কাঁপতে পার করে দিলাম। 

 আমার খুবই অনুশোচনা হয় যে কোনদিনই ঐ শহর দুটিতে আমাদের আর যাওয়া হয়নি। ওগুলো বড় পবিত্র স্থান। ঐ শহরের স্মৃতিস্তম্ভগুলো সেই দু’শ হাজার মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়, বোমার আঘাতে যারা পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিলেন। স্মরণ করে আরও সেই অগণিত মানুষকে যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন পরবর্তী বিষক্রিয়ায়। এই দুটি শহর আমাদের মনে রাখতে বাধ্য করে যে প্রযুক্তি কি ভয়ঙ্কর অনৈতিক ঘটনা ঘটাতে পারে। 

  “এটমিক মোমেন্ট” বা পারমাণবিক মুহূর্ত বলে একটা কথা আছে। আমি প্রায়ই এই কথাটা নিয়ে ভাবি। পদার্থবিজ্ঞানে এটমিক মোমেন্ট বলতে সেই মুহূর্তটিকে বোঝায় যখন একটি নিউক্লিয়াস চতুর্পাশে ঘূর্ণায়মান প্রটোন আর নিউট্রনকে একত্রিত করে একটি পরমাণুতে পরিণত হয়। তবে জনপ্রিয় ধারায় লোকে “এটমিক মোমেন্ট” বলতে বোঝে পারমাণবিক যুগের সূচনালগ্ন। যখন আইসোটোপদের কল্যাণে শক্তি উৎপাদন এগিয়ে গেল অনেক দূর, উন্নয়ন ঘটতে লাগল কৃষিতে, পানযোগ্য জল উৎপাদনে এবং মরণঘাতী সব রোগব্যাধির নির্ণয়ে। একই সাথে সৃষ্টি হলো পারমাণবিক বোমা। 

 প্রযুক্তি হিপোক্রিটাসের শপথ গ্রহণ করে নাই কোনদিনই। অন্তত শিল্প বিপ্লবের পর থেকেও যদি ধরি, তাহলেও শিক্ষাক্ষেত্রে, শিল্পক্ষেত্রে, সামরিকবাহিনী আর সরকারে প্রযুক্তিবিদরা যা সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার সবটারই ভিত্তি ছিল “আমরা কি পারব”; “আমাদের কি করা উচিত হবে” এই ভাবনা কেউ ভাবেননি কখনও। এবং যেই উদ্দেশ্যে একটি প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটানো হয়, তার ব্যবহার অতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে এমনটা বিরল। 

 প্রাণহানির বিচারে, আমি কখনই পারমাণবিক অস্ত্র এবং কম্পিউটারের মাধ্যমে গণনজরদারিকে তুলনা করতে যাব না। দুটি অবশ্যই ভিন্ন জিনিস। কিন্তু দ্রতুবিস্তার এবং নিরস্ত্রীকরণের কথা যদি ভাবেন তাহলে দুটির মাঝে কোথায় জানি একটি মিল খোঁজা যায়। 

  অতীতে গণ-নজরদারির চর্চা করেছে এরকম রাষ্ট্র আমার জানামতে আর মাত্র দু’টি। এরা দু’জনই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অতি গুরুত্বপূর্ণ দুই লড়াকু রাষ্ট্র- একজন আমেরিকার বন্ধু, অপরজন শত্রু। নাযি জার্মানি আর সোভিয়েত রাশিয়া, দুই জায়গাতেই গণনজরদারির সবচেয়ে প্রাচীন রূপটির দেখা আমরা পাব। ‘আদমশুমারি’র আপাতঃ নির্বিষ, ক্ষতিহীন রূপ দিয়ে পরিচালিত হয়েছিল এই গণনজরদারি। দেখানো হয়েছিল যে দেশগুলোর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের জনসাধারণের একটি তালিকা প্রস্তুত করতে চায় এবং পরিসংখ্যানগত রেকর্ড রাখতে চায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বপ্রথম অল-ইউনিয়ান আদমশুমারি ১৯২৬ এ, লোকসংখ্যা গণণার এই নিরীহ নির্দোষ ইচ্ছার বাইরেও আরও কিছু ছিল: তারা সোভিয়েত নাগরিকগণকে তাদের জাতীয়তা বিষয়ে প্রকাশ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। এই অনুসন্ধানের ফলাফলে সোভিয়েত অভিজাতবর্গের একটি দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল যে এই দেশে তারা সংখ্যালঘু। দেশের নাগরিকদের বিপুল অংশ দাবি করছে যে তাদের বাপ-দাদারা ছিলেন সেন্ট্রাল এশিয়ান যেমন- উযবেখ, কাযাখ, তাযিখ, তুর্কী, জর্জিয়ান এবং আর্মেনিয়ান। আদমশুমারির ফলাফল পাওয়ার পর স্টালিন আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন যে বিজাতীয় এই সমস্ত সংস্কৃতিকে বিনাশ করতে হবে। এবং সেক্ষেত্রে উপায়টি হচ্ছে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের উৎখাতমূলক আদর্শে এই বিশাল জনতাকে “পুনরায় দীক্ষিত” করা। 

১৯৩৩ সালে নাযি জার্মানির আদমশুমারিও ছিল এই ধরনেরই একটি পরিসংখ্যান প্রকল্প। তবে সেখানে যুক্ত হয়েছিল কম্পিউটার প্রযুক্তি। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল রাইখের (তৎকালীন জার্মান শাসন) জনসাধারণকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তাদের সংখ্যা গণণা এবং পরিশোধন- মানে আরকি ইহুদী এবং রোমা’দের বর্জন করা- এবং পরবর্তীতে নিজেদের সীমানার ওপারেও এই খুনে বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করা। একে কার্যে পরিণত করার জন্য, রাইখ জুটি বাঁধল “ডিহোম্যাগ” এর সাথে। ডিহোম্যাগ, আমেরিকান আই-বি-এম’র একটি জার্মাণ পরিপূরক। “কার্ড পাঞ্চ ট্যাবুলেটর” নামক এক বস্তুর প্যাটেন্ট ছিল এই প্রতিষ্ঠানের কাছে। এটি এক ধরনের অ্যানালগ কম্পিউটার। একটি কার্ডে কতগুলো ফুটো রয়েছে সেটি গণণা করত এই যন্ত্র। প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি কার্ড, এবং কার্ডের ফুটোর বিন্যাস থেকেই সেই নাগরিক সমন্ধে নির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়। যেমন কলাম নং বাইশ নির্দেশ করত ধর্ম: এক নম্বর ফুটো মানে প্রটেস্টেন্ট, দুই নং ফুটো অর্থ ক্যাথোলিক, আর তিন নং ফুটোর অর্থ ইহুদী। সেই ১৯৩৩ সালে।  তখনও নাযিরা ইহুদীদের আলাদা প্রজাতি ভাবতে শুরু করেনি।  তাদেরকে ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবেই বিবেচনা করত। তবে বছর কয়েক পরেই এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়। এই আদমশুমারির তথ্য ব্যবহার করেই তখন ইউরোপের ইহুদী জনতাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল মৃত্যু-শিবিরে। 

রাইখ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশ্বযুদ্ধকালীন সমস্ত যন্ত্রপাতিকে একত্রিত করলেও হাল আমলের একটি স্মার্টফোনের কম্পিউটিং ক্ষমতার সমান হবে না। এই কথাটি যদি মাথায় রাখেন, তাহলে আধুনিক আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থার প্রযুক্তিগত ক্ষমতা কোন পর্যায়ের তা বোঝা বেশ সহজ হয়ে যায়। এবং এই ধরনের ক্ষমতা একটি গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাকে কতটা হুমকির মুখে ফেলে দেয় তাও বোধগম্য। জার্মানি আর রাশিয়ার সেই আদমশুমারির পর পৃথিবীতে শতবছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ের মাঝে প্রযুক্তি যে পরিমাণ অগ্রসর হয়েছে তাতে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। কিন্তু এই অগ্রসর প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে যেই আইন বা মানুষের বিবেকবোধ তার ব্যাপারে একই রকমটা বলা যাচ্ছে না। 

এই লোকগণণা-র ঘটনা আমেরিকাতেও ঘটেছিল, বলা বাহুল্য। আমেরিকান আদমশুমারির প্রতিষ্ঠা করে দেশটির সংবিধান। তারা কারণ দেখালেন যে “হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ” এ কি অনুপাতে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে তার জন্য প্রতিটি স্টেটের জনসংখ্যার একটি ফেডারেল-কাউন্ট (প্রাদেশিক পর্যায়ে গণণা) প্রয়োজন- এই জন্যেই এই আদমশুমারি। এখানে একধরনের সংশোধনবাদী নীতির অনুসরণ করা হয়েছে বলা যায়। কারণ বিভিন্ন প্রভুত্বপরায়ণ সরকারগুলো, যেমন ধরুন ব্রিটিশ রাজপরিবার যারা উপনিবেশগুলোকে শাসন করত, তাদের কাছে আদমশুমারি ছিল এমন একটি পদ্ধতি যেটি দিয়ে তারা রাজস্ব গণণা করতে পারেন, এবং সামরিকবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানের জন্য যোগ্য কতজন তরুণ রয়েছে তার একটি হিসেব করতে পারেন। এখানেই মার্কিন সংবিধানের অসামান্য বুদ্ধি যে- শোষণের হাতিয়ার ছিল এমন একটি বিষয়কে তারা গণতন্ত্র বানিয়ে ফেলল। এই লোকগণণা, যেটি আনুষ্ঠানিকভাবে সিনেটের এখতিয়ারাধীন, প্রতি দশ বছরে একবার অনুষ্ঠিত হওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়। ‘দশ বছর’ কারণ ১৭৯০ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম মার্কিন আদমশুমারির পর থেকে নিয়ে অনুষ্ঠিত প্রতিটি গণণাতেই সংগৃহীত সমস্ত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করতে মোটামুটি এই পরিমাণ সময়ই লাগত। তবে ১৮৯০ সালের আদমশুমারির পর এই দশক-ব্যাপী ধীরতার অবসান ঘটে। ১৮৯০ সালের লোকগণণায় প্রথমবারের মতো কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় (এই মডেলগুলোর প্রোটোটাইপ-ই নাযি জার্মানির কাছে পরবর্তীতে বিক্রি করেছিল আইবিএম)। কম্পিউটিং প্রযুক্তির কল্যাণে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সময়টি কমে অর্ধেক হয়ে গেল। 

ডিজিটাল প্রযুক্তি এই ধরনের হিসাব নিকাশকে অনেক বেশি সহজই শুধু করেনি- বরং এসবকে একপ্রকার সেকেলে বিষয়ে পরিণত করেছে। গণ-নজরদারি বর্তমানে একপ্রকার অন্তহীন আদমশুমারি। এবং ইমেইলে পাঠানো যেকোন প্রশ্নমালার চেয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিপদজনক। ফোন থেকে শুরু করে কম্পিউটার, আমাদের সমস্ত ডিভাইসগুলোই আসলে ছোট ছোট আদমশুমারি-পরিচালক। আমরা তাদেরকে নিজেদের পকেটে, ব্যাকপ্যাকে বয়ে বেড়াই। এই গণণকারীগণ কিচ্ছু ভোলে না, এবং কোনকিছুই ক্ষমা করে না। 

 জাপান ছিল আমার “পারমাণবিক মুহূর্ত”। জাপানেই আমি প্রথম টের পেয়েছিলাম এই সমস্ত প্রযুক্তি কোন পথে অগ্রসর হচ্ছে। আমি উপলব্ধি করলাম আমার প্রজন্ম যদি একে রুখে না দেয় এই বিপদ আরও ঘোরতর হয়ে উঠবে। খুবই দুঃখের ব্যাপার হবে যদি দেখা যায় যেই নাগাদ আমরা প্রতিরোধ গড়ে তোলার সংকল্প করলাম তখন আর প্রতিরোধ করে কোন লাভই নেই। অনাগত প্রজন্মদের এমন এক পৃথিবীতে অভ্যাস্ত হতে হবে যেখানে নজরদারি আর কোন আকস্মিক ঘটনা নয়,যেখানে নজরদারি আর আইনগত ভাবে সিদ্ধ একটি পরিস্থিতির বিষয় নয়, বরং একটি সার্বক্ষণিক উপস্থিতি, একটি অস্তিত্ব যে কোন ধরনের বাছ বিচারবিচার করে না: একটি কান যে সবসময় শুনতে থাকে, একটি চোখ যে সবসময় দেখতেই থাকে, এবং একটি স্মৃতিধর যে নিদ্রাহীন, ক্ষমাহীন এবং চিরস্থায়ী। 

 তথ্য আহরণের ‘সর্বব্যাপিতার’ সাথে জমিয়ে রাখার ‘চিরস্থায়িত্বের’ যোগ ঘটা মাত্রই, একটি সরকারের কাজ খুব সহজ হয়ে যায়। কোন গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে বলির পাঁঠা বানানোর জন্য তাদেরকে শুধুমাত্র ডাটাবেযে সার্চ করে যেতে হবে- যেমন আমি সার্চ করেছিলাম এজেন্সীর ফাইলগুলোতে- এবং ফাঁসিয়ে দেওয়ার মতো একটা কিছু অপরাধের প্রমাণ তারা পেয়ে যাবেই।

বইটি কেনার লিংক : https://www.rokomari.com/book/205231/parmanent-record

~ বরাহশোদনে - বিস্ট্যালিটি ~

হে ছোট শূকর জেনো তোমায় খেতে মানা, মারতে মানা নেই সেই মহাজাগতিক মের্সেনারি তাই একশো বছর পথ হেটে এসেছে একেলা ডেসপারেট দুপুর রাত্রে পালিয়ে সে ভ...