শুক্রবার, ৮ এপ্রিল, ২০২২

হুজুর

 “ তিরিশজন মিথ্যুক আগমনের কিয়ামাত হবে না, এবং এরা প্রত্যেকেই নিজেদের আল্লাহর রাসূল দাবী করবে” 

       (কিতাবুল মানাকিব: বুখারী শরীফ)  


~হুজুর~

 

তখনও তিনি হুজুর হন নাই। ছিলাম সংখ্যায় পাঁচজন মাত্র। ধানমন্ডি লেকে গেছি। একদিকে গাছ থেকে পাতা ঝরছিল। তিনি পাতা দেখায়ে বললেন,

 

“মানুষের জীবন মেইনলি এই ঝরা পাতার মত। অথচ এঁরা নিজেদের বৃক্ষ ভেবে ভুল করে। বৃক্ষ তো বহমান রিয়েলিটির একটি জৈবিক প্রতিমান মাত্র। মানুষ শুধুই ঝরা পাতা। এজন্য় তার কোন রেসপনসিবিলিটি নাই।”

 

সেদিনই ঠিক ঐ মুহুর্তে বসন্তক্ষণের প্রবল রোদ জোড়া ধানমন্ডি লেক তার মানুষের আসা যাওয়া ও সবুজ সমারোহের মাঝে আমরা ভাইকে হুজুর মানলাম। আমরা জলসাক্ষী রেখে গ্রহণ করি তার সহবত। সেই ওয়াস্তে খুঁজে বের করি ধানমন্ডি লেকের সেই বিশেষ ঘাট। যেখান থেকে দেখলে বোঝা যায় এই রহস্যময় লেক আসলে প্রাচীন নীল নদেরই একটি ধারা। সেখানে বালুকা অদ্ভুত ও বিস্মিত। সকাল দশটায় হাঁটতে শুরু করলে ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের ব্রিজ পেরিয়ে যে শুড়িখানা তার টেবিলে গিয়ে বসতে বসতে রাত আটটা বেজে যায় আমাদের।

 

আর ঘাটে পৌঁছে প্রথমে জলে ডুব দিলেন ছোট ভাই। একটা সাদা কাফনের কাপড় পরে তিনি তটে এসে বসলেন। পরপর জলে অবগাহন করি আমরা। অনুরূপ উঠে আসি। এসে বসি তটে কাফন পেঁচানো শরীরে। তখন ছোট ভাই বললেন,

 

“আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু”

আমরা সমস্বরে বললাম,

“ ওয়ালাইকুম সালাম। তুহু পরেও বর্ষিত হোক রহমত ও বারাকা। 


২। 


হুজুর অনেক শর্ট। শাহবাগ টিএসসি ধানমন্ডি লেকে যেসব দিন খুব ভীড় হয় তখন হুজুরকে বহুলোকের মাঝে অদৃশ্য বোধ হয়। সাথের আমরা খুব লম্বা। আজও এই বহুল চর্চিত ধানমন্ডি লেকে এমন দিন ছিল যে মেয়েরা সবাই একরকম শাড়ি ও ছেলেরা সবাই একরকম পাঞ্জাবী পরে এসে ঢঙ করছে। শুধু ব্যাতিক্রম সাতজন আমরা। নতুন দু’জন মারবে আজকে। কাফেরদেরকে।


আমাদের পোশাকের রঙ কালো। হুজুর বাদে। তিনি সাদা পরেন। আমাদের আড়ালে তিনি বসেছিলেন। তার হাতে পবিত্র গ্রন্থ। তিনি পাঠরত। একান্ত মনে। এখানে গান গাচ্ছে কাফেররা। ছোট ও বড় মেয়েরা জোরে জোরে হাসছে। কেমন শাড়ি খুলে যাওয়া হাসি ওদের।  ঘাম ও কামের সম্মিলিত একটা ঘ্রাণে আমাদের উদগার আসে। 


এসমস্ত গন্ডগোল মাঝেও হুজুরের পবিত্র গ্রন্থ পাঠের অতি মৃদু সুরময় গুঞ্জন প্রকট থাকে। বেখেয়ালে শুনলে মনে হয় মধ্যপ্রাচ্যীয় কোন দুর্বোধ্য ভাষা। কিন্তু সামান্য মনযোগেই লক্ষ্য করা যায় হুজুর পাঠ করছেন তার শুদ্ধ হূমায়ূণী বাংলায় :


“ এবং শেষ নেই তোমাদের যন্ত্রণার। কোনদিন তোমরা শান্তি পাবে না। যে একমাত্র উদ্ধারকারী তিনিও তোমাদের পরিত্যাগ করেছেন। তোমাদের দুর্ভোগের কারণ তোমাদের লোভ, ঈর্ষা ও নিরাময় অযোগ্য জাতিগত হীনমন্ন্যতা। হায়! পরিতাপ তোমাদের জন্য। মেধা বিসর্জন দিয়ে তোমরা এই তিন জিনিসকে আকড়ে ধরে আছ…”


শুনতে শুনতে আমাদের হৃদয় দুমড়ে মুচড়ে ওঠে। গলার কাছটা ভার হয়। ওষ্ঠ ফুলে ওঠে। মাত্রই শুরু হওয়া সন্ধ্যাটিকে মনে হয় অনেক বেশী নীল।  


(প্রকাশিতব্য উপন্যাস - 'হুজুর' থেকে অংশবিশেষ)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

~ বরাহশোদনে - বিস্ট্যালিটি ~

হে ছোট শূকর জেনো তোমায় খেতে মানা, মারতে মানা নেই সেই মহাজাগতিক মের্সেনারি তাই একশো বছর পথ হেটে এসেছে একেলা ডেসপারেট দুপুর রাত্রে পালিয়ে সে ভ...